পাঞ্জাবীটা পছন্দ হচ্ছে না কিশোরের। অস্বস্তি হচ্ছে। কাপড়টা ভালো। সুতির। ফিট ও করেছে ভালো। বেশ আরামের। কিন্ত বোতামগুলো ঠিক মাঝখানে নয়। ডানদিক ঘেঁষে। মা তাকে বুঝিয়েছে এ’টা নতুন স্টাইল। কলারটা ঝুলে আছে। ডানদিক করে চেরা, বোতামগুলো সেখানে। ভাল্লাগছে না। মাঝখানে হলে ভালো হত। যেমন হয়। ঘাম হচ্ছে অল্প। আলোগুলো তার দিকে তাক করা। বড় বড় আলো। জোরালো। স্টেজের আলো যে’রকম হয়। তার সামনে দু’টো মাইক। একটা হারমোনিয়ামের উপর। আরেকটা তার মুখের সামনে। হারমোনিয়ামের উপর গানের খাতা খোলা। ডানদিকে সুবল তবলার উপর পাউডার ছড়াচ্ছে। স্নান করাচ্ছে। সাদা সুগন্ধী গুঁড়ো ভাসছে হাওয়ায়। কিশোরের হাঁচি পাচ্ছে। সুবল তার ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ঠকঠক করেছে খানিকক্ষণ। এখন সব চুপ। শো শুরু হবার আগের এই নিস্তব্ধতা একটা কীসের স্রোত বইয়ে দেয় কিশোরের শিরদাঁড়ায়। প্রতিবার। আজ কমদিন তো হল না। তবু এই গ্রন্থিরসের জোয়ার প্রতিবার হবে তার। প্রথম লাইনটা একটু কাঁপা কাঁপা গলায় হবে। আঙুলগুলো জড় হয়ে আসবে হারমোনিয়ামের চাবির উপর। কিশোর এই সময়টায় নিজের লাবডুব শুনতে পায়। ভয় হয়, তার হৃদ্পিণ্ডের লয় যদি তবলার সঙ্গে না মেলে? বাহাত্তর বিপিএম। অবশ্য এখন সে’টা নব্বই ছুঁইছুঁই। প্রথম গানটা একশো বিপিএম। সুবল এর হাতে মেট্রোনোম আছে। কিশোরের কানে তানপুরা। সুবল একটা ইশারা করল। গলা ঝেড়ে নিয়ে কিশোর মাইকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, “প্রথম গানটা আমার খুব প্রিয় একটা গান। আমি জানি আপনাদেরও খুব প্রিয়। ঊনিশশো ছেষট্টি সালে সুধীন দাশগুপ্তর কথা ও সুরে মান্নাবাবু রেকর্ড করেছিলেন গানটা, পুজোর জন্য।” কিশোরের বাবার প্রজন্মের গায়করা মান্নাদা হেমন্তদা সলিলদা বলে এসেছেন, যেন প্রতি রবিবার চা ঝালমুড়ি খেতে যেতেন তাঁদের বাড়ি। কিশোর বাবু বলে। আড়চোখে সুবলের দিকে একবার তাকিয়ে হারমোনিয়ামের হাপরে চাপ দিল কিশোর। দিয়েই বুঝল ঘটনাটা আবার ঘটতে চলেছে।
গত দেড় মাস ধরে মাঝেমধ্যেই এই ঘটনাটা ঘটেছে কিশোরের সঙ্গে। কিশোর কোনও কুলকিনারা করতে পারেনি সেই রহস্যের। অল্পবিস্তর ঝামেলায় পড়তে হয়েছে তাকে এই নিয়ে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তাই কাউকে সে কিছু বলেনি। কিন্তু আজ কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। বড়ো রকমের। মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না তার আর। লোকজন হাসাহাসি করবে। কিন্তু কিশোরের কোনও উপায় নেই। সে হাজার চেষ্টা করেও এই ঘটনা ঠেকাতে পারে না। হলভর্তি সাড়ে চারশো লোক, উইং এর পাশে