বিদেশে এসে কেতা শিখেছি। রাস্তায় এক্লেয়ার্সের খোসা ফেলিনা। পকেটে রাখি। জায়গা মতন ময়লার বালতিতে ফেলি। দু’টাকার চানাচুর কিনে ঠোঙা হাতে নিয়ে থ্যাংক ইউ বলি। হিস্প্যানিক মানুষ দেখলেই মেক্সিকান আর প্রাচ্যের মানুষ দেখলেই চীনে বলিনা। হিস্প্যানিক চানাচুর কাকু আমাকে হ্যাভ এ নাইস ডে বলেন। আমি ইউ টু বলে বেরিয়ে আসি। রাস্তায় নেমে আসি না, ফুটপাথ দিয়ে হাঁটি। দৌড়বিদদের জায়গা ছেড়ে দিই। বেজায়গায় রাস্তা পেরোই না। সরকার বাহাদুর স্থানে স্থানে জেব্রা ক্রসিং রেখেছেন। সেখানে মানুষ নামলে গাড়ি থেমে যায়। পদব্রজীদের সম্মান সবচাইতে বেশি। আমিও গাড়ি চালানোর সময় থামি। অকারণ হর্ন বাজাই না। আজকেও নেমেছি জেব্রার পিঠে। একটা ধূসর ফোর্ড আসছিল। মোটেই গতি কমানোর ইচ্ছে তার নেই। ঘাড়ের উপর এসে পড়ল বলে। চট করে দু’পা পিছিয়ে ফুটপাথে উঠে এলাম ফের। এসেই দেখি এক সাইকেল বালিকা আরও কাছে, ব্রেক কষে টলোমলো। আন্দাজ করতে পারেনি আমি আবার এই পারেই উঠে আসব। ধাক্কা লাগল বলে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। ব্রেকের শব্দের সঙ্গে আরেকটা মিঠে আওয়াজ কানে এলো। ঘন্টির আওয়াজ। তখনই জাদুটা হল।

না। পথের কাঁটা নয়। অন্য জাদু। চোখ বন্ধ করে স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি বাবার সাইকেলের সামনে রডের উপরের ছোট্ট আসনে। নীচে আবার পাদানি। আলতো করে হ্যান্ডেল ধরে আছি। মনে হচ্ছে আমিই চালাচ্ছি। কানের কাছে বাবার নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছি। বাবা আমাকে বাসস্ট্যান্ড অবধি নিয়ে যাচ্ছে। সে’খানে স্কুলের বাস আসবে। আর এ’বার আমি আমার রোজকার খেলাটা খেলব। চোখ বন্ধ করবে। তারপর আন্দাজ করার চেষ্টা করব কোন জায়গা পেরোচ্ছি। এই অগ্রণীর ক্লাব পেরোলো। চায়ের দোকানের সামনে ভিড়। গণশক্তির বাঁশমাচার কাগজ দেওয়ালের সামনে জটলা। বাবার নিঃশ্বাস জোরে হচ্ছে। প্যাডেলে চাপ বাড়ছে। তারমানে শান্তিনগর সাঁকো আসন্ন। আমি চোখ খুলে ফেললাম। সাইকেল বালিকা তার কোনও দোষ না থাকা সত্ত্বেও স্যরি বলছে। আমি তাকে অভয়বাণী দিয়ে রাস্তায় নামলাম।

