কাঁচি

পৃথিবীটা একেবারে শব্দহীন হয়ে গেলে অস্বস্তি হয়। ভয় লাগে। প্রথমে মনে হয় কান খারাপ হয়ে গেছে। মনে হয় চোখে কম দেখছি, আরেকটা ইন্দ্রিয় ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। হাত পা অসাড় হয়ে আসতে থাকে। গলা থেকে আর্তনাদটাও বের হয় না ঠিক মত। কিন্তু হয়। প্রথমটা ভাঙা। ছেঁড়া। পরেরটা দ্বিগুণ জোরে, স্পষ্ট, তার কম্পন টের পাওয়া যায়। কানের পর্দায় সেই তরঙ্গ আঘাত করে। স্বস্তি ফেরে। শোনা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে। ঢোঁক গিললে কথাও বলা যাচ্ছে দিব্যি। নৈঃশব্দকে খুব ভয় অঞ্জনের। তাই কাঁচি ঘষার এই একটানা বিরক্তিকর আওয়াজটা নিয়ে তার অভিযোগ নেই। 
 
সে আওয়াজ থেমে যায়। হঠাৎ। অঞ্জন চোখ খুলেই স্থির হয়ে যায়। কাঁচিটা চোখের বড্ড কাছে। বড্ড কাছে। হাঁ করে আছে। গিলে খেতে চায়। কাঁচির ভিতরের আঙুলদুটোয় বড় নখ, ময়লা। কাঁচি আর তার হাতের উপর থেকে নজর সরায় অঞ্জন, মোটেই স্বস্তি পায় না। মুখটা নেমে আসছে। মুখটা নেমে আসছে তার মুখের উপর। সেই নেমে আসা মুখের পিছনে একটা বড় উজ্জ্বল আলো, তাই মুখটা একটা অবয়ব ছাড়া কিছু নয়। গরম নিঃশ্বাস ছুঁচ্ছে অঞ্জনকে। অঞ্জন গন্ধ পাচ্ছে। পানমশলা। মদ। আরও কিছু। চেনা কিছু। বাসি কিছু। অঞ্জনের নেশা লাগছে। তিন আঙুল দূরে থামে মুখটা। অঞ্জনের শরীরে ঘাম বইতে থাকে। হৃদস্পন্দন যে বাড়ছে, সেটা বুঝতে নাড়ি টিপতে হবে না। অঞ্জনের দৃষ্টি নিথর, ঠোঁটের উপর। অঞ্জন তার গালে, মাথায় স্পর্শ অনুভব করে। সম্ভাবনাময় স্পর্শ। তার চোখে বিস্ফোরণ হবে। হবে। ঠোঁটটা নামছে। অপ্রতিরোধ্য ঠোঁট। নির্মোঘ আকর্ষণ তার। তার ঠোঁট লক্ষ্য করেই, সন্দেহ নেই। বেচাল দেখলেই কাঁচি? চোখে? বেচাল অঞ্জন চায় না। সে চোখ বোঁজে। সে চোখ বুঁজে থরথর করে কাঁপে, প্রতীক্ষায়। নেমে আসার প্রতীক্ষায়।
আওয়াজটা চালু হয়। চমকে ফের চোখ খোলে অঞ্জন। স্যাণ্ডো গেঞ্জির বুকে কাঁচা পাকা লোম দেখতে পায় সে এবার। বিড়ির গন্ধ। অন্য চেনা গন্ধটা বিড়ির। শামসুর খুব নৈমিত্তিক, উদাসীন চালে অঞ্জনের চুল কেটে চলে। ঘাড়ে, কানে খুচরো চুলের সুড়সুড়ি টের পায় সে। সহসাই নিজের কাছে বড্ড নগ্ন হয়ে পড়ে অঞ্জন। এটা কী হল? বুক ধড়ফড়টা বলে দিচ্ছে ব্যাপারটা কল্পনা নয়। নয়। আরও যেটা তাকে খোঁচাচ্ছে, সেটা কী হতাশা? 
 