দাঁড়ানো সাউন্ডের ছেলেগুলো, এই অনুষ্ঠানের ম্যানেজার, সঞ্চালিকা, আর তবলিয়া সুবল। সবাইকে জীবনের মতো চমকে দিয়ে হারমোনিয়ামে আর গলায় একটা ভীষণ বেমানান সুর ধরল কিশোর। রা রা রাসপুটিন, লাভার অফ দ্য রাশিয়ান ক্যুইন। নির্ভুল উচ্চারণে ইংরেজি গেয়ে চলেছে সে। এত নির্ভুল উচ্চারণ যে জার্মানের মতো শোনাচ্ছে। কস্মিনকালেও এইরকম কোনও গান কিশোর শোনেনি। বাবা একবার গোর্কি সদনে না গ্যেঠের মাঠে কোথায় একটা জার্মান শিখতে পাঠিয়েছিল, বার্লিন হিটলার জার্মান খটাখট, এইটুকু শিখে পালিয়ে এসেছিল কিশোর। তাহলে সে এই সুর আর কথা জানল কী করে? সঞ্চারীর লাইনগুলোর সুর হুবহু জলতরঙ্গে ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি ঢেউ তুলে সে যায় এর মতন। না হয় ইরানী বালিকার গান ই সে গাইত! না। তাকে রা রা রাসপুটিন ই গাইতে হবে। কিশোর গান থামাতে পারছে না। মাইকের পিছনে গাঢ় অন্ধকারে শ্রোতা দর্শক এর প্রতিক্রিয়াও বুঝতে পারছে না। সুবল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে প্রায় একশো ষাট বিপিএম এ কাহারবা বাজিয়ে যাচ্ছে। তালছুট হচ্ছে না। দ্রুত্ ভজনের ভঙ্গিতে জনপ্রিয় আধুনিক গায়ক কিশোর উপাধ্যায় নজরুল মঞ্চে হারমোনিয়াম আর তবলার সঙ্গতে রা রা রাসপুটিন গেয়ে থামল। তার ট্যাঁরা পাঞ্জাবী ভিজে থইথই করছে। প্রায় তিরিশ সেকেণ্ডের একটা বিরতির পর হল ফাটানো হাততালি আর সিটি শুনতে পেলো সে।
পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে যখন ট্যাক্সিতে উঠল কিশোর, তখনও সে থরথর করে কাঁপছে। এই ম্যালেরিয়া কাঁপুনি সঙ্গী করেই সে বাকি গানগুলো গেয়েছে। খুব একটা ছড়ায়নি। শুধু হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা কী করে লোডশেডিং কে দিন করল, সে’টা সে জানেনা। আর কী। যা বোমা ফাটবার প্রথমেই ফেটে গেছে। বাকিসব পরিবর্ত ক্রিয়া। যাদবপুর থানা থেকে ডানদিকে ঘুরল ট্যাক্সি। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। শো এর বিস্ফোরণ আলোড়ন ফেলেনি শহরে এখনও। কাল সকালে ফেলবে। কাগজে রেডিওতে ইউটিউবে হাসাহাসি হবে। ভাইরাল হবে। ট্যাক্সিওলা তাকে চিনেছে। কিছু একটা বলব বলব করেও বলছে না। লর্ডস এর মোড় এ সিগনালে দাঁড়ালো ট্যাক্সি। বাঁদিক নিয়ে মিনিটখানেকে গল্ফগ্রীনে তার ফ্ল্যাট। কিশোর খেয়াল ও করল না খানিক ইতস্তত করে তার ট্যাক্সি সোজা আনোয়ার শাহের দিকে চলল।

