দূরবীন জিনিসটা ভালো। কিন্তু ওতে একবারে একটা তারাই দেখা যায়। স্পষ্ট। আমার ভালো লাগে না। তার চেয়ে রাস্তায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে খালি চোখে সবক’টা তারা দেখা যায় একসঙ্গে। রাস্তাটা দিনের রোদে তেতে থাকে। রাত হলে বাষ্প ছাড়ে। অন্ধকারে ঠাণ্ডা হলেও ওম থেকেই যায়। সেই ওমে পিঠ এলিয়ে দিতে সুখ। হাতের উপর মাথা রেখে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকা। পায়ের দিকে হাইওয়ে। এক দু’টো নিশাচর গাড়ির হুশ। এক দু’টো নিশাচর পাখির ধাপ্পা। এই রাস্তাটা দুই দিকে উঠে গেছে ঢিপির পিঠে। শিয়র বা চরণ, কোনওদিক থেকে গাড়ি এলে অনেক আগে থেকে আলো দেখতে পাওয়া যায়। আগে আলোটা চড়াই বেয়ে ওঠে, তারপর গাড়িটা। তখন ক্ষণিকের বিশ্রাম। উঠে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো। চালক ভেবে নেয় গোলমেলে কিছু ঘটছে। ঘটছেই তো। পাশের পুকুরে কে বা কারা ঘাই দিচ্ছে। আমার ঘুম আসছে না। ভোর ভোর শিশির।

আমার কানের মধ্যে ক্লেয়ার দে ল্য ল্যুন বাজছে। খাপছাড়া পিয়ানো। শুনেছি তেমন তেমন খতরনাক স্মৃতি মাথা দায়িত্ব নিয়ে মুছে দেয়। আমাদের মাথার খানিকটা নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে। সচেতনতার কাছে। অবচেতন আসল রাজা। সে মালটা অর্ধেক জিনিস লুকিয়ে রাখে। তার সবটা যে খারাপ, তা নয়। আমি খেয়াল করে দেখেছি, তেমন তেমন ভালোলাগা হলে সচেতন অংশটা দুম করে নিভে যায়। না হলে সেইদিনের পরের ক’টা দিন আমার মনে নেই কেন? ঘোরের মত লাগে। নেশার ঘোরে মানুষ কত কী করে। ঘুমিয়ে হাঁটে। তারপর ঘোর ভেঙে গেলে সেই সময়টুকু মুছে যায়। তেমন। চিন্তা ব্যাপারটা স্থগিত। স্মৃতির কুঠুরি বন্ধ। যা হচ্ছে, কেবল তাৎক্ষণিক। আমার মনে হয় মানুষ তার জীবনের যে কোনও ঘটনা তার সচেতনতার একটা অংশ দিয়ে অনুভব করে, আর একটা অংশ দিয়ে অনুধাবন করে। কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করে। সজাগ থাকে। উপস্থিত থাকে। মনকে বলে, দেখো কী সুন্দর, তুমি কিন্তু এ’টা দেখছ, এ’টা হচ্ছে। বাস্তবিক হচ্ছে। নইলে সেই কোন ছোটবেলায় হাজার ফুট নীচে দেখা অলকানন্দার জলের পান্না মেশানো নীল মনে আছে কী করে? সেই মোড়টা? যে’টা ঘুরেই গোটা হিমালয় চোখের সামনে খুলে গেল? জ্যোৎস্নার নীলকণ্ঠ? কিন্তু। কিন্তু কখনও কখনও একশো শতাংশ দিয়ে অনুভব করতে গেলে ওই অনুধাবনটুকুর জন্য জায়গা থাকে না। সেই মুহূর্তটুকুর জন্য সেই মুহূর্তটুকু। তার আগে নেই। পরে নেই।