সময় চাই অঞ্জন, সময় চাই। ভালো করে ভাবো। তুমি নিজেকে সমর্পণ করে দিলে এক্ষুণি। 
না। না। না। ও জোর করছিল। 
করছিল না। তুমিও জানো। করছিল না। তুমি নিজের ইচ্ছের সম্মুখীন হতে ভয় পাচ্ছিলে, তাই ওকে দিয়ে জোর করিয়ে নিলে… 
 
“দাড়িটা রাখবে না উড়িয়ে দেবো?” 
 
চেয়ারে ছিটকে উঠে বসে অঞ্জন। শামসুরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে সে। 
 
“কী হল? সাপে কাটল নাকি?”
 
শামসুর কাঁচি ধোয়। নীরবে কুড়িটা টাকা আয়নার সামনের টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসে অঞ্জন। ভীষণ ভয়ে। 

ট্যাক্সিওলা

“বাঙ্গালি হো?”
 
অনসূয়া, কী ভাগ্যিস আমি বাঙালি। এ শহরে দেরীতে ভোর হয়, আরও দেরীতে সন্ধে। চারখানা মোজা পরে ভবঘুরে একজন সেঁকিতেছে তাপ ফুটপাথে, ছেঁড়া কাগজের অনলে। শৈত্যপ্রবাহে নাসিকার জল তার গুম্ফে তুষারপাত করে। অনসূয়া, গুম্ফ মানে কি গোঁফ, নাকি গুহা? আমি বাঙালি বটে, কিন্তু তেমন লিখতে টিখতে পারি না। আর দস্তানা পরে কলম ধরাও বেজায় কঠিন। এ শহরে সকলে উষ্ণতা খোঁজে, উষ্ণতা অমিল। চিঠিতে কি সাধুভাষা লিখতে হয়? শুরুতে প্রিয়তমা জুড়ে দেওয়া উচিৎ ছিল? না, সেটা ভুল হত। 
 
অনসূয়া, আমার দু’টো ঢাউস ব্যাগ ট্যাক্সির ডিকিতে। আর কাগজপত্র সমেত পিঠের ব্যাগটা সাথে, ওইটে কাছছাড়া করি না, কোলে পিঠে নিয়ে ঘুরি। ট্যাক্সির সামনেই বসেছি, বেজায় বাজে বকে তোমার ট্যাক্সিওলা। এখন মিচকি হাসছে, লজ্জা লজ্জা মুখ করে। একটু আগে অবধি ধারাবিবরণী দিচ্ছিল, “ঐখানে বোমা পড়েছিল বিশ্বযুদ্ধের সময়, আর ওই সুরকির দেওয়ালে রোজ রাতে কেউ বা কারা এঁকে যায় কিছু, ভোরবেলা মুছে দেয় রাতজাগা দ্বারিকের দল।”  ট্যাক্সিওলা তোমার লোক মন্দ নয়, অনসূয়া, তোমার একখানা ছবি সেলোটেপ দিয়ে সাঁটা তার স্পিডোমিটারের উপর। তোমায় দেখতে ভালো। এ কথা সে জোর দিয়ে লিখতে বলেছে আমায়, তুমি ভুরু কুঁচকে তাকালে সে দেওয়ালে মাথা ঠোকে। তুমি নাকি বড় তাচ্ছিল্য কর তাকে, আমার কাছে নালিশ করেছে তোমার ট্যাক্সিওলা। তুমি ভারী বিদূষী, সে জানিয়েছে আমায়। তোমায় প্রসন্ন করতে বেশ উদগ্রীব সে। অনসূয়া, খুশি হও, সুখী হবে। 
 