*****

ঘটনার সূত্রপাত নজরুল মঞ্চের বারো দিন আগে। অ্যালবাম বেরোবে বেরোবে করছে গীতা অডিও থেকে। দশটি দ্বিজেন্দ্রগীতি। অতগুলো গান যে ভদ্রলোক লিখেছিলেন তা কিশোর আদৌ জানত না। পেটে পেটো মারলে হয়ত ভায়ের মায়ের এত স্নেহ বেরোত। অ্যালবাম অ্যারেঞ্জ করবেন মানববাবু। গড়িয়া স্টেশনের কাছে তাঁর বাড়িই গেছিল কিশোর। একটা ছোকরা বসেছিল তাঁর গানের ঘরে। ঘরটা সোঁদা। একটা খাট মাঝখানে, তাতে একটা পেল্লাই হারমোনিয়াম রাখা। ঘরে মশার ধূপ আর হাতে পাকানো সিগারেটের গন্ধ। মানববাবু লুঙ্গি আর একটা হু লেট দি ডগ্স আউট জামা পরে বাবু হয়ে বসে এন্তার জ্ঞান দিচ্ছিলেন ছেলেটিকে। “দেবব্রতদা রাশিয়ান ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেছিলেন, জানো তো? বাংলা গান আজ নতুন আন্তর্জাতিক হয় নি”। সলিলবাবু দেবুদার সময় থেকেই হয়ে এসেছে। ছেলেটা হাঁ করে তাঁর কথা গিলছিল। সামনে একটা খাতা খোলা। পাশে দু’টো বাঁশি। মানববাবু আজকাল ছাত্র রাখছেন নাকি? কিশোরকে দেখে হাঁ হয়ে গেল ছেলেটা। তার দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে কিশোর বলল, “আরে, নানা বসো বসো”। ছেলেটা একবারের জন্যও ওঠবার উপক্রমও করেনি। কিশোর কাষ্ঠ হেসে বলল, “বাঁশি শিখছ? মানববাবু আমাদের এক নম্বর আর্টিস্ট। এঁকে ছাড়া আমাদের চলেই না! মন দিয়ে শিখো, কেমন”? মানববাবু বললেন, “তেল মেরে লাভ নেই কিশোর, এখন আমার সময় হবে না। সামনের হপ্তায় যদি সময় পাই, একবার স্টুডিওতে যাবো”।
আরও ঘন্টাখানেক ছিল কিশোর সেখানে। ছেলেটা বাস্তবিক আহার করছিল তাঁদের কথোপকথন। একটা সময়ে তাকে প্রায় বেরই করে দিলেন মানববাবু। তারও মিনিট কুড়ি পরে কিশোর বেরিয়েছিল। সুন্দর রোববার সকাল। মানববাবু বড়ো কিপ্টে। রোববারে বাড়িতে এলে এক কাপ চা-ও ডেকে খাওয়ায় না। স্টুডিও এলে ঘন্টা বাবদ টাকা নেবে, আর বাড়তি খাবারের প্যাকেট। গীতা অডিও বড়ো লেবেল। তারা খরচা করতে পারে। সে ঠিক আছে। কিন্তু এইটুকু ভদ্রতা। এক কাপ চা। দু’টো ভালো বাদাম দেওয়া গুডডে বিস্কুট। তারপর একটু ঘুগনি। কত খরচা হত? ওই স্যাঁতসেঁতে নোনাধরা ঘরটা সারাতেই বা কী হয়? টাকা কম না লোকটার। দেবব্রত মান্নার সময় থেকে এই লাইনে আছেন। তখন বাঁশি বাজাতেন, এখন অ্যারেঞ্জ করেন। বড়োলোকদের বিয়েবাড়ির নহবতে সানাইও বাজান। কিশোরের খুব ঘুগনি খেতে ইচ্ছে করছে। সে গড়িয়াবাজারের কাছে একটা ফুটপাথের দোকানে গিয়ে শালপাতায় ঘুগনি নিল। উপরে কুচো পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, আর লেবুর রস ছড়ানো। দু’পিস পাঁউরুটি। দোকানে একটা কালো ট্রানজিস্টর রেডিওতে আকাশবাণীর কিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে। বহু, বহুদিন বাদে আকাশবাণী শুনল কিশোর। রিসেপশন ভালো নয়, মাঝেমধ্যেই কিচকিচ করছে, অন্য কী একটা চ্যানেল অনাধিকার প্রবেশ করছে।

