অটোর লাইন জিনিসটা বড্ড বিরক্তিকর একটা সময়যাপন। হামেশাই মনে হয়, যত সময় যাদবপুর থানার সিগনালে আর বিভিন্ন জায়গায় অটোর অপেক্ষায় কাটিয়েছি, তা সম্পাদক মহাশয় কেটে বাদ দিলে এখনও তিরিশের ভালো দিকে থাকতাম। যাক সে কথা। সময় নষ্টের কথা লিখে আরও একটু সময় নষ্ট করি। পাঁচজন না হলে অটো ছাড়বে না। কিছুতেই না। তাই আনন্দপল্লীতে যখন এগারোটা নীল-সাদা অটো বা হলদে-সবুজ সিএনজি ওরাংওটাং মাছি তাড়াচ্ছে, আমরা কাঠফাটা রোদে গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছি। ভূগোলটা বুঝিয়ে বলা দরকার। আনন্দপল্লী হল অন্দরমহল। গাছতলা হল হাওড়া-গড়িয়া ছ’নম্বর রুটের ঘাট। যাবতীয় অফিসযাত্রী সকালে অটো ধরে আনন্দপল্লী থেকে গাছতলা ছোটেন। অটোগুলো গাছতলায় জমা হয়। আনন্দপল্লীতে তখন রেশন দোকানের মত ভিড়। বেলাবেলি ফেরবার সময় গাছতলায় মিনিবাস বা ডিঙি নৌকো থেকে নেমে বাবা লোকনাথকে নমো করে অটোর জন্য হত্যে দেন। কারণ আনন্দপল্লীতে তখন এগারোটা নীল-সাদা অটো বা হলদে-সবুজ সিএনজি ওরাংওটাং মাছি তাড়াচ্ছে। আমি আর মা যখন স্কুল থেকে ফিরতাম, তখনও গাছতলায় অটো থাকত না। অটো স্ট্যান্ডের পাশে একটা শহীদ বেদী ছিল। গরমকালে সিপিয়েমের। শীতকালে তেরঙা। একই বেদী। আলাদা মন্দিরা। সে যাই হোক। তার উপর একটা লোক দূরবীন হাতে দাঁড়িয়ে থাকত। কালীবাড়ির ব্রিজের উপর স্লো মোশনে যেন দিগন্তের উপর থেকে একটা তিন-চাকা গাড়ি হঠাৎ করে উদয় হয়ে অ্যাডভেঞ্চার সিনেমার কায়দায় এ’দিকে আসছে। ঝিমিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে ভিন-দ্বীপে আটকে পড়া অভিযাত্রীর রেসকিউ মিশনে আসা হেলিকপ্টার দেখতে পাওয়ার মত উৎসাহ। “আনন্দপল্লী তো দাদা?” দূরবীন বলেন, “আপাততঃ শুধু পল্লী দেখতে পাচ্ছি।” উত্তেজনা বাড়ে। তারপর পল্লীশ্রী লেখা একটা অটো এসে রাস্তার ওপাশে দাঁড়ানো তুলনায় ছোট সর্পিল লাইনের সামনে দাঁড়ায়। সে লাইনের প্রথম পাঁচজন বিজয়ীর হাসি হাসে। আমি মাকে বলি, “এবার তো একটা বিগ বাবুল কিনে দাও?”