আমার এখানে নেমে যাবার কথা। তোমার ট্যাক্সিওলা আমায় নামতে দিচ্ছে না, একখানা কাগজ কলম দিয়ে বলেছে তোমায় চিঠি লিখতে। আমি বললুম “তুমি হিন্দিতেই বল, আমি তর্জমা করে নেবো।” সে কথা সে শুনলে না। বলল “তুমি লেখ। আমার কথা লেখ। এই এত যে গল্প বললাম তোমায়?” তা ঠিক। অনেক কাহিনী তোমার সে শুনিয়েছে রাস্তা জুড়ে। তোমার বাবাটা ভীষণ পাজি আর তোমার ভাই আস্ত বিচ্ছু। সকালের চায়ে সর পড়া দেখতে তোমার ভালো লাগে। ও নাক খুঁটলে তোমার প্রবল আপত্তি, ও ঢেঁকুর তুললে তুমি কটমটিয়ে তাকাও। তুমি ওস্তাদের মত সিগারেট খাও, আর আনাড়ির মত রাস্তা পেরোও। রুমি তোমার প্রিয়, আর রুমাল হারানো স্বভাব। তুমি নাকি উর্দুর মত বাংলা বল, সত্যি? 
 
তোমার ট্যাক্সিওলা ভালো আছে অনসূয়া। ফাঁকা রাস্তায় খোলা সিগনাল ভুলে দাঁড়িয়ে থেকে উদাস হয়ে বিজ্ঞ দার্শনিকের মত সে বলেছে “মন খারাপ আর খারাপ থাকার মধ্যে অনেক তফাৎ, বাঙালি, There’s a difference between being sad, and being unhappy.” ও হ্যাঁ, তোমার ট্যাক্সিওলা এখন ঝরঝরে ইংরেজি বলে, তাকে এ শহরের মানুষ ডাকে ক্যাবি বলে। উন্নাসিকের মত সে বলেছে “কলকাতা একটা মোটামুটি শহর।” আমার তাতে রাগ হয়েছে অল্প। জানি, তোমারও হবে। তবে তোমার ট্যাক্সিওলা এখন ভালো আছে। ব্যাঙ্কে আর তোষকের তলায় সে জমাচ্ছে অল্পবিস্তর, অন্য কারুর ট্যাক্সিওলা তাকে জন ডেনভার শুনতে শিখিয়েছে। তার পাশের বাড়ির দোতলায় একটি মিষ্টি মেক্সিকান মেয়ে থাকে, সে কথা তোমায় বলতে মানা, তাকে তোমার ট্যাক্সিওলা আড়চোখে দেখে। তুমি শুনলে হাসবে, জানি, কিন্তু ক্যাবি ভায়া তোমায় একটু ভয় ও পায়। 
 
ছেলেটা এখন ডিকি থেকে মালপত্তর নামাচ্ছে। ভেবেছিলাম ভাড়াটা সে নেবে না আমার থেকে, কিন্তু সে বেলা তার কবিত্ব মাথায়। তাকে টিপস দেবো না। বাজে ছেলে। 
 
ভালো থেকো অনসূয়া। 

নিশ্চয়

“তুমি এখন কোথায়?”

এটাই শেষ বার্তা যেটা পেয়েছি। একটা সোজা প্রশ্ন। আমি এখন কোথায়। উত্তর দেওয়া হয় নি। তার একটা কারণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আরেকটা কারণ আমি কোথায়, সেটা জানিনা। কিন্তু আমার গতিবেগ সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। ন’শো বারো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলে এক্ষুণি। হাইজেনবার্গ এর ফরমান, নড়চড় হবার উপায় নেই। হামবাগ সূর্যটা সময়ের আগেই উঠে পড়েছে। হিয়ার কামস দ্য সান। পূব দিকে চলেছি। সময় হারাচ্ছি দ্রুত। ভূগোলমাল।

কিন্তু আমি কোথায়, জানিনা। কোথায় যাচ্ছি, জানি। কোথা থেকে আসছি, সেও জানা। কী ভাগ্যি সে দুটো আলাদা। নইলে অসীম বৃত্তে পড়ে পাক খেতে হত। উপগ্রহ হতে আমার ভীষণ ভয়। তার থেকে উল্কা হওয়া অনেক ভালো। “এই তো মা, সাদার্ন অ্যাভিনিউ, ফিরছি।” নাক বরাবর বাড়ি। নইলে ধূমকেতু। “আসছি” বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, টুথব্রাশ হাতে প্রতিবেশীর অতিথিকে বাসস্ট্যান্ড অবধি পৌঁছে দিতে পারো, রাস্তার কলে মুখ ধুয়ে হাওড়া অবধিও যাওয়া যায়, আর একটু ইতস্ততঃ ভাব দেখিয়ে “নাহ, চলুন” বলে তাদের সাথেই সোজা রাণাঘাট অবধি গেলেই বা আটকাচ্ছে কে?