একটু আধটু লোক জমা শুরু করেছে আজকাল তাকে দেখে। ভালো লাগে কিশোরের। প্রতিদিন এর শনিবাসরীয়তে ছবিসহ ছাপা হচ্ছে, সে দেখতে পায়। বাটিকের ফতুয়া পরা সাধাসিধে কিশোর গড়িয়ার ফুটপাথের দোকানে। এত বড় গায়ক কিন্তু কোনও দেমাক নেই। আহা। “আপনার গানের জগতে আসার গল্প বলুন”। “এ আমার কপালেই লেখা ছিল। ছোট থেকেই দেখছি বাড়িতে রোববার করে বাবার কাছে বাংলাগানের দিক্পালদের আনাগোনা। সুধীনকাকু কোলে বসিয়ে হারমোনিয়াম বাজাতেন, আমি তাঁর গানের খাতায় আঁকিবুকি করতাম”। ডাহাস্য ডাহা মিথ্যে। কিশোরের বাবা তাকে একরকম ইচ্ছের বিরুদ্ধে গানের মাস্টারের কাছে ভর্তি করেছিলেন। কিরানা ঘরানা। ঘাড় ধাক্কা খেয়েছিল কিশোর। “ক্লাসিকাল গাইবার জন্য গায়কী লাগে, বুঝেছ”। নাক প্রায় ছাদে তুলে বলেছিলেন ভারিক্কি মাস্টার। আপনি তো গায়কী নিয়ে পেট থেকে পড়েছিলেন, কড়ি মা তে কাঁদতেন তখন। বলবার লোভ হয়েছিল কিশোরের, বলেনি। জগ তুলে ফুটপাথের পাশে রাখা বিশাল প্লাসটিকের পিঁপেতে হাত ধুয়ে মুখ মুছে টাকা দিয়ে কিশোর বাসে উঠেছিল। যাদবপুর থানায় নেমে হেঁটে নেবে। দিনটা সুন্দর। গোল বাঁধল সুলেখার কাছাকাছি এসে। কন্ডাকটর বাস ভাড়া চেয়েছে। চাইবার ই কথা। কিশোর প্রতিবন্ধীর সিটে বসে নেই। ঘাড়ের কাছে এসে তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যে রাখা টিকিটগুলো বুড়ো আঙুল দিয়ে ফরফর করেছে। কিশোর অন্যমনস্ক ভাবে বলেছে, “একটা ভ্লাদিভস্টক”। বলেই ভীষণ চমকে উঠেছে। কন্ডাকটার ছেলেটা চোখের সামনে আমূল পাল্টে গিয়ে একটা টাক্সিডো পরা বাবু হয়ে গিয়ে কতকটা মাংসের ডেকচিতে হাতা নাড়ানোর মত করে হাত দুলিয়ে যাচ্ছে। কিশোরের চোয়াল বন্ধ হচ্ছে না। সামনের দরজার কন্ডাকটার মধ্যবয়স্ক লোকটা বাসের ধাতব শরীরে থাবড়া মারছে আর বলছে পিয়ত্র, পিয়ত্র, ইলিইচ, পিয়ত্র! একেবারে পিছনের সীটে জানালার ধারে বসেছিল কিশোর। সেই কোণায় একদম সেঁটে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। তার বাড়ানো হাত থেকে দশটাকার নোটটা ছিনিয়ে নিল কেউ, একটা পাতলা কাগজ আর একটা গোল ঠাণ্ডা কিছু ধরিয়ে দিল। চোখ খুলে কিশোর দেখল বেশ সন্দেহের দৃষ্টিতে ছেলেটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। টিকিট আর দু’টাকার কয়েনটা পকেটে চালান করল সে।
তারপর থেকে এই বারোদিনে বেশ কয়েকবার ঘটেছে এইরকম। উদ্ভট জিনিসপত্র বলে ফেলছে সে, হাবিজাবি দেখছে। সব কিছুর মধ্যেই একটা ভদকা ভদকা গন্ধ।

