এক

**********

শোভন রাত আটটার সময় নিজের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হল যে সে একটা বড় ভুল করেছে। ভুল যে করছে, সেই খচখচানিটা সারাটাদিনই তাকে এদিক ওদিক থেকে জ্বালিয়েছে, নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে, কিন্তু শোভন আমল দেয়নি। এখন দিতে বাধ্য হচ্ছে। নিজের পুরুষত্বের উপর এতটা ভরসা রাখাও ঠিক হয়নি। আপাততঃ ঘরের মেঝেতে অনেকটা দুধ স্থির হয়ে আছে। ঠিক স্থির নয়। উত্তর পশ্চিম দিক লক্ষ্য করে এগোচ্ছে। খুব আস্তে। মেঝেটা যে ট্যাঁরা, সে’টা এতদিন শোভন জানত না। তার বসবার ঘরটা বাথরুম নয়। তাতে নিকাশি ঝাঁঝরি নেই। দুধটা গড়িয়ে গিয়ে নালিপথে বেরিয়ে যাবে না। তাকেই মুছতে হবে। যেইদিকের দেওয়াল উদ্দেশ্য করে দুধের গমন, সেই দেওয়ালে লাল প্যাস্টেলে একটা ফুল আঁকা রয়েছে। সাদা প্লাস্টার অফ প্যারিসের দেওয়াল। তাতে খুব বেমানান একটা ফুল। তার চোখ নাক মুখ আছে। চোখে চশমা আছে। শোভনের মতে সে’টা সূর্যমুখী। অন্তত টিউবলাইটমুখী। সঠিক জানতে গেলে শিল্পীকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন। কিন্তু শিল্পী গোটা ঘরে চরকিবাজি খাচ্ছে, এবং ঘরের ঠিক মধ্যিখানে, পাখার ঠিক তলায়, পাখার মতো করেই ঘুরছে শোভন। শিল্পীর হাতে প্যাস্টেল। বা মায়ের লিপস্টিক। শোভনের চোখে পরাজয়ের হতাশা। টিভিতে আটটার খবর শুরু হল। তখনই শোভন উপলব্ধি করল বিষয়টা। সকালবেলা সুস্মিতা বেরোনোর আগে শেষ বারের মতো জানতে চেয়েছিল।

“সামলে রাখতে পারবে কিনা বলো এখনও। তাহলে দু’টো জামা গুছিয়ে নিয়ে বেরোলেই হয়ে যাবে। ওখানে গিয়ে চান করিয়ে নেবো।”

শোভন ঠুঁটো পুরুষত্ব দেখিয়ে বলেছিল, “যাচ্ছ যাও না। একটা দিন তো নিজের পাও না। আমি তো বাবা তো, নাকি? মেরে ফেলব না তোমার মেয়েকে।”

সুস্মিতা বলেছিল, “মারবে বলিনি। নিজে মরতে পারো। কী জিনিস তৈরী হয়েছে গোকুলে তো জানো না।”

আজ সারাদিনে জেনেছে শোভন। টিভিতে দাঙ্গার খবর বলছে। রিপোর্টারদের এখানে ডাকলে হত। মেয়েটা আঠেরোবার ঘরটা চক্কর দিয়ে পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। গলা ভাতের থালা নিয়ে তার সামনে নতজানু হয়ে বসে শোভন বলল, “আমি দশ গুনব। না যদি খেয়েছ এই গালটা তার মধ্যে, আমি কিন্তু পুলিশ ডাকব বলে দিলাম। তারপর কিছু নেই কিন্তু আমার হাতে।” একটা ভীষণ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে বাচ্চা মেয়েটা তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। নড়ল না।