অনিশ্চয়তার সূত্র থাকে? মানে, তাই বলে অনিশ্চয়তার? সূত্রই যদি থাকবে, আর যদি মানাই হবে সেটা, তবে অনিশ্চয়তা কীরকম? আহ। এঁড়ে তর্ক কোরো না। বেছে নিতে হবে, সেটাই ওনার বক্তব্য। হয় গতিবেগ, নয়ত অবস্থিতি। গাছের খেলে তলারটুকু না কুড়িয়ে বাড়ি যেতে হবে। দু’টো একসাথে নিশ্চিত ভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

“তুমি এখন কোথায়?”

পায়ের তলায় মেঘ। সিঁদুরে নয়, বিশুদ্ধ সাদা, ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপন। থেকে থেকে কান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঢোঁক গিললে খট করে খুলেও যাচ্ছে। হাওয়াই গিলে চলেছি তাই। হাওয়াইজাহাজ মেঘ গিলছে, উচ্চতা হারাচ্ছে ক্রমশ। পেট গুড়গুড়, ফাঁকফোকর দিয়ে চৌকো, আয়তকার ক্ষেত, চিকচিকে ফিতের মত নদী, বড় হতে থাকা শহর। কোমরে দড়ি বাঁধতে বলল কাপিতান। আসছি, নামছি। মাথা তোলো, দেখতে পাবে। ঠিক উপরটায়। অবতরণ জরুরী। শহরের আকাশ আর স্তম্ভ মিশে যাচ্ছে।

এসেছি। কত জোরে, জানিনা।

ছায়াপথ

দুই মাথার মোড় হয় না। ব্যাপারটা অদ্ভুত না? তিন থেকে গোনা শুরু, এক দুই এর বালাই ই নেই। আবার তিন মাথা বললেও কেমন একটা লাগে। একটা রাস্তা অন্য রাস্তায় মিশেছে। ওইটুকুই তো। না ওইটুকু নয়। দুইখানা রাস্তা মিশে গিয়ে তৃতীয় রাস্তা একটা তৈরী করতে পারে না?

সেরকমই একটা তিনমাথার মোড়ে নিজেকে আবিষ্কার করল ইলা। মুশকিল হচ্ছে কোন ধারাটা দিয়ে সে বয়ে এসেছে সেটা মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে না কোনদিকে যেতে হবে। মোড়ের মধ্যের ছোট্ট তেকোণা দ্বীপটায় দাঁড়িয়ে সে রাস্তাগুলোর নামকরণ করল। করল, কারণ সে দোকানে লেখা হরফগুলো পড়তে পারছে না, এ ভাষা তার অজানা। ইলা পূব দিকের রাস্তাটার নাম দিল নতুন গীর্জা সরণী। নতুন বা পুরোনো কোনও গীর্জাই দেখা যাচ্ছে না কিন্তু যদিও, তবে ইলা দুটো শববাহী গাড়ি আসতে দেখেছে ওইদিক থেকে, আর একটা সদ্য বিবাহিতদের গাড়ি। নতুন গীর্জা সরণী যেখানে এসে শেষ, সেখানে একটা রঙচটা ছাইরঙা তিনতলা বাড়ি। সরাইখানা। একটা বাহারি গাছ লতিয়ে উঠেছে তাতে। রাস্তামুখী জানালা গুলো বন্ধ, ওপারে সাদা পর্দা দৃশ্যমান। আর অন্যদিকের জানালাগুলোর সামনে বোগেনভিলিয়ার টব রাখা। সেই ছাই-বাড়ির একতলায় একটা ছোট্ট রেস্তোরা। ফুটপাথে চারটে চৌকো টেবিল, আর আটটা চেয়ার, আর একটা ছাউনি। তাতে কেউ বসে নেই এখন। ইলার খিদে পেয়েছে।