এ হেন লাইনের একঘেয়েমি কাটাতে নানারকম কৌশল করতাম। একদিন মাকে বললাম, ওই সত্তর মতো পাবো। মায়ের ভুরু হাল্কা কোঁচকালো। কেন? আমি দেখলাম এই সুযোগ, একটা এডুকেটেড গেস করলাম। এতজনকে সাক্ষী রেখে নিশ্চয়ই মা খুন করবেনা আমায়। বললাম, পঁচিশ ছেড়ে এসেছি তো, তাই। বাকি পাঁচ নম্বরের একটা ইয়ে আছে, ঘাপলা। মিলতেও পারে। না-ও মিলতে পারে। মনে হয় মিলবে না। ওদের এসেছে একশো একুশ। আমার এসেছে মাইনাস সেভেন্টি টু। সম্ভবত কোথাও একটা ইঞ্চি থেকে মিটারে বদলাতে ভুলে গেছি। আমার এডুকেটেড গেস সম্ভবত ভুল ছিল। কারণ মা প্রথমে ছাতা বন্ধ করল। তারপর সে’টা শর্ট অফ গুড লেংথ বলে হুক করবার মত নেমে এলো আমার মাথা লক্ষ্য করে। আমি সজাগ আম্পায়ারের মত সে’টা এড়ালাম। ছাতাটা সদ্য এসে দাঁড়ানো আনন্দপল্লী – গাছতলা লেখা অটোটার সামনের ডানদিকের কাচে লাগল। এবং কাচটা ভেঙে গেল। গোটা গাছতলা তখন নখ খুঁটতে খুঁটতে ম্যাচ দেখছে। মা থতমত খেয়ে স্যরি স্যরি কাচের দাম কত ইত্যাদি বলবার আগেই থার্ড আম্পায়ার অটো-বাবলু ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বলল, “দিদি। ও কিছু না। কিছু না। আমি সারিয়ে নেবো। আর মারবেন না।” আমার ভীষণ হাসি পেলো। বাবলু নিশ্বাস চেপে খুব আস্তে করে বলল, “মারলে বাড়ি গিয়ে মারুন।” বাড়িতে কী হয়েছিল, সে’টা অটো লাইনের গল্প না।

অটোর লাইনে এমন অনেক কিছু মজার মজার জিনিস ঘটত। সে’বার প্রায় চল্লিশ মিনিট দাঁড়ানোর পর একজন দাদু লাইনের মাথায় এসে জানতে পারলেন তিনি ভুল লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে তখন কে সান্ত্বনা দেয়? জানা গেল তিনি ঠিক তাঁর আগের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেছিলেন এ’টা তাঁর গন্তব্যের লাইন কিনা। ভদ্রলোক ইতিবাচক মাথা নেড়েছিলেন। তারপর শেষ অটোয় উঠে চলে গেছেন। তাই তাকে ধরে জবাবদিহি চাইবার উপায় নেই। আমার খুব মজা লাগল। সেই ভদ্রলোক দারুণ ফাটকা খেলেছিলেন। হয়ত হিসেব করে দেখেছিলেন লাইনে তাঁর নম্বর পাঁচের গুণিতক। তিনি এবং দাদু যেহেতু একেবারেই আগুপিছু দাঁড়িয়ে, অন্যকিছু হলে তাঁর ধরা পড়ে যাওয়া এবং ক্যালানি খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। হিসেবে রাখতে হবে, লাইন ও হাল ছেড়ে মাঝখানে কেউ বেরিয়ে গেলে তাঁর কপাল পুড়ত। সেই থেকে বুঝি মডিউলার অ্যারিথমেটিক চেপেছে মাথায়। আমি হেব্বি বুদ্ধিমান, তাই তো? তাই ভাবতাম। তা নয়। একেবারেই নয়। কোনও অজ্ঞাত কারণে আমি পেয়ারার বীজ খেতে ভালোবাসতাম। চিবিয়ে না। গিলে। কপ করে। এবং হাজার “পেটে গাছ হবে”তে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু বিশ্বাস একদিন জন্মালো। জন্মালো অটোর লাইনেই। আমাদের পিছনে একজন প্রবল অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এসে দাঁড়ালেন। তাঁর ছানা-ভুঁড়ি আমার মাথায় মাথায়। আমি চোখ বড় বড় করে দেখছি। মহিলা হাসলেন। মা-ও হাসল। চেনা?

মাঃ “ডাক্তারের কাছ থেকে?”
কাকিমাঃ “হেহে হ্যাঁ”
মাঃ “কদ্দিন?”
কাকিমাঃ “সাত চলছে…”

আমি মায়ের আঁচল টেনে প্রায় কাঁধে উঠে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম ওঁর কী হয়েছে। মা ততোধিক আস্তে আমায় বলল, “তরমুজের বীজ খেয়ে নিয়েছিল।”