কোনও একটা অস্তিত্ব কি একাধিক জায়গায় একই সময়ে বিরাজ করতে পারে? পারে। তেমন তেমন হলে পারে। রূপকথায় এ’রকম আকছার হয়ে থাকে।

অনেক দূরের একটা দেশে, একদম দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, যে’খানে কেউ কখনও যায় না, একটা বিশাল জঙ্গল আছে। তার নাম কৃষ্ণঅরণ্য। সেই অরণ্যের ভিতর একটা ছিমছাম ছোট্ট গ্রাম আছে। সেই গ্রামের মানুষ আর কোথাও যায় না। অন্য শহরের মানুষ সেই গ্রামে আসে না। সে গ্রামের বাইরে যে জানাঞ্চল আছে, তাই-ই গ্রামবাসীর জানা নেই। তাই তাঁদের গ্রামের নাম দেবারও প্রয়োজন হয়নি। সেই গ্রামে একটা শান বাঁধানো কুঁয়ো আছে। কেন আছে কেউ জানে না। তার মধ্যে বালতি চুবিয়ে কেউ জল ভরে না। কারণ তাতে জল নেই। তাই তার চারপাশে পাঁচিল ও নেই। শুধু মাটির মধ্যে গোল গর্ত আছে। আর তারপাশে শান। কে বাঁধিয়েছে, কে জানে। তো হ’ল কী, এক হেমন্তের ভোরে সেই কুঁয়োতে দুই ফোঁটা শিশির পড়ল। সে শিশির থেকে জন্ম নিল একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। তার ইচ্ছে হ’ল সে গ্রামের বাইরে যাবে। গ্রামে তার কে-ই বা আছে। অথচ গ্রামের কোনও মানুষ বাইরে যায় না। তবে? মেয়েটা নদী হয়ে গেল। রূপকথায় এ’রকম আকছার ঘটে।

আর এক রাজ্যে ছিল এক ছোট্ট ছেলে। তার বাবা মস্ত বড় বাজিয়ে। গোটা দেশে তার কদর। কিন্তু একদিন সেই রাজ্যে লাগল যুদ্ধ। নতুন রাজা ফতোয়া জারি করলে, যোহান স্ট্রাউসের বাজনা বন্ধ। গর্দান যাবে নইলে। বাপ যোহান খোকা যোহানকে বললে, রাজাদেশ। হাতে বেহালা দেখলে ছড় ভাঙব তোমার পিঠে। খোকা যোহান কাউকে বলেনি কোনওদিন, কিন্তু সে দেখেছিল, বাবা পিয়ানো বাজাচ্ছেন, আর ঘরের কোন ফোকর থেকে একটা ইঁদুর বেরিয়ে এসেছে। তার চোখ বন্ধ। কান খাড়া। তার ল্যাজে দুলুনি। ইঁদুরটা নাচছে। তালে তালে। এক দুই তিন এক দুই তিন। খোকা অর্ফিয়ুস এর গল্প শুনেছে। সিংহকে পোষ মানানোর গল্প। খোকা গুপী গায়েনের গল্প শুনেছে কি? বাঘ সিংহকে পোষ মানানো সহজ, ধেড়ে বিড়াল বই তো নয়। কিন্ত ইঁদুর? খোকার সেই থেকে সাধ, সেও ইঁদুর নাচাবে। একদিন ধরাও পড়ল বেচারা। বেদম প্রহার। ইঁদুরটা কোথায়? দিন আসে, দিন যায়। একদিন কী কারণে বাবা সব ছেড়েছুড়ে চলে গেলেন। খোকা হাতে চাঁদ আর বেহালা পেলো।

একদিন একটা ট্রেনে একটা বেকার ছেলে, আর একটা ভয়ানক ব্যস্ত মেয়ের দেখা হয়ে গেল। ছেলেটা কীভাবে যেন মেয়েটাকে রাজী করিয়ে ফেলল, এই যে সামনের স্টেশনটা আসছে, চল নেমে যাই। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। কাল সকালের প্রথম ট্রেনে যার যে’দিকে যাবার, যাবো? ট্রেনটা ক্যাঁচকোঁচ করে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে থামল স্টেশনে। দু’জনে নেমে পড়ল। সহজ হাঁটা। বইয়ের দোকান। গানের পসরা। হাত দেখিয়ের ঘর। হাল্কা ভিড় ট্রাম। প্রিয়া কাফে। আজ আবার মেলা বসেছে। আজব শহর, তারা বুঝল। যে শহরে সব মাতালরা কবি, আর সব কবিরা মাতাল। তাঁদের কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নেই। তাঁদের ঘর নেই, রাস্তা আছে। তাঁদের মাদারীর খেলা আছে হরেকরকম। আমায় একটা শব্দ দাও, আমি পঞ্চাশটা শব্দ বানিয়ে ফেরৎ দেবো। পছন্দ হলে, আমায় একটা লাল ওয়াইনের বোতল কিনে দেবে ভাইটি? ছেলেটা বা মেয়েটা কেউ মুজতবা আলী পড়েনি। পড়লে বুঝত, তারাই মুজতবা আলীর ডান চোখ, আর বাম চোখ।

