ঠাঁই। আজ থেকে অনেক বছর আগে এই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিল ইলতু। তিলধারণের ঠাঁই মিলবে? মিলেছে। ইলতুৎমিশের তিলমাত্র জীবন ধারণ করবার জন্য যথেষ্ট। দশ ফুট বাই দশ ফুটের চেয়ে কিছু বেশি। প্রথম রাত্রে দু’টি বাক্স আর দু’টি প্যাঁটরার মধ্যে মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে ফ্রিজের ভিতর থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ পেয়ে ভড়কে গিয়েছিল সে। শ্রী চৈতন্যের নাম জপতে জপতে দরজা খুলে দেখে, কই, কিছুই নেই। আধো ঘুমে চৈতন্য ফেরেন। ইলতু বুঝতে পারে, ফ্রিজের পিছনে দেওয়াল। দেওয়ালের পিছনে আর কারও ঠাঁই। সেইখানে কাঁদছে কোনও শিশু। তারপর, তার অনেক বছর পর, আজকে আবার দু’টি বাক্স ও দু’টি প্যাঁটরা, এবং ফাঁকা ফ্রিজ। শুধু ঠাঁই-টা কখন বাসা হয়ে গিয়েছে।

তুঘলক আর মেহেরুন্নিসা যখন এসেছিলেন, এইখানেই তো। ততদিনে রান্নাঘরের বয়ঃসন্ধির তেলচিটে। “তুই রেঁধেছিস? তুই? খেতে পারব?” “অ্যাই! সত্যি করে বল! কে রেঁধেছে?” ইলতুর ছাতি তখন গর্বে বা চর্বিতে ছাপ্পান্ন। মুখ ফোটে না, কিন্তু “আহ, বাইরে রেলিঙে গামছা শুকোতে দিও না মা, বারান্দাটা আমার একার নাকি? কমপ্লেন করবে তারপর পাশের বাড়ির লোক।” আর “শোনো, স্নান করতে যাবার সময় পর্দা টাঙিয়ে নেবে কিন্তু, নইলে জল গড়িয়ে মেঝেতে পড়বে, এখানে কিন্তু ঝাঁঝরি নেই, জল জমে যাবে।” বা “এই যে হলুদের প্যাকেট। কালো জিরে তো নেই। ছুরি দিয়েই কাটতে হবে, এই এ’টার উপর রেখে। আচ্ছা দাও আমি কেটে দিচ্ছি তুমি পারবে না।” – গুলোর মধ্যে একটা নিহিত “আমার সংসারে স্বাগত” থাকে। আমার সংসারে কাঁচালঙ্কা কম পড়ে, খাট-আসবাব নেই, দু’দিন অন্তর ঝাঁট দিই, বাসনও আমিই মাজি। বড্ড আমার। শিলনোড়া নেই, বঁটি নেই। জমানো ওয়াইনের বোতল আছে, সে বোতলের কর্ক খোলার যন্ত্র আছে। আমার।

এই ঠাঁইয়ে নিম্নচাপ এসেছিল। নাকের তলা অবধি জলে দাঁড়িয়ে হাবুডুবু খেয়েছে সে। বিছানার পাশে ঘুমের ওষুধ। দেওয়ালে গর্ত। মেঝেতে ধুলো। এই ঘরে কতবার, কতবার কেঁদেছে সে। এই ঘরে সিন্ধুঘোটক এসেছে। এসে বলেছে “বাথটাবে সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছি তো ভাই, জল নামছে না তো! উপচে পড়বে এবার, ব্যবস্থা কর!” তারপর পাখা কিনে এনে বিছানার পাশে নিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছে। ফড়িং এসেছে এ ঘরে। পুজোর প্রসাদ নিতে। টুনি লাগানো দেওয়ালের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়েছে। তার বাজিয়েছে। ইলতু এ ফোর পেপারে গানের কথা লিখেছে। গোকুল এসেছে। ফ্রিজে যা পেয়েছে রান্না করেছে। কিন্তু তবু। ঠাঁই বই তো নয়। প্রতি রাতে ইলতুৎমিশ ঘুমোতে যাবার আগে ভেবেছে, আর তো ক’দিন। আর কতদিন? জমানো মায়া নিয়ম করে বাড়ির পিছনের উঠোনে ময়লা ফেলার ভাগাড়ে বিসর্জন দিয়ে এসেছে। লক্ষ্মী দরজার বাইরে এসে পাপোষ না পেয়ে ফিরে গেছেন, প্রবেশ করা হয়নি। চৈতন্যও ফেরার। প্রেশার কুকার থেকে বাড়তি ডালের জল ছিটকে দেওয়ালে লেগেছে। উনুনের চারপাশে পোড়া পেঁয়াজ। ন্যাড়া বাড়ি। গজগজ করেছে সে। “আমার বাড়ি নাকি? অন্যের বাড়ি। রিয়েলটির। আমি ভাড়া থাকি। ক’দিন বই তো নয়। আর তো ক’দিন। আর কতদিন?”

