“ছেলেটা বাড়ি থেকে পালিয়েছিল সতেরো বার, তাকে ষোলবার এর বেশি ফেরানো যায়নি।”

ভাঁড় ভর্তি চা, চলকে খানিক আঙুলে। কানায় কানায় পূর্ণ, চুমুক দেওয়া আশু কর্তব্য, নইলে ফের বন্যা। অতএব নীলকণ্ঠ হতে হল। হাসি মুখে জিভ পোড়াল ছেলেটা। প্রতিটি শিরা উপশিরা ধমনী বেয়ে গরম ছুটল। ভোরের আলসে শেষঘুমটা বিদায় নিল ঝটকা মেরে। সে অর্ধেক ভাঁড় নিয়ে নেমে দাঁড়াল প্ল্যাটফর্মে। বড্ড ভোর। কালচে নীল হয়ে আছে, যদ্দূর চোখ যায়, নাকি সবুজ, কে জানে। আকাশটা ফর্সা হচ্ছে। এখানে থামার কথা তো নয়। ট্রেনটা আঁটেওনি, এত ছোট স্টেশন। মেঝে ভিজে, লাইনের উপরের কয়লা ভিজে, বাতাস ভিজে। নীল ডোরাকাটা ট্রেনটা ভিজে। গায়ে দেবার একটা কিছু নিয়ে বেরোলে ভালো হত। ড্রাম কেটে বানানো ডাস্টবিন লক্ষ্য করে ভাঁড়টা ছোঁড়ে সে, ফসকায়। পিছল প্ল্যাটফর্মে সেটা গুঁড়িয়ে যায়। উৎকর্ণ হয়ে হুইসিলের অপেক্ষা করে সে, দরজা থেকে বেশী দূরে যাবার সাহস করে না।

“ট্রেনের থেকে ভালো তালবাদ্য হয় না বোধহয় আর।”

সারারাত তাকে গল্প শুনিয়েছে ছেলেটা। মানুষ বলতে ক্যুপে তারস্বরী কচি সমেত বাপ মা, ধেড়ে মৌনিবাবা, মৌনিবাবার ফিসফিসে বৌ, বাচাল ছেলেটা, আর সে। আর নিত্যপায়চারিকারী চার্জ খতম হতে থাকা ভুঁড়িকাকু আর ছোট্ট প্যান্ট পরে ঠ্যাং দেখিয়ে ঘুরে বেড়ানো একটা মেয়ে। ছেলেটার সম্বন্ধে আগাম ধারণা বাগিয়ে রেখেছিল বিশালাক্ষী। লাইন মারবে। মারবেই। তার রূপের প্রশংসা বইয়ে দেবে। ফোন নম্বর চাইবে। নইলে ঘ্যানঘ্যান করবে। শুরুটাও সেরকম ই হয়েছিল। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে ছিল তার দিকে। কিন্তু তারপর খুব সৎ কৌতূহল দেখিয়ে বলল “আপনি মায়াবতীজির কেউ হন?” থাপ্পড় ঠাস করেই মারতে হয়। দুম করে কিল। ঢিসুম করে ঘুঁষি। টক করে গাঁট্টা। ক্যাঁৎ করে লাথি। কিন্তু অনেক সাক্ষী মজুত, তাই বিশালাক্ষী তার বিশাল চোখ দিয়ে কটমট করে তাকানোতেই ক্ষান্ত হল। দেখিয়ে দেখিয়ে ডেয়ারী মিল্ক খাচ্ছিল তারপর। বলল “দিতাম, কিন্তু আপনার মা নিশ্চই বারণ করে দিয়েছে অচেনা কারুর থেকে কিছু খেতে?” খিমচায় যেন কী করে?

বড্ড জ্ঞান দিতে ভালোবাসে ছেলেটা। শুনতে শুনতে ভাবছিল বিশালাক্ষী। এরকম একটা গল্প-মাফিক ট্রেন-প্রেম করবার বহুদিনের শখ। ট্রেনে শুরু। ট্রেনে শেষ। ছেলেটির তাকে অভিভূত করার চেষ্টা। তার চোখে প্রশ্রয়। বিদায়লগ্নে হাল্কা ব্যথা। মুচমুচে। কিন্তু এর প্রতি প্রেম জাগছে না তেমন। কিন্তু একটা ঝিমঝিমে ভালোলাগা। সারারাত তাকে গল্প শুনিয়েছে ছেলেটা। বাড়ি পালানোর গল্প। পালানোর গল্প। সবকিছু থেকে, সবার থেকে।

“প্যান্টোগ্রাফ কাকে বলে জানো?” বিশালাক্ষী তালবাদ্য মানেও জানত না।
“ট্রামের বা ট্রেনের মাথা থেকে যে টিকিটা উপরের বিদ্যুৎবাহী তার ছুঁয়ে চলে, তাকে বলে প্যান্টোগ্রাফ।”
“তো?” জানতে চেয়েছিল বিশালাক্ষী।

“ট্রামকে অনেকদেশে বলে স্ট্রিটকার। আমার জীবন ওই-ই। স্ট্রিটকারের মত। যাত্রীর মত মানুষের আনাগোনা। কেউ এক দু স্টপেজ, কারুর বারো টাকার টিকিট। আমি প্যান্টোগ্রাফের তার খুঁজছি।”

হড়বড়িয়ে কত কিছু বলেও ফেলেছিল বিশালাক্ষী। নিজের কথা। আশা, অভিযোগ, অপরাধবোধ। কিন্তু কী করে? তার বলা নামটাও সত্যি কিনা তাও সে জানে না, একটা অচেনা ছেলে কে এতগুলো কথা… বিশালাক্ষী হাসে। ধুর। ছেলেটা মোটে প্রেমে পড়েনি তার। নিজের ছ’খানা ভীষণরকম কান লাল করা প্রেমের গল্প শুনিয়েছে, শুনিয়েছে সারারাত কোনও এক বাস ডিপোতে একসাথে রাত কাটিয়ে কোথাও একটা যাবার বাসে সেই একজনকে তুলে দেবার গল্প। তারপর বিশালাক্ষীর সেই একজনকে ফিরে পাবার ফন্দি দিয়েছে। সবার একজন একজন থাকে।

ট্রেনটা অনেক্ষণ থেমে আছে। সাইড লোয়ারের অন্যটা ফাঁকা। বিশালাক্ষীর সিগারেট পাচ্ছে। দরজা অবধি এগোতেই নড়ে উঠল ট্রেনটা। ছেলেটা রয়ে গেছে প্ল্যাটফর্মে।

“উঠে এসো!” সে চেঁচায়। “উঠবে না?”
হেসে মাথা নাড়ে ছেলেটা। “এই অবধিই টিকিট।”
বিশালাক্ষীর সহসা বুক মোচড় দেয়। এরকম তো কথা ছিল না!  কেন? আর… আর… আরও কিছুক্ষণ… শেষ স্টেশনটুকু অবধি?
“এখনই না! এখনই নয়! প্লিজ? আর একটু?” নিজেকে বিশ্বাস হয় না বিশালাক্ষীর।
ট্রেনটা গতি নেয়।
————————————–
ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।
Advertisements