লিখিত আছে দেওয়াল জোড়া, গুপ্ত কোনও শহরে,
কথিত আছে, রেণুর মতো হাওয়ায় ভাসে জবাব,
বর্ণ সবই বর্ণিত হয় পর্যটকের খাতায়,
আমার খালি টুকরো অতীত খুঁজে চলাই স্বভাব।

সমীরণ মাতাল হয়েছে। ঠিক যতটুকু হলে সে মাতাল থাকে, অথচ তাকে ঝড় বলে দীক্ষিত করা যায় না, ততটা। অর্থাৎ একা সে বাড়ি ফিরতে পারবে, কিন্তু গাড়ি চালানো মানা। অর্থাৎ বেসুরো গলা ছেড়ে গান গাইছে, কিন্তু কমোডে বমি করছে না। অর্থাৎ সে ঘর অন্ধকার করে বাইরে সিঁড়িতে বসে আউলা কথাটার অর্থ খুঁজছে, কেঁদেকেটে পাড়া মাথায় করছে না। সিঁড়িতে আলো কম। বাড়িওলাকে বলে বলেও আলোর ব্যবস্থা করা যায়নি। এখন মনে হচ্ছে ভালোই হয়েছে। বেশি আলো হলে মাথা ধরত। দূরে শহরটা নিভু নিভু হয়ে আছে। আকাশ লাল। আর সমীরণ মাতাল। বাতাস লিলুয়া। হাওয়া আউলা।

চাঁদ পাণ্ডুর। কোথাও একটা কোনও একটা বাড়িতে কেউ তাস খেলছে। রেকর্ডে গান চলছে। হোয়ার দ্য রাম ইজ ফাইন এনি টাইম আ ইয়ার। রান্না হচ্ছে সে’খানে। নিজে নিজেই হচ্ছে। কে মাঝেমধ্যে খুন্তি নেড়ে আসছে, সে খেয়াল কারও নেই। আর একটু পরে ভাত চাপানো হবে। একটু পরটা আর আসছে না। রঙ ডাকা চলছে। সবাই খুব হাসছে। সমীরণের মনে হয় আর সবকিছু পিছলে যায়। শুধু সিঁড়ি অবিনশ্বর। এখানকার মেঘগুলোও অচেনা। পাইনহাটার মত অমন সুন্দর রঙ ধরে না গোধূলিতে। গাছগুলোও ফ্যাকাশে। যেমন করে কয়েকযুগ আগে এক বসন্তে ফটিকের খোলস ছেড়ে জন্ম হয়েছিল ইলতুৎমিশের, তেমনি করে শুকনো ত্বক ঝেড়ে ফেলে বুঝি জন্ম হবে সমীরণের। মিশের আয়ু ফুরিয়ে এলো। অথবা, সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ডে এখন দীঘির গল্প। অনেক, অনেকদিন আগে এক ক্ষমাময় বোনের কাছে এই গল্প শুনেছিল ইলতুৎমিশ। একটা জায়গা আছে, একটা গ্রাম। গ্রামের প্রান্তে একটা দীঘি। গ্রামের নাম দীঘি, দীঘির নাম ঝিনুক। একটা চক্র সম্পূর্ণ হয়েছে। পাইনহাটায় একটা কাল্পনিক রেলস্টেশন ছিল। রেলের মাঠ ছিল। ঝোলাঝুলি নিয়ে ফটিক নেমেছিল সে’খানে। এখানে সত্যি সত্যি স্টেশন আছে। চাকা-স্যুটকেস নিয়ে ইলতুৎমিশ নেমেছে। চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যায় সমীরণের।

কী কথা যেন হচ্ছিল? কোথাও একটা কোনও একটা বাড়িতে একটা মেয়ে থাকে? তার বাড়ির নাম বাগানবাড়ি। সে’খানে রান্নাঘরে ঝাড়বাতি আছে। সে’খানে জলসা হয়। সে’খানে এখনও সারেঙ্গীটা বাজছে। ধনেপাতাগাছগুলো চিঠিসার না পেয়ে ধুঁকছে। না না। সে গল্প আরেকদিন। সমীরণের ইচ্ছে করছে একটা অন্ধকার রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে সপ্তর্ষি দ্যাখে। নিজেকে জাতিস্মর মনে হয় সমীরণের। এখন পাইনহাটা গেলে মনে হবে “আরিব্বাস, সব যে মিলে যাচ্ছে! সব কেমন চেনা! অথচ এই প্রথম এলাম।” বন্দীপুরের বাড়িতে ফিরে গিয়ে ইলতুৎমিশেরও এমনটা মনে হত।

কোথাও একটা কোনও একটা বাড়িতে এক মহিলা বকাঝকা করে এগরোল খাইয়ে পাশের বাড়ির বাচ্চা পড়াচ্ছেন। আর একটা ছেলে মশা মারতে মারতে শেরশাহের ডাকব্যবস্থা পড়তে পড়তে ভাবছে, যখন দরকার, তখন কারেন্ট যায় না কেন? আর একটা কোনও বাড়িতে একটি তরুণ রান্না করতে করতে ভাবছে, আজই খেয়ে নেবো, নাকি রেখে দেবো একটু কালকের জন্য? নইলে আবার রান্না করতে হবে। আর একটা বাড়িতে কেউ বলছে, দাঁড়া, ফোন সেরে আসছি। আর একটা বাড়িতে সমীরণ ত্রিকালজ্ঞ হচ্ছে।

বাইরে কী সুন্দর হাওয়া। সমীরণ মাতাল হয়েছে। কাল হয়ত তারও অস্তিত্ব থাকবে না।