গীর্জা সরণী আর সুঁড়িখানাবীথির মাঝখানে জলজ্যান্ত একটা গেলবার জায়গা। তার কাঁচের জানালায় বিস্তর রঙিন বোতল, আর বাইরে একটা কাঁচা হাতের আঁকা নগ্নিকা। ইলা নগ্নিকা আঁকতে ভালোবাসে। ইলা এর থেকে অনেক ভালো আঁকে। ইলা পান করতেও পছন্দ করে, কিন্তু এখন বড্ড সকাল। রাতের অতিথিরা খোঁয়ারি ভেঙে বেরিয়ে আসছে একে একে, সকালটার ঔজ্জ্বল্য তাদের ধাঁধিয়ে দিচ্ছে খানিক, হাত দিয়ে সূর্য্য আড়াল করে অগোছালো মাতালরা বাড়ি ফিরছে। পানশালার সামনেই বাতিস্তম্ভে হেলান দিয়ে ঘুমটুকু পুরিয়ে নিচ্ছে একজন, হয়ত কাল রাত থেকেই। ইলার ঘুম পেয়েছে।

তৃতীয় রাস্তাটার নাম ছায়াপথ ছাড়া কিছু হতেই পারে না। এ রাস্তার দু’পাশ জুড়ে পিপুল গাছ বংশ এবং শাখা বিস্তার করে রেখেছে। রাস্তাটা ইলার দীর্ঘ একটা সুড়ঙ্গের মত লাগে। অন্য দু’টো রাস্তা শহরের ভিতর ঢুকে গিয়েছে, পাথর বসানো রাস্তা, দু’পাশে সারি দেওয়া বাড়ি। হেলান দিয়ে রাখা সাইকেল। ছায়াপথ একটু এগিয়েই মাটি নিয়েছে। এটা তার মানে শহরের একটা প্রান্ত, ইলা ভাবে, ছায়াপথ দিয়ে তার প্রবেশ। কিন্তু ইলার মনে নেই, তার শহরে ঢুকবার কথা, নাকি প্রস্থান করবার।

ছায়াপথ আর সুঁড়িখানাবীথির মাঝখানে ইলা একটা স্টুডিও দেখতে পায়। অবাক হয়। পান্থশালার মানে আছে, পানশালাও বোঝা যায়। কিন্তু তাই বলে শহরের প্রান্তে ছবিঘর? ছবি তোলাতে এতদূর কে আসবে? উৎসুক হয় ইলা। ব-দ্বীপ থেকে হেঁটে রাস্তা পেরোয়, অবারিত দ্বার। দরজার উপরে একটা কিছু বড় হরফে লেখা। জ্বলজ্বল করছে। ভিতরে ঢুকল ইলা। কই, কেউ নেই তো? দেওয়ালে হাজারো হাসিমুখের ছবি। সামনের কাঁচের টেবিলের উপর তারিখ দিয়ে খাম সাজানো। শেষটা সতেরোই। উচিৎ নয়, ইলা, ঠিক হবে না কাজটা। কিন্তু কৌতূহলের কাছে ঔচিত্যবোধ কবে জিততে পেরেছে? এদিক ওদিক দেখে খাম থেকে ছবিগুলো বের করে দেখতে থাকে সে। এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে তোলা প্রত্যেকটা ছবি। ইলা চিনতে পারে। বাইরের মোড়ের ব-দ্বীপটায় দাঁড়ানো সকলে, পিছনে ছায়াপথ। প্রত্যেক খামের ছবিগুলো আবার সকাল থেকে রাতের ক্রমান্বয়ে সাজানো। সাধারণ মুখ গুলো, বড় সাধারণ, তবু কী নেশায় সে উল্টে দেখতে থাকে…

চোদ্দ তারিখের বারো নম্বর ছবিটায় থমকে গেল ইলা। যাবারই ছিল, নইলে গল্পটা মিছিমিছি এতদূর এগোলই বা কেন? ছবিটা প্রায়-সন্ধের। ছবিটা ইলার। ছবিতে সে একই পোশাক পরে রয়েছে সে। ছায়াপথে সূর্যাস্ত হচ্ছে। মুখে হাসি ফোটে ইলার। এ শহরে সে চোদ্দ তারিখ এসেছিল। সুঁড়িখানাবীথি অথবা নতুন গীর্জা সরণী ধরে সে আবার এই মোড়ে পৌঁছেছে।