তারপর শহরে একলা এসেছে মেয়ে। রাজধানী থেকে। কী যে শেখাতে চেয়ে… সাইমন ভবিষ্যৎবাণী করে গেছিলেন। এপ্রিল, কাম শি উইল। কবে যে মাথায় ভর করল ইবন বতুতা। দেওয়ালে পোস্টার লাগল। মেঝেতে গালিচা। সস্তার। তবু নিজের তো। নিজেদের। “মশলা এমন খোলা প্যাকেটে রাখে, ইলতু? সব গন্ধ উড়ে যাবে তো?” কৌটো এলো। এক দু’টো গাছ। দলা পাকানো জামাগুলো পাট হল। সুগন্ধী মোমবাতি। “এত চোর কেন তুই? যা যা আমি করব…”। স্নানঘরের আয়না পরিষ্কার হল। তাতে এই প্রথম নিজেকে দেখতে পেল ইলতুৎমিশ। তার বগলের তলা দিয়ে গলে এসে বাষ্পে সই করে গেল ইবন। লক্ষ্মী এসে বললেন, “এ’টা কোনও ছেলের বাড়ি? হ্যাট!” লক্ষ্মী ইবনকে দেখতে পাননি। কেউ পায় না। সিন্ধুঘোটকও পায়নি। শুধু চমকেছে। তারপর ইবন কল্পনা না বাস্তব, ভাবতে ভাবতে পাঁচফোড়ন কৌটোতে ঢেলেছে ইলতু। কাঁচালঙ্কার বোঁটা ছাড়িয়ে একটা কৌটোয় একটু চালের উপর রেখেছে। “ওতে বেশিদিন টেকে।” কে শিখিয়েছে রে তোকে এত কায়দা? কে সাজিয়েছে বাসা? কে বলেছে কড়াই শুদ্ধু বাসি রান্না ফ্রিজে না ঢুকিয়ে বাটিতে ঢেলে ঢাকা দিয়ে রাখতে? কে খোলা পায়ে এলো চুলে পশ্চিমা সূর্য্যের আলোয় কল্লোলের গল্প শুনতে শুনতে চা খেয়েছে দোরগোড়ায় বসে? কার জন্য বেসিনের তলার খোপে এত প্লাস্টিক আর কৌটো জমানো? কাকে দেখে কাঠকয়লায় আঙুল দিয়ে ধ্যাবড়ানো মুখ আঁকা? “আমার জন্য”, ভেবেছে ইলতুৎমিশ। “আমাদের জন্য। আমারই তো বাড়ি। রিয়েলটির ভাড়া গুনি বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? ঠিকানায় তো আমারই নাম, নাকি?” তারপর ইবন একদিন বলেছে, “আমার ছেড়ে আয় ইলতু।” ইলতুৎমিশ সে’দিন রাত্রে ঘুমোতে যাবার আগে ভেবেছে “থাক না। আর তো ক’দিন। না হয় করেই নিলাম ঝুটো সংসার কুটো প্রেমিকার সঙ্গে দু’টো দিন। ক’দিন বই তো নয়।”

তিল কখন তাল হয়ে গিয়েছে। ব্যাচেলরের আবার পিএইচডি। চলনে যত্ন বেড়েছে, না? একরত্তি ঠাঁই, এক কৌটো মায়া সুদে আসলে একটা বাসা হয়ে গেছে।