শোভন বলল, এক।

রাজধানীতে বিচ্ছিন্ন শান্তিভঙ্গতার ঘটনা।

দুই।

পশ্চিমা একটা দেশের রাষ্ট্রপতি সস্ত্রীক তাজমহল গিয়েছেন।

তিন।

মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তদন্ত চলছে।

চার।

জুনি ফিক্‌ করে হাসল।

পাঁচ।

শোভনের মনে পড়ল জুনি এখনও সাক্ষর নয়। এই এক থেকে দশ গোনা তার কাছে অর্থহীন।

ছয়।

শোভনের মনে হতে লাগল সে বাবা হবার যোগ্য নয়।

সাত।

জুনির চোখে একটা কৌতূহল ফুটল। ঘটনাটা ঠিক কী ঘটছে সে আঁচ করতে পারছে না।

আট।

শোভন ভাবছে সে এখনও গুনে চলেছে কেন?

নয়।

ময়দানে গোষ্ঠ পালের মূর্তির তলায় এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির ছুরিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

দশ।

দরজায় ভীষণ জোরে কয়েকটা টোকা পড়ল। অত জোরে করা শব্দকে টোকা বলা ভুল। কিন্তু পড়ল। জুনি আঁৎকে উঠে হাঁ করে ফেলল। সেই হাঁ তে এক চামচ গলাভাত ঢুকিয়ে দিল শোভন। তারপর আসছি, বলে দরজা খুলল তড়িঘড়ি। খুলে দেখল পুলিশ। পুলিশ জুনিও দেখল। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলল, “কিন্তু আমি তো ভাত খাচ্ছি!”

দুই

**********

সুস্মিতা চুপচাপ বসে ছিল সোফার উপর। কেদার চাটুজ্জ্যে মোড়ার উপর বাবু হয়ে বসে সুস্মিতার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঘন ভাবছিল একটা মানুষ কী করে অতটুকু একটা মোড়ার উপর বাবু হয়ে বসতে পারে? ভাবতে ভাবতে সে তার জামার কলার চিবোচ্ছিল। কেদার বললেন, “আহ্‌ ঘন! বারণ করেছি না! বয়েস কত তোর?” তারপর একই নিঃশ্বাসে সুস্মিতার দিকে ঘুরে বললেন, “মেয়েকে কোথায় রেখে এলেন?” সুস্মিতা বলল, “মায়ের কাছে।” তারপর বলল, “আমায় তুমি করেই বলুন। আমি অনেক ছোট”। কেদার ভুরু কুঁচকালেন। তারপর বললেন, “বরকে কোন থানায় রেখেছে বললি?” সুস্মিতা একটু অবাক হল। তারপর বলল, “রিজেন্ট পার্ক”। তারপর চুপ করে গেল। তারপর আবার বলল, “কোনও মানে হয়? শোভন করবে খুন? এত ছোট থেকে চিনি ওকে। এমনও নয় যে বাবা যার তার কাছে গছিয়ে দিয়েছে, ভূত ভবিষ্যৎ জানিনা। আমার ভয় হচ্ছে না কাকাবাবু। এ’টা ভুলই। যতই মাথামোটা হোক কলকাতা পুলিশ, এত বড় ভুল ধোপে টিকবে না। কিন্তু রাগ হচ্ছে খুব। এতখানি হয়রানি। দুম করে এসে বলবে আপনি খুনী আর ওমনি হয়ে গেল?” ঘন বলল, “স্যার ও কিন্তু কলকাতা পুলিশ। ছিলেন”। সুস্মিতা জিভ কাটল। কেদার খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন। কেদার সেই দুর্লভ মানুষদের মধ্যে একজন যাকে হাসলে সুন্দর দেখায় না। উদ্ধত দেখায়। তিনি বললেন, “উকিল ঠিক করেছিস? সুস্মিতা বলল, ওর দাদাই তো উকিল। ওরা বুঝছে”। কেদার গাল চুলকোলেন। “তোর ওদের উপর ভরসা নেই”? সুস্মিতা মাথা নাড়ল। কেদার বললেন, “আচ্ছা। আয় তুই। বাড়ি যা। মেয়ের কাছে যা। আমি দেখছি কী করা যায়। তোর বাবাকে বলিস যাবো একদিন তোদের বাড়ি। বুঝলি?” সুস্মিতা আরও একটুক্ষণ বসে থেকে চলে গেল। ঘন বলল, “আপনি বেরোবেন স্যার? গাড়ি জুতি?” কেদার মোড়া থেকে দুই পা নামালেন। বললেন, “আমায় ধর। পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে”।