কৃষ্ণঅরণ্য থেকে বেরিয়ে নতুন নতুন সব রাস্তাঘাট পেরিয়ে এগিয়ে চলল নদীটা। জনপদের পাশ দিয়ে গেলে লোকজন ভিড় করে তাকে দেখতে আসে। লোকালয়ের বাইরে গেলে তার শরীরে মুখ ডোবায় হরিণ। নদী এগিয়ে চলে। অচেনা সব ভাষায় সবাই তাকে শুধোয়, হ্যাঁ মেয়ে, তোমার নাম কী? নদী উত্তর দেয় না। তার ভাষা নেই। তার নাম নেই। এমনি করতে করতে তার সামনে পড়ল এক মস্ত শহর। নদী ইতস্ততঃ করতে লাগল। তার কি ঘুরে যাওয়া উচিৎ? শহরের ঘুম ভাঙানো ঠিক হবে? কী মনে করবে কে জানে। সে যাবে বলে একটা আস্ত শহরকে তো পথ করে দিতে বলতে পারে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই শহরটা চোখ পিটপিট করে উঠে বসল। উষ্ণ হেসে বলল, অত ভাববার কী আছে? এসো, আমার মধ্যে দিয়ে যাও। ওমা! দেখতে দেখতে শহরটা দু’ভাগ হয়ে গেল। লজ্জায় লাল হয়ে নদী চলল তার মধ্যে দিয়ে। শহরের বাসিন্দারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এ বলে, যা যা, বাজার যাবো কেমন করে? বাজার যে ওই পারে! ও বলে, যাচ্চলে, আমার খাবার ঘর আর রান্নাঘরের মধ্যে দিয়ে একটা নদী! কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তারা বেশ মানিয়ে নিলে। চারপদ রান্না করে গৃহিণী সেতু পেরিয়ে খাবার ঘরে আসতে আসতে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যায় বটে, কিন্তু শহরের মধ্যে একটা নদী, ব্যাপারখানা বুঝতে হবে তো! শহরখানা দু’ভাগ হয়ে গেল, অথচ রইল আস্তই। নামটাও গেল মাঝখান থেকে চিরে, তাও গোটা। এই পারে বুদা, ওই পারে পেস্ট। আর আমাদের নদী আরও দুই রাজধানীর সঙ্গে ভাব জমিয়ে গিয়ে ঝুপুস ঝাঁপ দিল কৃষ্ণসাগরে। একটাই নদী, দশ দশটা রাজ্যজুড়ে তার বাস। সে কৃষ্ণঅরণ্যেও আছে, কৃষ্ণসাগরেও। বলছিলাম না? একাধিক জায়গায় একই সঙ্গে… তো সেই নদী একদিন দেখল তার কোলের উপর আর এক রাজধানী শহরে একটা ছেলে মায়া মায়া চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে দেখল একজোড়া ছেলেমেয়ে তার পাড়ে বসে পা দোলাচ্ছে। সেই শহরেই।

দান্যুব নীল হয়ে আছে। গল্প শেষ করে ঠোঁট চাটছে ইলতুৎমিশ। ইবন বলল, তুই গল্প বলবার সময় তোর চোখগুলো বড় বড় হয়ে যায়। আমি গল্প শুনি কম, চোখ দেখি বেশি। ভিয়েনায় ভোর হচ্ছে। যোহান স্ট্রাউস খোকা বেহালা কাঁধে, ছড়ি দুলিয়ে তার বাজনদারদের ইশারা করছেন। ভিয়েনার একুশটা সেতুর তলা দিয়ে যাবার সময় দান্যুব একটু শ্লথ হয়ে যায় সেই বাজনা শুনে। ইবন জুতো খুলে ইলতুৎমিশের পায়ের উপর পা চাপিয়ে ভেসে ভেসে নাচে। তারা ওয়াল্টজ্‌ শিখল কবে?