*****

ট্যাক্সি যখন থামল, কিশোর অবাক হয়ে দেখল তারা আলিপুরে এসে পড়েছে। ধুধু রাস্তার এক পাশে দাঁড় করিয়ে ট্যাক্সিভায়া পিছন ফিরে তার দিকে জুলজুল করে চেয়ে আছে। আমতা আমতা করে কিশোর বলল, “এ’টা কোথায়? মানে এখানে আনলেন কেন”? তিতিবিরক্ত হয়ে লোকটা বলল, “যাব্বাবা। আপনিই তো বললেন আলিপুর গোপালনগর। আমি বললাম ভিতরে যাবো না, আপনি বললেন রাস্তার উপরেই ছেড়ে দেবেন। তাছাড়া এতটা রাস্তা তো মুখে কুলুপ এঁটে এলেন, এখন বাওয়াল করছেন কেন”? কিশোর কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “আমি বাড়ি যাবো। আমায় ছেড়ে দিন”। ট্যাক্সিওলা প্রচণ্ড অবাক হল। বলল, “লেহ্। আমি ধরে রেখেছি নাকি? দিচ্ছি তো ছেড়ে। যান না, বাড়ি যান শ্বশুরবাড়ি যান, যে চুলোয় খুশি যান”। কিশোর সন্ত্রস্ত হয়ে বলল, “না না আপনি ছেড়ে দিন না ভাই। লক্ষ্মীটি। আমাকে আমার বাড়ি অবধি ছেড়ে দিন। আমার বাড়ি… আমার বাড়ি…” কিশোর ভয়ানক ভয় পেয়ে আবিষ্কার করল সে কোথায় থাকে, তা মনে করতে পারছে না। ট্যাক্সিওলা দু’মিনিট নীরবতা পালন করল। তারপর হাতজোড় করে বলল, “দাদা, আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। আমিও বাড়ি যাবো”।
রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে ট্যাক্সিটাকে চলে যেতে দেখল কিশোর। আঠেরো টাকা ফেরত পাবার কথা ছিল। সে’টা মেলেনি। সে যাক্গে। কিশোর একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। কান্না পেয়ে গেল তার। তার নিশ্চয়ই ঘোঁট পাকিয়েছে মাথায়। আজ ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরিয়ে দাও ঠাকুর, কাল ঠিক ডাক্তার দেখাবো। দেখাবোই। সাউথ সিটিতে ডাক্তার পালধী বসেন। তার কাছেই যাবো। কালকেই। তার নম্বরও- ফোন হাতড়ে বের করেও থমকে গেল কিশোর। সে একা থাকে। তার বন্ধুদের কেউ নিশ্চয়ই তার ঠিকানা জানবে। কিন্তু ফোন করে সে বলবে কী? বাড়ি চিনতে পারছি না? নিজের উপর ভীষণ রাগ হল কিশোরের। ডাক্তার পালধীর চেম্বার কোথায় মনে আছে, নিজের বাড়িটা মনে নেই? ইয়ার্কি হচ্ছে? রাস্তাবাতির তলায় পড়ে থাকা একটা মিরিণ্ডার খালি বোতলে বিরাশি সিক্কার লাথি কষালো কিশোর। বোতলটা পাক খেতে খেতে ফুটপাথের ওধারে একটা লোহার গেটের গায়ে লেগে যে শব্দটা করল, তাতে কিশোর নিজেই চমকে গেল। কী অদ্ভুত দেখতে বাড়িটা! দুর্গের মতো। একটা দু’টো আলো জ্বলছে। স্থাপত্যে কেবল ত্রিভুজ আর বরফি আর চৌকো কীসব। জ্যামিতি। এ’রম বাড়ি আছে কলকাতায় বলে জানা ছিল না। চেতলা রোডের এইদিকটা দিয়ে বহুবার যাতায়াত করেছে কিশোর। নজরে পড়েনি তো। লোহার মস্ত বড়ো দরজার মধ্যে একটা ছোট দরজা। সেইটা শব্দ করে খুলল। সেই শব্দ শুনে দরজার দিকে তাকালো কিশোর। দরজার পাশে বিশাল হরফে কায়দা করা লেখাটা পড়েই জড়ভরত হয়ে গেল কিশোর। ইংরেজি, বাংলা হরফের মধ্যে একটা বিদেশী ভাষা। সে’টাও পড়তে পারছে কিশোর। জেনারেলন্যয় কনসুলস্ত্যয়ো