রিজেন্ট পার্ক থানাটা একটা গলির মধ্যে। থানার সামনে বাচ্চারা ইঁট পেতে ক্রিকেট খেলছে। ঘনকে গলির বাইরে গাড়ি রাখতে বলে ভিতরে ঢুকলেন কেদার চাটুজ্জ্যে। ফোন করে রাখা ছিল। একটা সাবইন্সপেক্টর গোছের লোক তাকে ভিতরে নিয়ে গেল। ভিতরে টেবিলের উপর হাতে মাথা রেখে বসেছিলেন ওসি সান্যাল। কেদার সামনের চেয়ারটায় বসলেন। দু’দিকে হাতল। পা তুলে বসা যাবে না। সান্যাল রুমালে কপাল মুছে কাতর ভঙ্গিতে বললেন, “বিচ্ছিরি ফেঁসে গেছি স্যার”।

কেদার চ্যাটার্জী ভুরু নাচিয়ে বললেন, “তুমি ফেঁসেছ? তুমি? এদিকে একটা বাচ্চা ছেলে লক্‌আপ এ পচছে”– সান্যাল বললেন, “মোটেই পচছে না স্যার। আলাদা করে রেখেছি। নো মারধোর। নো বকাবকি। ধমকাবো কী? ল্যাজেগোবরে হয়ে আছে ভয়ে। এ মাল খুন করতেই পারে না”। কেদার একটু বেশিই অবাক হলেন। কিছু বললেন না। সান্যাল বললেন, “আরে, ওর বাড়ি গিয়ে দেখি মেয়েকে খাওয়াচ্ছে। আর কেউ বাড়ি নেই। ওই অবস্থায় নিয়ে আসা যায়? যা-ই বলি, আকাশ থেকে পড়ে। তারপর বউকে ফোন করল। বউ এলো। তারপর নিয়ে এলাম। না এনেই বা কী করি। ছুরির হাতলে একটাই ছাপ। শোভন মিত্তির”। কেদার এবার নড়ে বসলেন। পা তুলতে পারলে ভালো হত। এই সময় ঘন ঢুকল। ঢুকেই বলল, “দারোয়ান ভাই, তোমার টুলটা সাহেবকে দাও তো। তুমি চেয়ারে বসো বরং”। দারোয়ান হকচকিয়ে গেল। সান্যাল বললেন, “ঘনশ্যাম জিম টিম করছ নাকি? রোগা লাগছে?” দারোয়ান উঠে দাঁড়াল। ঘন টুলটা টেনে নিল। চেয়ারটা তার দিকে ঠেলে দিল। দারোয়ান বসল না। টুলের উপর বাবু হয়ে বসে কেদার বললেন, “ঘটনাটা খুলে বলো তো”।