এখন যাবার সময়। ইলা ছায়াপথের দিকে পা বাড়ায়।

দাদরা

নীল রঙের পর্দা। পলিথিনের পর্দা। এপাশে অন্দরমহল। ওপাশে রেস্ট অফ দি ওয়ার্ল্ড। মাঝখানে নীল পলিথিনের পর্দা। 
 
চেনের গোড়ায় তেল দিতে হয়। দেওয়া হয়নি বহুকাল, বোঝাই যাচ্ছে। দাদরা মেনে ক্যাঁচ কিচ কিচ ক্যাঁচ কিচ কিচ করে যাচ্ছে সে চেন। বড্ড শিস পায় এই সময়গুলোয়। বিশেষতঃ যখন কথা বন্ধ। ক্যাঁচ কিচ কিচ। ভালোবেসে সখী ধা ধি না না তি না তুমি কেশেছ কি?  ক্যাঁচ কিচ কিচ ক্যাঁচ কিচ কিচ। কাশি হয়না। ভুবনবিদীর্ণ একটা হাঁচি হয়। তারপর নিঃশ্বাসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বেড়িয়ে আসা একটা “অসহ্য!”  খাঁচার এপাশের শিকগুলো বিঁধছে। বড্ড জায়গা নিয়ে বসেছে ও। সিংহীভাগ। প্রায় অশ্রুত “সরি”র পর শিস চলতে থাকে। দাদরা চলতে থাকে। রিকশা চলতে থাকে। বৃষ্টি চলতে থাকে।
অথচ অম্বুজা সিমেন্টের থেকেও নিরেট সে পর্দা।  কিন্তু সম্ভাবনাগুলো মাঠে প্রাণ হারাচ্ছে। কেবল একটা ঘ্যানঘেনে উশখুস। ষোল টাকা উশুল হল না, হল না। খাঁচাযাপন মুলতুবী। নীল পর্দার আড়াল রিকশাটাকে পাল্কি করে তুলেছিল রে। হুম হু না। ক্যাঁচ কিচ কিচ। চকরাবকরা রঙিন কাগজে মোড়া রথ হলেই হত তাহলে। বিশ্বের লোক দেখতে দেখতে যেত। দু’টো নকুলদানা ফাউ পেত বরং। জানি তুমি অনন্য ক্যাঁচ কিচ কিচ আর কি এ সওয়া যায়?
একটা বিপ্লবের চেষ্টা হয়। ঘুরে দাঁড়ানোর। আসলে ঘুরে বসার। ওর দিকে। প্রশাসন দক্ষভাবে সে প্রয়াস দমন করেন। পরিস্থিতি আয়ত্তে। ওর আয়ত্তে। পরিমিত যুদ্ধজয়ের হাসি। ক্যাবলার অপ্রতিভ খাঁচার বাইরে তাকানো। বারো টাকার পথ পেরিয়ে গেছে। এখন নেমে পড়লে লস। আর ছাতাও নেই। নইলে এক্ষুণি নেমে পড়ত। নেমেই পড়ত। নেমে পড়াই উচিৎ। নেমেসিসের সাথে পর্দাবন্দী রিকশা সফর নামুমকিন।
ব্রিজের ঢাল, বাম্পার, কেবলের লাইনের খন্দ বাঁচিয়ে নীরবে শেষ চারটাকা অতিবাহিত হয়। শশীকান্তর বড় শখ রিকশায় একটা মিটার লাগাবে। আর একটা জয় জগদীশ হরে হর্ন। ভ্যাঁপুটা বড় সেকেলে। আর পর্দাপ্রথা ঘুচিয়ে দিয়ে আর সবার মত সামনে রড লাগিয়ে একটা ছাদ বানাবে। নইলে তাকে ভিজতে হয়। প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের শিরস্ত্রাণ খুলে পবন সারথি অপেক্ষা করে তার সওয়ারিদের নেমে আসার। কেউ আসে না। একটা সলজ্জ মুখ উঁকি দিয়ে বলে “এক মিনিট।” ভিতর থেকে আওয়াজ আসে। “মিটার চালু রাখো।”