রাসিস্কি ফেদেরাস্তি। কন্স্যুলেট জেনারেল অফ দি রাশিয়ান ফেডারেশন। দু’টো মুশকো লোক ছোট দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো। আঁট কালো জামা। দেখলেই ভয় করে। ছোট করে ছাঁটা চুল। মোটেই রুশ নয়। আদ্যন্ত ভারতীয়। কিশোরের দুই বগলে পাকড়াও করে দুই মুশকো তাকে ভিতরে নিয়ে চলল। কিশোরের গলা থেকে যে আওয়াজটা বেরোলো, সে’টা বিশুদ্ধ খাম্বাজ।
আড়াই থাক সিঁড়ি ভেঙে কিশোরকে একটা ঘরে প্রায় ছুঁড়েই দিলো লোকদু’টো। পিছনে দরজা বন্ধ করে দিল। নেই নেই করেও বেশ আলো ঘরটায়। আলো ব্যাপারটা অদ্ভুত। কোথায় উৎস, তার উপর নির্ভর করে সব দৃশ্য পালটে যায়। এমনিতে যদি এই ঘরে সাধারণ দেওয়ালে ঝোলানো টিউব, বা ছাদ থেকে ঝোলা আলো জ্বলত, খুব সাধারণ লাগত ঘরটাকে। কিন্তু আলো যা জ্বলছে, তার সর্বোচ্চ উচ্চতা কিশোরের মাথা। দু’টো নিজের পায়ে দাঁড়ানো ল্যাম্প, একটা টুলের উপর রাখা। এখন আলোয় ছায়ায় রহস্য রহস্য লাগছে খুব। ঘরের মাঝখানে একটা উপবৃত্ত চৌপায়া। তার দিকে পিঠ করে একজন কেউ বসে আছেন চেয়ারে। তার উল্টো দিকে, কিশোরের দিকে সটান তাকিয়ে রয়েছেন একটি গোরাসাহেব। হাতের ইশারায় তাকে ডেকে নিলেন গোরাবাবু। একদিকের চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। পিঠের মালিককে এবার দেখতে পেলো কিশোর। মাছি গোঁফটা বড় সেকেলে। রোগা, সিড়িঙ্গে চেহারা। মুখে একটা সবজান্তা হাড়জ্বালানো হাসি। আদ্যপান্ত বাঙালি চেহারা। একটা কাঁচের গ্লাসে বোতল থেকে খানিকটা ভদ্কা ঢেলে কিশোরের দিকে এগিয়ে তিনি বললেন, “আসুন, আপনার এ’টা দরকার”। কিশোর গ্লাস ধরল। ধরে রইল। টেবিলের অন্য দু’জন নিজেদের গ্লাস তুললেন। নীরবে চুমুক দিলেন। কিশোর ঢোঁক দিল। খালি গ্লাসটা নামিয়ে রাখল কাঠের চৌপায়ায়। মাছিগোঁফ মুখ খুললেন। “একটা কথা পরিষ্কার করে নিই। আপনাকে ধরে রাখা হয়নি। আপনি স্বচ্ছন্দে চলে যেতে পারেন। কিন্তু থেকে গেলে, আমাদের কথা শুনে গেলে আশা করি আপনার রাসপুটিন রহস্যের কিছু সুরাহা হবে”।
কিশোর থেকে গেল। সিড়িঙ্গে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে কথা বলা শুরু করল। “পৃথিবী কারা চালায় জানেন? মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শক্তি পৃথিবীকে শাসন করে এসেছে। শারীরিক শক্তি, তারপর সামরিক শক্তি, রাজাগজার ব্যাপার। তারপর ধর্ম। তারপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজনীতি। এখন কাদের যুগ, জানেন? কিশোর মাথাও নাড়ল না। সিড়িঙ্গে বলল, পয়সা। বাণিজ্য। রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ এখন কাঠপুতুল। যুদ্ধ এখন আর দেশে দেশে হয় না, দেখে