“গত বৃহষ্পতিবার ময়দানে গোষ্ঠ পালের মূর্তির নীচে একটা মেয়ে মরে পড়েছিল। মহিলা। তিরিশ বত্তিরিশ হবে। দেখে মনে হয় না ইয়ে টিয়ে। ভদ্রঘরের বলেই মনে হয়। কোনো আইডি নেই, কিছু না। ব্যাগ, ফোন গায়েব। আঙুলের ছাপও মিলল না। এখনও শনাক্ত হয়নি। একটাই স্ট্যাব উন্ড। গলার ডানদিকে। আর ছুরিটা পাশেই পড়েছিল। বডি গেল মর্গে। ছুরি গেল ল্যাবে। বলল একপিস হাতের ছাপ রয়েছে। আর হাত মানে হাত। একটা দু’টো আঙুল নয়। পার্শিয়াল প্রিন্ট ও নয়। নগদ পাঁচটা আঙুল। তালুর ছাপ অবধি। কুকিং নাইফ। মোটা হাতল। তো ছাপ পাঠালাম ল্যাবে ফেরত। খুঁজে টুজে দেখলাম এই শর্মা। পোলিং এজেন্ট হয়েছিল এক দু’বার। সেই সূত্রে হাতের ছাপ ছিল সিস্টেমে। পাঁচটাই মিলে গেছে। ডানহাতের। তো তুলতে তো হতই। এখন এই ব্যাটা না করছে স্বীকার, না বলতে পারছে কী করে তার ছুরি গেল মার্ডার সীনে। বুঝুন!”

কেদার পা নামালেন টুল থেকে। বললেন, “একবার কথা বলা যায় ছেলেটার সঙ্গে?”

তিন

**********

মধুসূদন সাহা রিহার্সাল কাটিয়ে দিলেন। পরশু শো। কিন্তু এই মেজাজ নিয়ে এখন জয় জয় শিবশঙ্কর বাজাতে ইচ্ছে করছে না তার। তার আর ডি স্মৃতি গ্রুপ অন্য গিটারিস্ট পেয়ে যাবে। ভদ্রলোক সিগারেট ধরালেন। ফোন এহাত ওহাত করতে লাগলেন। তারপর দেওয়ালে হেলান দিলেন। ধোঁয়া সিলিং ছুঁতে পারল না। তার আগেই পাখায় কাটা পড়ল। ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বারান্দা থেকে নীচে একবার তাকালেন মধুসূদন সাহা। কেউ নেই গেটে। গলিটা রাস্তার মোড় অবধি পরিষ্কার দেখা যায়। একটা অটো থামল। একটা মেয়ে নামল। সাহা গ্রিলের অপরিসর ফাঁকে মাথা গলিয়ে স্পষ্ট করে দেখার চেষ্টা করলেন। চশমায় আটকে গেল। মেয়েটা এগোচ্ছে। এলো। গেট পেরিয়ে এগিয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে অনেকটা ধোঁয়া বেরোলো সাহাবাবুর নাকমুখ থেকে। সিগারেটটা টুসকি মেরে ফেলে তিনি নীচে নামলেন। চটি গলালেন। তারপর স্কুটার বের করলেন। ভাবলেন চাবি দিয়ে যাবেন কিনা। তারপর ভাবলেন ফিরে এলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে, দরজা খোলাই থাক। চুরিটুরি বিশেষ হয়না এই পাড়ায়। উত্তরপাড়া থানা পৌঁছতে লাগল কুড়ি মিনিট মতো। অলস থানা। তার এক ছাত্রকে দেখতে পেলেন। “ফোনটা চুরি গেছে স্যার”, সে বলল। হাল্কা মাথা নাড়লেন সাহা। তারপর সামনের উর্দিধারীকে বললেন, “ডাইরি করব। আমার মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি না”।

