কালিদাসের এখন মধ্যবর্তী সময় চলছে। বিশ্রাম। বর্ষার শুরুর দিকে ভারী তেজ ছিল ভদ্রলোকের। পাখনা হাওয়া বৃষ্টির ছাঁট বয়ে এনে লেপে দিচ্ছিল জানালায়। কালিদাস এক পুকুর দোয়াতে কলম চুবিয়ে বাড়তি কালি চুলে মুছে নিয়ে বৃষ্টির আওয়াজের রকমফের টুকে রাখছিলেন। শার্সির গায়ে তেরছা বৃষ্টির শব্দ। পরিত্যক্ত ফুলের টবে জল জমে তার উপর আরও জল জমার টুপটাপ। টিনের চালের মোলায়েম ধাতব ফোঁটা। দুপুর অবধি তেতে ওঠা কালো পিচের রাস্তায় ধোঁয়া তোলা চড়চড়। কার্নিশ থেকে বেতালা চুঁইয়ে পড়া টুপুস। অনেকগুলো বিন্দু জমতে জমতে ভারী হয়ে একটা বড় ফোঁটা হয়ে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়। বাকি ধারার থেকে তার তরঙ্গ আলাদা। ঢিমে। তেমন করে কান না পাততে পারলে ঝিরঝিরের থেকে তাকে আলাদা করা মুশকিল। কালিদাস পারেন। 

তারপর একসময় বৃষ্টি থেমে যায়। অন্ততঃ শব্দ থামে। কেমন বধির লাগে নিজেকে। বেথোভেন না শুনেও শুনতে পেতেন। কালিদাসও পান। বৃষ্টির শব্দ। বাইরেটা রহস্যজনক কুয়াশা হয়ে আছে। বৃষ্টির পর্দা থাকলে এরকম হয়। কিন্তু শব্দ তো নেই। ছবি আছে, শব্দ মিউট করল কে? বাইরে বেরিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হয় বৃদ্ধকে। ওমা! বৃষ্টি তো পড়ছে। দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যাচ্ছে না। হাঁটতে শুরু করলে মুখে চোখে চশমায় চুলে কাঁধে ভীষণ মিহি কী যেন ঠেকছে। অদৃশ্যপ্রায়। জামা ভিজছে না। অনেকক্ষণ হাত বের করে রাখলে, সে হাতে অন্য হাত বোলালে একটা আর্দ্রতা টের পাওয়া যাচ্ছে। অথচ হাতে আণুবিক্ষণিক বিন্দু টের পাওয়া যায় বেশ। তারপর চড়া রোদ উঠে কেলেঙ্কারি। 

শীত এখনও তেমন পড়েনি। এইসময়টা পূর্বশীত। এইসময়টা বিশ্রাম। শীত পড়লে, গোটা পৃথিবী শীতঘুমে গেলে আবার জেগে উঠবেন কালিদাস। কে বলে তিনি কেবল বর্ষা নিয়েই লেখেন। লোকে ঘুমোয়, তাই তার শীতসাহিত্য পড়ে না। ন্যাড়া গাছপালা, না-বলে-কয়ে নিভে যাওয়া সূর্য্য, ধূসর ধূসর ধূসর। কদাচিৎ বরফ। বর্ষাও ধূসর, শীতও। অন্যরকম, তবু ধূসর। কালিদাস ধূসরের কবি। তাই এখন বিশ্রাম। কত রঙ এখন। সোনালি সূর্য্যে গোটা জগতকে সারাদিন কনের মত লাগে। কত রঙ। আকাশ নীল থেকে বেগুনি হয়ে আসে। গাছ গুলো সবুজ হলুদ কমলা লাল। ফুল লজ্জা পাবে। পায়। তাই হেমন্তে তেমন ফুল ফোটে না। আবার ন্যাড়া বসন্তে ফাঁকা মাঠে বাজিমাত করবে। কালিদাস দোতলার জানালা দিয়ে দেখেন একটা পরশুরাম এসেছে। প্রতিবছর শেষ-শরৎ শুরু-হেমন্তর সময় কিছু পরশুরাম আসে। মোটা মোটা শিরীষ শালের নীচ থেকে পড়ে যাওয়া শুকনো ডাল কুড়োয়। কাঠুরে নয়, আস্ত গাছ কাটে না। গাছের খায় না ওরা, তলার কুড়োয়। ভালো লোক। মোটা ডাল হলে চোখ চকচক করে ওদের। তালে তালে কুঠার নেমে আসে। মিঠে রোদে, মিঠেতর শীতে ঘাম চকচক করে। কেটে কেটে ডালগুলোকে কাছাকাছি মাপে নামিয়ে আনে। তারপর কোলবালিশ করে নিয়ে যায়। রাত্তিরে জ্বালবে। জ্বালেও। চড়চড় আওয়াজ হয় ডাল পোড়ার। কিছু ফুলকি মুক্তি পেয়ে উঠে যায় উন্মুক্ত আকাশে, জোনাকির মত। এই সবই দেখেন কালিদাস। বিশ্রাম উপভোগ করেন। 