যতই তাই মনে হোক। যুদ্ধ হয় ব্যবসায়ী ব্যবসায়ীতে। তারা সামনে আসেনা। কখনওই। দেশ, রাজনীতির আড়াল রেখে চাল কষে। কেমন”? এইবার ঘাড় নাড়ল কিশোর। গোরা সাহেবও মন দিয়ে শুনছেন। তিনি কি বাংলা বোঝেন? সিড়িঙ্গে শব্দ করে হাসল। “আমাদের অনেক কিছুই জানতে হয় কিশোরবাবু। ভাষাও। শখে নয়। দায়ে। আমি তিন রকম রাশিয়ান জানি। ইলিইচ চাঁটগাই ও বুঝতে পারে”। ইলিইচ গলা খাঁকারি দিল। সিড়িঙ্গে আবার বলতে শুরু করল।
“এই ব্যবসায়ী চালিত পৃথিবীর মূল অস্ত্র, বা পুঁজি হল তথ্য। যার কাছে যত বেশি তথ্য, সে তত শক্তিশালী। আর এই তথ্য জোগাড় করাটাই এখন যুদ্ধের সত্তর শতাংশ। আমাদের নিত্য ব্যবহার্য প্রায় সবকিছুই তথ্য সরবরাহ করে তাঁহাদের। ফোন থেকে টিভি থেকে কম্পিউটার থেকে ইলেকট্রনিক টুথব্রাশ অবধি। সবটাই গোপনে। এবং এই তথ্য কিছু ক্লাসিফায়েড বিশাল গোপন কোনও জিনিস নয়। মানুষের হাল হকিকত। কে কী চায়। একা কোনও মানুষ নয়। মানবসমষ্টি। গোষ্ঠী। সবাই জানে এ সব, ভাবে, আমার আর লুকানোর কী আছে? টিবলিসি বলে পূর্ব ইউরোপের একটি শহরে মানুষের খবর নির্বাচন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের বাছাই করা খবর, ভুয়ো খবর, পরিপ্রেক্ষিতহীন খবর দেখিয়ে মত বদলানো করিয়েছে, তারপর নির্বাচনে হঠাৎ করে দেখা গেছে যে পার্টির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না জেতার, বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা। এ তো হল, আপনি কী কিনছেন, কী দেখছেন, তা না হয় জানল ওরা। কিন্তু আপনার প্রাইভেসি? আপনার প্রিয়জনের সঙ্গে কথোপকথন, ইত্যাদি সবই জমা পড়ছে তাঁহাদের ভাণ্ডারে। এদের বিরোধিতা করা তাই অসম্ভব”।
“কিন্তু প্রয়োজন তো আছে, কী বলেন কিশোরবাবু? প্রায় প্রতিটি দেশের কিছু সমমনস্ক লোক একটি সংগঠন তৈরী করেছে, এই কাজে ব্রতী হয়ে। আমার কাছে এসেছে তারা, সাহায্য চাইতে। তাঁদের একজন এই ইলিইচ। আমার মাথায় খেলল এক বুদ্ধি। এই সমস্ত ওৎ পেতে থাকা কারিগরি সব ডিজিটাল মাঠে, কেমন? অ্যামপ্লিচ্যুড মড্যুলেশন এখন প্রাচীন, ত্যজ্য। কিন্তু বর্তমান। তার ঘাড়ে চেপে, পুরাকালের, মানে এই চল্লিশ থেকে সত্তরের দশকের মুনি ঋষি গুপ্তচরদের মতো করে কথাবার্তা বলা যা আর কী। ফ্রিক্যুয়েন্সি মড্যুলেশন, আপনাদের এফ এম, ব্যস্ত থাকে মেগাহার্টজ এ, আর এএম এর একচ্ছত্র রাজ কিলোহার্টজ এ। আরো নীচে। রাডারের নীচে। কেমন? তবুও ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। দৈবাৎ যদি কেউ মনিটরিং শুরু করে? আমরা তাই ঠিক করলাম বিদ্যমান চ্যানেলগুলিকেই ব্যবহার করব। যে ক’টি অবশিষ্ট আছে। যেমন” –