সাহা ভেবেছিলেন অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্ন করবে তাকে থানায়। বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা। বাড়ি থেকে পালানো অভ্যেস আছে কিনা। বাপ মেয়ের সম্পর্ক কীরকম। মেয়েকে কলকাতায় চাকরি করতে দিয়েছেন কেন, ইত্যাদি। সে’সব কিছুই হল না। লোকটা তাকে একটা চেয়ারে বসতে বলে ভিতরে চলে গেল। ওসি বেরিয়ে এলেন খানিকক্ষণে। এসে টেবিলের ওধারে বসে বললেন, “আমার নাম শ্রীধর। সামন্ত। আপনি গিটার বাজান না?” সাহা ছোট করে হ্যাঁ বললেন। সামন্ত বললেন, “আমি শুনেছি আপনাদের অনেক শো। এ অঞ্চলে বিখ্যাত তো আপনারা। মহাদেব ঘোষের গলা পুরো কিশোর! যাক্‌গে, নাম কী আপনার মেয়ের? বয়স কত?” সাহা বললেন, “শ্রেয়া। আসছে আগস্টে একতিরিশ হবে”। সামন্ত চুক চুক করে মাথা নাড়লেন। “এ তো আর পালানোর বয়স নয়। মেয়েরা পালায় চোদ্দ থেকে কুড়ির মধ্যে। টিনএজ এ। তিরিশের মেয়ে যথেষ্ট রেস্পন্সিব্‌ল হবার কথা, না?” সাহা জানালেন তার মেয়ে যথেষ্ট পরিণত। বউবাজারে অফিস। স্বাধীন। পালিয়ে করবার মতো কিছুই তার নেই। সামন্ত বললেন, “কবে থেকে পাচ্ছেন না খোঁজ? মানে শেষ কবে দেখেছেন?” সাহা বললেন, “গত পরশু। অফিস বেরোলো। রোজ যে সময়ে বেরোয়। ব্যস। ওই”। সামন্ত চেয়ার টেনে বসলেন। “পরশু? মানে বৃহস্পতিবার। আটচল্লিশ ঘন্টা হয়েছে সবে। এই জন্যই কি এর আগে আসেন নি?” সাহা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। সামন্ত বললেন, “আমার সঙ্গে একবার কলকাতা যেতে পারবেন এখন?” মধুসূদন সাহা হঠাৎ কেঁদে ফেললেন। সামন্ত ব্যস্ত হয়ে বললেন, “এই দেখুন, আরে, নাও তো হতে পারে। আমাদের প্রসিডিওর ই এই। আগে ওই অপশনটা নাকচ করা। তারপর ভালো করে খোঁজা যাবে’খন। ওনার অফিস যাবো, কত লোকের সঙ্গে কথা হবে। ঠিক একটা না একটা কিছু বেরিয়ে যাবে। আরে কলকাতা বড় শহর। কেউ না কেউ ঠিক দেখেছে। ঠিক জানে। দেখলেন আজকে রাত্তিরের মধ্যেই পেয়ে গেলেন মেয়েকে”।

সাহাবাবু স্কুটার থানায় রেখেই পুলিশের গাড়িতে কলকাতা রওনা হলেন। বাড়িতে তালা দেবার কথা মনেই রইল না।

চার

**********

“এই যে ছোকরা। নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছ তো সবাইকে। একটু ঝেড়ে কাশো তো দেখি? সিগারেট খাবে?”

শোভন মাথা নাড়ল। কেদার বললেন, “গুড। আমিও খাইনা। তুমি ফস্‌ করে হ্যাঁ বলে বসলে আবার ঘনকে পাঠাতে হত আনতে। সে’টা আবার সান্যাল অ্যালাউ করত কিনা কে জানে। তোমাকে ওরা মারে টারে নি তো?”

শোভন ফের মাথা নাড়ল। কেদার বললেন, “এই যে ভাই, শোনো। চুপ করে থেকো না। আখেরে তোমারই বিপদ তাতে। আমি তোমার শ্বশুরের বন্ধু। বুঝলে? হয়ত তুমি কিছুই করো নি। ফেঁসেছ গ্যাঁড়াকলে। কিন্তু এই জামাই আদর ও বেশিদিন টিকবে না, বুঝলে? এবার যা যা জানতে চাইছি চুপচাপ বলে ফেলো তো”।

ঘন দাঁড়িয়েছিল ঘরের দরজার কাছে। সে বলল, “চুপচাপ কী করে কথা বলা যায় স্যার? হয় চুপচাপ থাকবে, নয় কথা বলবে”। কেদার চোখ থেকে চশমা নামিয়ে ভুরু দিয়ে এক রকম গেট আউট বলতে পারেন। সে’টা বললেন। ঘন হাসল। বেরোল না। কেদার ওইঘর থেকে আনা টুলটায় পা উঠিয়ে বাবু হয়ে বসলেন। তারপর বললেন, “তুমি ডানহাতি, না বাঁহাতি?”