**********

গোড়ালি ছাপিয়ে উঠে আসা পাতার মধ্যিখানে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ইবন বতুতা। মাঝে মধ্যে ফুঁ দিয়ে চোখের উপর নেমে আসা চুলের গোছা সরায়। উঠোনটা দেখাই যাচ্ছে না। তিন চারটে ওক, মেপল ঘিরে রেখেছে উঠোন। এই সময়টা তারা পৃথিবীকে পাতা উপহার দেয়। প্রতিদান। সারাবছর আমাদের খাবার জুগিয়েছ তুমি, এই নাও, খাও। পাতা পচে মাটিতে মেশে, মাটির খাদ্য হয়। কিন্তু ইবনের উঠোন ইঁট সুরকির। ইঁট সুরকি খায়, সুরকি ইঁট। পাতা কেউ খায় না। তাই জমে জমে গোড়ালির চেয়েও উচুঁ হয়েছে। কয়েকটা ইচ্ছেমতন পাখি আর ছোটবড় কাঠবিড়ালি সেই পাতার মধ্যে লুকোচুরি খেলছে। ইবন সেই পাতার গালিচায় মচমচ করতে করতে হেঁটে বেড়ায়। কেবল সেই আওয়াজ শুনবে বলে। এখনও পাতা পড়ছে। আশির্বাদের মত ইবনের মাথা কাঁধ ছুঁইয়ে নামছে। একটা দু’টো মোড়া পাতা। আর বেঞ্চি। লোকজন এলে বসবে। কিন্তু উঠোন কই? কোথায় সে? ইবন আবার ফুঁ দিয়ে অবাধ্য চুল সরায়। তারপর হাঁক পাড়ে। “ইলতুউউউউউ”। যো হুকুম বলে দুইখান ডাইনীর ঝাড়ু নিয়ে কে জানে কোথা থেকে হাজির হয় ইলতুৎমিশ। পাইনহাটার একসময়ের অবিসংবাদী সম্রাট, অবসরপ্রাপ্ত কাপিতান ইলতুৎমিশ। পাইনহাটার প্রজারা এখনও ভয় খায়। মোড়ের মাথায়, গোলবাড়ির সামনে, রাজবাড়ির আশেপাশে ভূত দেখবার মত ইলতুৎমিশ-দর্শন করে তারা। “মাইরি বলছি। এইত্তো দেখে এলাম! মীরাবাঈএর ভিতর থেকে কালো শাল গায়ে নেমে আসচে।” “চোখের মাথা খেয়েছিস তুই! ইলতুৎমিশ মরে ভূত হয়ে গেছে কবে!” “বা রে, আমি কাকে দেখলাম তবে? আর কাউকে না চিনি, মীরাবাঈকে তো চিনি?” মানুষ। অবোধ মানুষ। মরে গেলে বুঝি তাকে দেখতে পাওয়া যায় না? আর কেউ কি সত্যি কখনও মরে? কৈলাসে যে কালিদাস, পারস্য বাগিচায় ডালিম খেতে খেতে সে-ই কি রুমি নয়? পাইনহাটার ইলতুৎমিশ কি আগে কলকাতার ফটিক ছিল না? পাপছাতিচার দস্যুদের তাড়া খেয়ে বিমা কোম্পানির জয়লন কি ইবন বতুতা হয়ে যায়নি পাইনহাটায় এসে? ইবনকে বিমা কোম্পানির জয়লন বলে ডাকলে হেব্বি খচে যায়। যাইহোক, ইলতুৎমিশ এখন কোথায় কী নামে থাকে কেউ জানে না। শুধু কানাঘুষো শোনা যায়, একটা কুমীর পুষেছে। যার ছানা শেয়ালে খেয়ে নিয়েছিল। সেই কুমীর। 

**********

পরশুরামগুলো চলে গেছে। কালিদাস চা করতে উঠেছিলেন। সাদা পেয়ালা দুই হাতে ধরে ওম নিতে নিতে জানালার কাছে ফিরে এসে দেখেন দু’টি পাতাকুড়ুনি এসেছে। ফিঙেপাখির মত নেচে বেড়াচ্ছে উঠোন জুড়ে। দু’টি ঝাড়ু নিয়ে শুকনো পাতা ঠেলতে ঠেলতে জড়ো করছে একজায়গায়। ঢিবি হচ্ছে। এরপর পাহাড় হবে। আস্তে আস্তে পাতার তলায় চাপা পড়া প্রাগৈতিহাসিক চুন সুরকি উঁকি দিচ্ছে। ছেলেটি একটা চটের বস্তার মুখ হাঁ করে ধরে রেখেছে। মেয়েটি তার ভিতর পাতা ঠেলে ঠেলে দিচ্ছে। ছেলেটি তর্জনী দিয়ে চশমা ফিরিয়ে আনছে নাকের ডগায়। মেয়েটি ফুঁ দিয়ে চোখের উপর চুলের গোছা সরাচ্ছে। তারা হাসছে। খেলছে। এত পাতা বস্তাবন্দী করবার পর নিকোনো উঠোনের দিকে অবিশ্বাস মুগ্ধতায় চেয়ে আছে। কালিদাস লোভ সামলাতে পারলেন না। অবয়সোচিত দ্রুততায় নেমে এলেন, দোতলার জানালা থেকে, উঠোনে। 

“কারা গো তোমরা?”

“আমরা পাতাকুড়ুনি।”

“পাতা নিয়ে কী করবে গো?”

ছেলেটি মেয়েটি সলজ্জে একে অপরের দিকে চায়।

“বিছানা পাতব।” 

পাতাকুড়ুনিরা চলে যায়। অল্প ভেজা চোখে কালিদাস তাদের প্রগলভ চলে যাওয়া দেখতে থাকেন। চিরনির্বাসিত যক্ষর লোভ হয় বুঝি। বিড়বিড় করে বলেন, “মেঘদূতকে তোমরা ছুটি দাও এবার। নিজেদের কথা নিজেরাই বলে নাও। ভালো থাকো তোমরা। তোমরা ভালো থেকো।”