কিশোরের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে চেঁচিয়ে উঠল – “কলকাতা ক”! মাছিগোঁফের ভিতর থেকে একটা তারিফের হাসি ফুটল। “ঠিক! কলকাতা ক। আমরা একটা পরীক্ষামূলক জিনিস সম্প্রচার করেছি সপ্তাহ দুয়েক আগে। একটি কোড। এইখানে ব্যাপারটা একটু জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোডটি শ্রবণমূলক। যে শুনবে, তার মস্তিষ্কে একটি রিসিভার এর দরজা খুলে যাবে। আমাদের মস্তিষ্কে এ’রকম কোটি রিসিভার রয়েছে কিশোরবাবু, তার একটির চাবি আমরা পেয়েছি। তার সাহায্যে এএম তরঙ্গ গ্রহণ করা যাবে। রক্তমাংসের, বা বলা ভালো ক্যাপাসিটর ট্রানজিস্টরের রেডিওর প্রয়োজন পড়বে না। ব্যাপারটা এখনও পরীক্ষার পর্যায় রয়েছে। একটু বেশিই শক্তিশালী হয়েছে মনে হয়, টোন ডাউন করতে হবে”।
কিশোর ভুরু কুঁচকালো। সিড়িঙ্গে বলল, “আপনি এর মধ্যে এএম রেডিও অনুষ্ঠান কিছু শুনেছেন নাকি, কিশোরবাবু”? কিশোর উপর নীচ মাথা নাড়ল। ঘুগনিই যত কাল। সিড়িঙ্গে ইশারা করল কিছু, ইলিইচ উঠে গেল, ঘরের প্রান্তে একটা ছোট টেবিলে রাখা হাজারো ডায়ালওলা একটা অ্যানালগ যন্ত্রের সামনে রাখা মাইক অন করল, তারপর তার সামনে ফিসফিস করে কিছু বলল। কিশোর চমকে উঠে দেখল তার মুখ থেকে পনিমাত পনিমাত পনিমাত শব্দ বেরোতে লাগল ইলিইচ ইশারা পেয়ে থামল। সিড়িঙ্গে বলল, “এর মানে” – “বুঝেছি”। কিশোর বলল। “এর মানে বুঝেছি। আন্ডারস্টুড”। ইলিইচ আর সিড়িঙ্গে হাসল। “আপনাকে এর থেকে রেহাই দেওয়া প্রয়োজন। অ্যান্টিকোড প্রস্তুত। শুনবেন নাকি”?

*****

ভোর হচ্ছে কলকাতায়। একটা কালো মার্সিডিজ রাসবিহারীর মোড় থেকে ডানদিক ঘুরল। সুন্দর সকাল। আশাবরীর মতো সুন্দর। কিশোর সামনেই বসেছে। ককপিটের মতো জটিল কিন্তু অভিজাত গাড়ির ড্যাশবোর্ড। তার উপর চারটে মিষ্টি মাত্রুশকা পুতুল রাখা। একটার মধ্যে আরেকটার মধ্যে আরেকটা ধরে যায়। বড়টা দেখলে বোঝার উপায় নেই তার পেটের ভিতর আরও তিনটে পুতুল রয়েছে। এখন আলাদা করে রাখা। কিশোর ঠিক করেছে আর মান্নাবাবুদের গান গাইবে না। দ্বিজেন্দ্রগীতির অ্যালবামটা শেষ করবে, তারপর দেবব্রত বিশ্বাসের পথ অনুসরণ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রুশকি অনুবাদ গাইবে। ভারী ভালো ভাষা। “আমাকে যে এতসব বলে দিলেন, এরপর আমি এ’কথা রাষ্ট্র করে বেড়ালে”? “কেউ বিশ্বাস করবে না”, প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছিলেন সিড়িঙ্গে। সঙ্গে গা জ্বালানো হাসি। উঠে আসার সময় কিশোর জিজ্ঞেস করেছিল, “ইয়ে, একটা ব্যাপার, আপনার নামটা তো জানা হল না”? সিড়িঙ্গে হাতজোড় করে নমস্কার করেছিল। তারপর বলেছিল, “অধমের নাম ঘনশ্যাম দাস”।
সত্যি। কেউ বিশ্বাস করবে না।