“ডান”।

“ছুরি লেগেছে গলার ডানদিকে। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে মারলে সে’টা ল্যাটাহাতের কাজ। পিছন থেকে মারলে ডান। জিজ্ঞেস করতে হবে সান্যালকে। যাই হোক। তুমি ওই মেয়েটাকে চেনো?”

শোভন মুখ তুলল। “কোন মেয়ে?”

“ওরা ছবি দেখায়নি তোমায়?”

“না”।

“ওহ্‌। তার তো নাম ও জানা যাচ্ছে না। আচ্ছা যাক্‌গে। ছুরিটা দেখিয়েছে?”

“না”।

“তোমার ছুরি?”

“না। আমাদের বাড়িতে বঁটি দিয়ে সব কাটা হয়। একটা ছোট ছুরি আছে হয়ত। ওই কেক, ফল, ওইসব কাটা যায়। ওতে গলা কাটার মতো ধার নেই। সেইটা হয়ে থাকলে জানিনা”।

“তাহলে তো ভাই মুশকিল। যে ছুরি তুমি চেনোনা, সে ছুরিতে তোমার হাতের ছাপ যায় কী করে? বাড়িতে না হোক, আপিসে? অন্য কোথাও অন্য কারুর বাড়ি?”

“জানি না। দেখিনি তো ছুরিটা”।

“আচ্ছা। গতপরশু সন্ধ্যেবেলা কী করছিলে তুমি?”

“অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম”।

“কোথায় অফিস তোমার?”

“বরানগর”।

“বরানগর? বরানগর থেকে টালিগঞ্জ তুমি ডেলি প্যাসেঞ্জারি করো? তার থেকে দিল্লি যাওয়া সোজা তো”।

“মেট্রো”।

“মেট্রো। রাইট। শ্যামবাজার। তারমানে ইজিলি ময়দানে নামা যায়”।

শোভন একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরে নামিনি আমি কোথাও। ডিরেক্ট শ্যামবাজার থেকে নেতাজী এসেছি”।

“বেশ বেশ। বেশ। ঠিক আছে। তোমার দাদা বোধহয় বেল এর ব্যবস্থা করবে। বেশিক্ষণ নয়। এরা দিয়েও দেবে। আমি এখন আসি?”

কেদারবাবু পা নামালেন। কিন্তু উঠলেন না। ঘন সরে দাঁড়িয়েছে। সান্যাল এসেছেন। এসে বললেন, “শোভনবাবুকে একবার লালবাজার নিয়ে যেতে হবে। আপনি যাবেন, স্যার?”

পাঁচ

**********

মধুসূদন সাহা প্রায় নিশ্চল হয়ে বসেছিলেন একটা চেয়ারে। লালবাজারে আগে কখনও আসেননি তিনি। জানলা দিয়ে কতকিছু দেখা যাচ্ছে। হাওড়া ব্রিজ। দ্বিতীয় হুগলী সেতু। শহীদ মিনার। সব। কত উঁচু বাড়ি। তেমনি পুরু দেওয়াল। ইংরেজদের ব্যাপারই আলাদা। খুব ঘন ঘন হুঁশ চলে যাচ্ছে তার। ঠিক বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছেন, তা নয়। শুধু সত্যিটা থেকে, তার চারপাশ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। এই যেমন এখন মেয়ের মৃত্যুর কথা তার মনেই নেই, এমন ভাব করে একটা প্রাণবন্ত শহর দেখছেন লালবাজারের জানালা দিয়ে। তার সামনে ঘরের ভিতর তিন থানার ওসিদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তিনি একটুও ওয়াকিবহাল নন। কিন্তু হতে হল। তিন স্বরে ও মশাই, শুনছেন তার কানে আছড়ে পড়ল। মধুসূদন সাহা ঘরে ফিরে এলেন।