শেষ

যাবি?
জঙ্গলটা ঝুপ করে শেষ হয়ে গেছে। রাস্তাটা আঁকার সময় অসাবধানতাবশে হাতটা ছবির পাতা ছাড়িয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল তুলি সমেত বলে সেই শেষের আকস্মিকতা পেরিয়েও একটু এগিয়ে আছে। জঙ্গলটা এতক্ষণ গিলে রেখেছিল রাস্তাটাকে, এবার একটু আলোর মুখ পাওয়া গেল সুড়ঙ্গের শেষে। দুই পথিক “নাহ ঠিক রাস্তাতেই এসেছি” আর “এসে গেছি!”‘র হাসি ভাসালেন একে অপরের দিকে। পাঠক লক্ষ্য করলে দেখবেন যে এই পথিকেরা শ্রান্ত নন। এদের কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে না। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করবার ছাপ নেই তাদের চেহারায়, দেহভঙ্গিতে। আবার পথশেষের উত্তেজনাও নেই। না, ব্যাপারটা বুঝুন। শৃঙ্গজয়ের উত্তেজনায় ভোলা ক্লান্তি এদের নয়, যাত্রার অবসন্নতায় প্রান্তদর্শনের মজাই মাটি, সেরকমটাও দেখা যাচ্ছে না। দেখুন না, ওই যে। ওটা আনন্দ, পাঠক, ওটা শান্তি। এ জিনিস আপনারা দেখেন নি। দেখে নিন।
চল!
ঘাস কাদার উপর থেবড়ে বসে পড়ল থীবি। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা বড় নিঃশ্বাস ছাড়ল নিয়া। পৃথিবীটা এখানে শেষ হয়ে গেছে। এই যে সামনে খাদটা, এর ওপারে আর কিছু নেই। খোলা আকাশ। নিয়া উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে সে খাদের কিনার থেকে মুখ বাড়িয়ে দিল। নীচে তাকালে মাথা ঘোরে না। নীচে কিছু নেই। সামনে কিছু নেই। পিছনে একটা হঠাৎ শেষ হওয়া জঙ্গল, গোটা দুনিয়া। আকাশটা খুব স্পষ্ট নয়। মিহি কুয়াশা গায়ে ঠেকে। ছেঁড়া ঘাসগুলো নিয়ার পিঠের উপর ছড়িয়ে দিল থীবি। তারপর ঝুঁকে শুয়েই পড়ল তার পাশে।
“এখানেই, না?”
“হ্যাঁ। এটাই। এখানেই।”
“এরকমই হবে ভেবেছিলাম। ঠিক এইরকম। শুধু একটা লেবুচাওলা ছিল সেখানে।”
“চাঁদ ছিল না?”
চাঁদ ছিল, নিয়া জানে। চাঁদটা সবখান থেকে দেখা যায়। এখান থেকে যাচ্ছে না। এটা দুনিয়ার শেষ প্রান্ত, পৃথিবী এখানে ফুরিয়েছে।
“যাবি, থীবি?”
“চল!”
ঘাস ঝেড়ে দু’জনে উঠে দাঁড়াল। পা বাড়াল খাদে।