রাস্তার মাঝখান দিয়ে দু’টো সমান্তরাল হলুদ দাগ। যাওয়া আসার দাগ। আমি মাঝবরাবর শুয়ে। যাচ্ছিও না। আসছিও না। এইভাবেই জীবনটা কেটে যাবে। যাচ্ছে। চাঁদের কো-অর্ডিনেট বদল হচ্ছে কার্টেসিয়ান ফিল্ডে। তারাদেরও হচ্ছে নিশ্চয়ই, টের পাচ্ছি না। টের পাবার চেষ্টাও করছি না। খুব অবশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। অবশ শব্দটা অদ্ভুত। অবশ না। অসাড়। অসাড় হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। অবশ তো হয়ে আছিই। বিন্দুমাত্র বশে নেই। অথচ থাকার কথা। বড় হয়েছি। হইনি? বড়দেরও সবকিছু বশে থাকে না রে। আমরা কেবল লোক ঠকাই। ভান করি। অসাড় হলে ভালোও লাগবে না। খারাপও না। আপাততঃ ভালোর পরিমাণ এত কম, অসাড় সীম্‌স এ বেটার অপশন। আরামের। কম্ফর্টেবলি নাম্ব। পিয়ানো মিশে গেছে পুকুরের জলে। আলকাতরা আকাশে সাইমন অভিমানভরে ওনলি লিভিং বয় ইন নিউ ইয়র্ক গাইছেন। ভদ্রলোক অবার্নে এলে কী করতেন তাই ভাবছি। হয়ত আমাকে একটু সরে শুতে হত। না। রাস্তাটা লম্বা। আমার পায়ের কাছে মাথা, বা মাথার কাছে পা রেখে শুয়ে পড়তেন। দ্বিতীয় জীবিত প্রাণী মিলত একজন। ওদের একটা অ্যালবামের নাম ওয়েডনেসডে মর্নিং, থ্রি এ এম। এখন মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা। কাল তিনটের সময় অ্যালবামটা শুনব। দেখব মাহেন্দ্রক্ষণের কোনও জাদু আছে কিনা।

আমার শুয়ে শুয়ে মাথা ঘুরছে। পুব পশ্চিম গুলিয়ে গেছে। একটা কোনও দিক থেকে মেঘ আসছে। আমি ও’টাকেই ঈশান কোণ বলব। আমার ইচ্ছে তাই। আজ রাতটুকু আমার যা ইচ্ছে তাই। ইচ্ছে হয়েছে, শীতকালে মাঝরাস্তায় শুয়ে আছি। বেশ করেছি। জ্ঞান দিতে এলে রাস্তা সামনেই আছে, দেখিয়ে দেবো। আসুন। অনেক উদ্ধার করেছেন আমার খোঁজ খবর করে, এখন আসুন তো। কার সঙ্গে লড়ছি কে জানে। কেউ জ্ঞান দিতে আসবে না। বয়েই গেছে সবার। আমার কপাল বরাবর সোওজা উঠে গেলে একটা বড়সড় তারা আছে। কী নাম তার? এই সবক’টা তারার নাম আছে? ইয়ার্কি হচ্ছে? ফোঁসফোঁস করে রাগ দেখাচ্ছি। আমার রাজত্বে। এর বাইরে সাহসও নেই, মূল্যও নেই। মা-কে যদি বলি, মা মন খারাপ করছে, ঠিক করে দাও। গলা আটকে কাঁদতে বসবে। “আমাদেরও তো মন খারাপ বাবু।” তো? আমি আগে বলেছি। আগে তুমি আমার মন ভালো করবে। তারপর আমি তোমার। এ’টা কখনও বলা হয় না। উলটে মা ফোঁপালে আমাকে কিসসা শোনাতে হয়। “তারপর কী হল জানো তো, সেই যে টুম্পা…” বাবাকে এ’সব বলা যায় না। বাবা চাণক্য। ভদ্রলোক নিজে মেঘে ঢাকা তারা দেখে কাঁদতে পারেন, এ’দিকে ধরা পড়ে গেলে আমাদের দোষ। খুব বেশি হলে বলবে, তুই কি ইমোশনাল হয়ে পড়ছিস? শুনলেই গা পিত্তি জ্বলে যাবতীয় মন খারাপ রাগে পর্যবসিত হয়। বাবা একটা বাঘের গল্প বলো না। মাঝেমাঝে মনে হয় ব্যস্ত হয়ে যাই। শুধু ব্যস্ত হবার জন্য ব্যস্ত। “আহ্‌ আপনি আবার ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আমরা খেয়েই এসেছি” ব্যস্ত নয়। “এখন কথা বলতে পারব না, কাজ আছে” ব্যস্ত। “আজ যেতে পারব না, অন্য কোথাও যাবার আছে।” ব্যস্ত। এত হ্যাংলামো ভালো না। নিজেকে ছোট লাগে। এ’দিকে আমি না গেলে যেন কারুর কিছু যায় আসবে।

যাদের দূরবীন নেই, তাদের খালি চোখে তারা দেখে বলতে হয় আমি এ’টাই চেয়েছিলাম।