অথচ বেড়ালটা এ’দিকে ফিরছেনা।

গোটা বিশ্বসংসার, জগৎ চরাচর, এইদিকে বয়ে চলেছে, সাদা-কালো বিল্লি দেওয়ালের কোণের দিক মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। সিঁড়ির পাশে এক ছটাক জায়গা। কালো তেলচিটে পড়া ঝুল মাখা দেওয়াল। দেওয়ালের ওই পাশে দু’টো মস্ত কানা উঁচু তাওয়ায় কিছু মাংস তাদের নিজেদের চর্বিতে স্নান করছে। করেই চলেছে। রাবণের চিতা জ্বলছে। নীল লুঙ্গি স্যান্ডো গেঞ্জি আর খুব অল্প, সুন্দর, আহ্বানঘন, লোমশ ভুঁড়ি বের করা এক জাদুকর তার তদারক করছে। সিঁড়ি দিয়ে ক্রমাগত লোকজন উঠছে নামছে। রুমালে মুখ মুছতে মুছতে নামছে। ঢেঁকুর তুলতে তুলতে নামছে। মৌরি মিছরি চিবোতে চিবোতে নামছে। খড়কে কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে নামছে। ফেরত পয়সা মানিব্যাগে গুঁজতে গুঁজতে নামছে। একটা স্বপ্নময়, সুগন্ধী ভাত আর স্বচ্ছপ্রায় রুমালি রুটি আর লবঙ্গর ঝাঁঝ আর মুখে-দিলে-গলে-যাওয়া মাংস আর কেশর আর কাঠ-বাদামের কুচি ছড়ানো তুলতুলে মিষ্টির উপত্যকা থেকে নামছে। নেমে ফিরে আসছে পৃথিবীতে। আংটির মধ্যে দিয়ে হাতি গলিয়ে দেবার ম্যাজিকের মতো জাদু হরবখত ঘটছে এই পৃথিবীতে। ঠেলা গাড়ি আর টানা রিকশার মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে স্থাণু চারচাকা। তার ছাদে ধাধাক ধাক ধাধাক ধাক বোল তুলছে কোন খালাসির আঙুল। সাদা গাড়ি হলুদ গাড়ি নীল বাস লাল ট্রাক আর মানুষ মানুষ মানুষ মানুষ মানুষ। ওপাশের পাঞ্জাবীর দোকানের দোতলার কাচের জানলা থেকে একদল নাক-চোখ-ঠোঁট-হীন টেকো সবুজ গোলাপি নীল কাপড়ের উপর ঝলমলে জরির কাজ করা হাঁটু ঝুল পাঞ্জাবী পরা বস্ত্রবিগ্রহ ঠায় তাকিয়ে আছে এই রাস্তার দিকে। সেই রাস্তায় কেউ আদৌ এগোচ্ছে বলে ঠাহর হয় না। কিন্তু অন্যদিকে তাকিয়ে থেকে অনেকক্ষণ পর নজর ফেরালে মনে হয়, আরে তাইতো, এইত্তো পাঁচ হাত এগিয়ে গেছে ট্যাক্সিটা। অবাক কাণ্ড! এমনও হয়! এ রাস্তাতেও এগোনো সম্ভব! ব্যস্ততা আর গতিহীনতার এই অপূর্ব মিশেলের দিকে তাকিয়েও দেখছে না বেড়ালটা।

আমরা দেখছি। একটু দূরে মসজিদের চূড়ো দেখা যাচ্ছে। লাল মসজিদ। সবুজ চুড়ো। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই কীভাবে এগিয়ে গেছি। জাদুকর কখন “আমার দু’জন ভলান্টিয়ার লাগবে, এই যে আপনি, আর আপনার সঙ্গে উনি, আপনারা একসঙ্গে তো? হ্যাঁ আপনাদেরই বলছি। উঠে আসুন তো স্টেজে!” বলে ডেকে নিয়েছে। আমরা সম্মোহিতের মত রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। ক্রমাগত একে অপরকে “সরে দাঁড়া” আর “ডানদিক বাঁদিক ডানদিক” বলতে বলতে ভ্যানিশ! রাস্তা, বাস, জোড়া ট্রামলাইন, দুষ্টু লোক সবাই উবে গিয়ে একটা ঘোলা জলের নদী, একটা শ্যাওলা ঘাট, একটা “চার টাকা খুচরো দিন” টিকিটঘর, আর একটা অনাদরের নৌকো হয়ে যায়।

সবক’টা প্রেমে পড়ার পর সবাই পস্তায়। তারপর হন্যে হয়ে জীবন-বিজ্ঞানের ক্লাস পালিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। পোস্তা দেখে বলে গড়িয়াহাট। ফ্লাইওভারের নীচে এসে ভাবে ভূগর্ভে এলাম। সিঁথির মোড়ে সিঁদুরের দোকান দেবার খরচ নিয়ে আলোচনা করে। হুঁকোমুখো হ্যাংলা যে আসলে প্রথম বিশ্বের প্রিভিলেজড মানুষদের প্রতিভূ, “লোকজনের ল্যাজ থাকেই না, এ’দিকে ও দু’দু’খানা ল্যাজ নিয়ে বসে ভাবছে কী চাপ! এই সবই ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড প্রবলেম” এই জাতীয় কথাবার্তা বলে। তারপর দুম করে কী একটা অছিলায় হাত চেপে ধরে। ধরে থাকে। নৌকো একবার ও’পার যায়, একবার এ’পার ফেরে।

শুধু বেড়ালটা কখনও এ’দিকে ফেরে না।