ময়নাতদন্ত

সুজন ফট করে মরে গেল।
এই গতকালই আইসক্রিমের কাঠিচামচ দিয়ে ভাঁড় থেকে রসমালাই খুঁটে খাচ্ছিল, তারপর আজ মরে গেল। খুবই সামান্য, স্বাভাবিক মৃত্যু। সেরকম ঘটনাবহুল নয়, চাঞ্চল্যকর কিছু ছিল না তাতে। ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে মিনিবাস চাপা পড়েনি, মেট্রোয় ঝাঁপ দেয়নি, ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েনি, বিষ খায়নি, কঠিন কোনও অসুখ তার ছিল না। স্রেফ মরে গেল। তপসিয়ায় দিদুনের বাড়ি গিয়েছিল বিকেল করে, ঘণ্টা দেড়েক থেকে উঠি উঠি করছিল। কাজ ছিল না তেমন, মাসের ওষুধটা দিল, আর যত আজাইরা কথা। উঠেই পড়ল শেষ পর্যন্ত, বলল “এবার তাহলে আসি?”। তারপরেই মরে গেল। সাবধানে যেতে বলেছিল দিদুন। সে সাবধানেই গেছিল, তবে সোজা পথে নয়। চৌরঙ্গীতে মস্ত ঢ্যাঙা একটা বাড়ি হচ্ছে, চারু মার্কেট থেকেই দেখা যায়, তার ঠিক তলায় দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে উপর অবধি দেখল সুজন। বিড়বিড় করে আশীর্বাদ দিল কি? জাকারিয়া স্ট্রিটে হাঁটল খানিক, খেলো না কিছু। গোরস্থানের পাশ দিয়ে অটোতে বেরিয়ে গেল, ঢুকল না। সুজন গোরস্থানে ঢুকল না! সুজন শোভাবাজারে রঙিন গলির সামনে দাঁড়াল, অসঙ্কোচে হেঁটে গেল সায়া- ব্লাউজদের মধ্যে দিয়ে। বাকি ছিল। হেঁটে যাওয়াটুকু বাকি ছিল। একজন হিজড়ে পথ আটকে দাঁড়াল তার, বেরোবার মুখে, সঙ্গিনী বেশ্যাটি তার গাল টিপে দিল। আজ ভয় পেলো না সুজন, জানালার কাঁচ উঠিয়ে দিল না, নিরুপায় হয়ে দশটাকা দিয়ে নিষ্কৃতি কিনল না। হাসল। “ভালো থেকো তোমরা”, সে বুকে জড়িয়ে ধরল তরুণী বেশ্যাটিকে। জীবনের প্রথম আলিঙ্গন পেল কুমারী।
তারপর বাড়ি ফিরল সুজন। দরজায় তালা দিয়ে মরে গেল।
ময়নাতদন্ত নামটা খুব অদ্ভুত। ময়না। অন্ধকারে অদৃশ্যপ্রায়। গলা শুনে বোঝবার উপায় নেই। রাতের বেলায় অভিজ্ঞ কান চেনে শুধু। পোস্টমর্টেম বইতে লেখা বিজ্ঞান, ওতে কি আর আর সব ধরা পড়ে? পড়েনি। সময়টুকু জানা গিয়েছিল শুধু। স্বাভাবিক মৃত্যু, মাথা নেড়ে ডাক্তার বলেছিল। ঝুপ করে দৈহিক ক্রিয়া বন্ধ, ফুলস্টপ। কেন? ময়নাতদন্তের প্রয়োজন, সুজন কেন মরল জানতে। কার শ্রবণ অত তীক্ষ্ণ?
 
জানা গেল না। কেবল জানা গেল সুজন বাড়ি ফিরে দরজায় তালা দিয়েছিল। হলুদ ঢোলা টিশার্ট ছেড়ে সাদা ঘরের জামা গলিয়ে নিয়েছিল গায়ে। আর কোমরে ঢিলে পকেট ছেঁড়া হাফপ্যান্টটা। পাখা চালিয়ে পায়ের দিকের জানালাটা খুলে খয়েরীর উপর সাদা ফুল ফুল চাদরটা টেনে শুয়ে পড়েছিল। জানা গেল না “কাল একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে”, ভেবেছিল কিনা সুজন। হয়ত যাওয়ার ছিল না আর কোথাও। ব্যাঙ্কে না, রাণীকুঠিতে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে বিল জমা দিতে না, দাঁতের এক্স রে করাতে না, পার্ক সার্কাস ময়দানে অপেক্ষা করতে না। হয়ত সুজনের আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই।
 
জানা গেল না সুজন আর একটু ঘুমোতে চেয়েছিল কিনা? আর একটু, আরও একটু।