এ’রকম আকছার হয়। এর আগে হুট করে তৎকালীন সহবাসিন্দার দেশফিরতি আনা মাইসোর স্যান্ডাল সাবানের খোশবুতে হয়েছিল। বাড়িতে আসন্ন অতিথিকে ইম্প্রেস করতে রোজকার নিম সাবানের বদলে নতুন মাইসোর স্যান্ডাল। চন্দন কি খোশবু। বর্ণে, গন্ধে, শব্দে এমন স্পেস টাইম পেরিয়ে কন্টিন্যুয়াম ট্রাভেল হয় কেন? গত তিন বছর পাসপোর্ট সিন্দুকে তোলা। কোত্থাও যাইনি। যাইনি বাড়ি। যাইনি। লাগেনি পাসপোর্ট। সে’দিন লাগলো। সরকার বাহাদুরের ইমিগ্রেশন বিভাগ কিছু তথ্য চেয়েছেন। বের করলাম। “মেয়াদ কদ্দিন?” প্রশ্ন এলো। দু’হাজার বাইশ। তার মানে পাসপোর্ট হাতে পাবার দশ বছর হতে চলল? ব্যস। রইল পড়ে প্রশ্নোত্তর, আমি চললুম বাপের বাড়ি। সে’দিন অনেক লোক। অনেক। মাসিদের গৃহপ্রবেশ। মাসিকে আমি মানি বলি। লোকজন মানিদের ফ্ল্যাট দেখতে যাচ্ছেন, কিন্তু নতুন বাড়ি, বসবার জায়গা নেই। আমাদের বাড়িতে এসে জিরোচ্ছেন। দিদা একগাল গল্প নিয়ে ভাটাচ্ছে তাঁদের সঙ্গে। দাদু নির্লিপ্ত হয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। এমন সময় খবর এলো পাসপোর্ট দেবার আগে আমি আসল কিনা যাচাই করতে পুলিশ আসছে। ছত্রিশ ঘায়ের ব্যাপার। বাবাকে ফোন করলাম অফিসে। বাবা বলল, “হুঁ। তো?” আমি আমতা আমতা করে বললাম, “উৎকোচ?” ঘটনা সত্যি। সবাই জানে। ক’দিন আগেই আমার এক বান্ধবী এলাকার থানায় গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছে কাঁদো কাঁদো হয়ে। “কিছুতেই দিলো না।” কাকিমা গেলেন। বিগলিত পুলিশকাকু বললেন, “হেঁহেঁ ওইটুকু বাচ্চা মেয়ের থেকে কি মিষ্টিমুখের ইয়ে চাওয়া যায়?” আমার কত গচ্চা যাবে কে জানে? বাবা রেগে গিয়ে বলল, “কীসের কোচ?” আমি কোলাহলমুখর বাড়ির কান এড়িয়ে বললাম, “ইয়ে, যদি কিছু চায়?” বাবা বলল, “যা যা কাগজপত্র চাইবে দেখিয়ে দিবি। তোর কাগজ, তোর সার্টিফিকেট, তুই জানিস না কোথায় থাকে?” মানে মানে ফোন রেখে দিলাম। সেই মাধ্যমিক থেকে জমানো জিনিসপত্র জড়ো করছি, ভদ্রলোক এলেন। বাইরের ঘরে বসানো হল। দাদু কাগজ ছেড়ে মুখটিও তুলল না। অ্যাডমিট কার্ড? এই যে। ফোনের বিল? যাচ্চলে! ফোনের বিল দিয়ে কী হবে? দিলাম তাও, বাবা খুব যত্ন করে গুছিয়ে যেন এই দিনটির জন্যেই রেখে দিয়েছিল। ভদ্রলোক খুব খুঁটিয়ে জাল নোট পরীক্ষা করবার মতো করে দেখলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। দাদুর মুখ থেকে কাগজ সরল। ভাঁজ হয়ে নেমে এলো খাটের উপর। ভদ্রলোক প্রস্তুত হচ্ছেন। আসল কথা পাড়তে হবে। “বড় কাউকে ডাকো। বাবা নেই বাড়িতে?” দাদু মুখ খুলল, “এই যে আপনার মতো লোকেরা…” পুলিশজ্যেঠু চকিতে তাকালেন দাদুর দিকে। “এই যে আপনার মতো সৎ মানুষরা, পুলিশ অফিসারেরা আছেন বলে তো আজও সিস্টেমের উপর থেকে ভরসা উঠে যায়নি। দেখেছিস বাবু, ঋজু চেহারা, দুষ্টের যম। এই আপনার জায়গায় আর কেউ থাকলে হয়ত ঘুষ চেয়ে বসত। অনাচারে ভরে যাচ্ছে দেশটা। তবু আপনাদের মতো কেউ কেউ এখনও রয়েছে বলেই না চলছে এখনও!” পুলিশজ্যেঠুর মুখ আমসি হয়ে গেল। এর পর আর হাত পাতা যায়না। একটা কাষ্ঠ “হেঁহেঁ এতো আমাদের কর্তব্য আজ তবে আসি?” বলে উঠে পড়লেন। যথাসময়ে পাসপোর্ট এসে পৌঁছল।

এবার তাতে একটা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছাপ পড়বার সময় এসেছে। অনেকদিন হল শব্দ গন্ধ বর্ণের পাসপোর্টে বাড়ি ভ্রমণ, হল না?