“বলছি এই ছেলেটিকে চেনেন?” জানতে চাইলেন ময়দান থানার ওসি। উত্তরপাড়া একটু চুপচাপ। রিজেন্ট পার্ক কী করবেন বুঝে পাচ্ছেন না। মধুসূদন সাহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। ময়দান একটি ছবি বাড়িয়ে দিলেন তার সামনে। তার চোখ থেকে টেবিলে চোখ গেল ভদ্রলোকের।

“না। চিনি না”।

“এর নাম শোভন। এর কথা কখনও শুনেছেন আপনার মেয়ের কাছে?”

“না। এই নামে কারুর কথা ও কখনও বলেনি”।

“ভালো করে মনে করে দেখুন সাহাবাবু। হয়ত আপনাকে সরাসরি বলেনি। লুকিয়ে প্রেম করত টরত?”

“প্রেম করত। প্রকাশ্যেই। অফিসের একটি ছেলের সঙ্গে। এ নয়। অর্ক। এসেছে বাড়িতে। ভালো ছেলে”।

ময়দান একটু চুপ করলেন। তারপর বললেন, “জানি। অফিসে খোঁজ নিয়েছি। অর্ক হায়দ্রাবাদে। কনফার্মড। গত পরশু ও ছিলো না কলকাতায়। আজও নেই। কাল আসবে”।

সাহা বললেন, “আমাকে কেন বলছেন এদের কথা বলুন তো? আপনাদের ঘরে অনেক ঝুল জমেছে। পরিষ্কার করান। ঝুল থেকে হাঁপানি হয়”।

তিন ওসি পিছিয়ে এলেন। মধুসূদন সাহাকে নিয়ে কী করা যায় কেউ বুঝতে পারছেন না। এঁকে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কাউকে দিয়ে বাড়ি পাঠাতে হবে।

দরজায় টোকা পড়ল। ঘন মুখ বাড়াল। বলল, “স্যার ডাকছেন”।

তিন ওসি বেরিয়ে গেলেন। উত্তরপাড়া রিজেন্টকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই স্যার লোকটা কে?” রিজেন্ট বললেন, “রিটায়ার্ড লালবাজার। সাসপেক্ট এর ফ্যামিলি হায়ার করেছে। আমি চিনি। ভালো লোক”।

তিনজন ঘরে ঢুকলেন। ঘন দরজা বন্ধ করে দিলো। কেদার বললেন, “আমায় কেউ হায়ার করেনি। আমি হায়ার অথরিটি নই। আমার কাছে স্রেফ সাহায্য চেয়েছে। বসুন”।

তিন ওসি বসলেন। তিনটে বেশ পুরোনো মেহগনি চেয়ারে। ঘন বিশাল টেবিলটার একপ্রান্তে ডাঁই করা হলুদ জরাজীর্ণ ফাইলগুলো তুলে মাটিতে রাখল। একটা গামছা কোত্থেকে জোগাড় করেছে। তাই দিয়ে ধুলো ঝাড়ল। সবাই নাকে রুমাল চাপা দিল। কেদার খক্‌খক্‌ করে একটু কেশে টেবিলে উঠে জুত করে বাবু হয়ে বসলেন। তিন ওসির মুখ হাঁ হয়ে গেল।

কেদার বললেন, “শোভনকে একবার মেয়েটার ছবি, প্রেফারেবলি জ্যান্তবেলার ছবি, আর ছুরিটা দেখাতে হবে। শ্রেয়া আর শোভনের মধ্যে কোনও লিঙ্ক এখনও পাওয়া গেছে?”

তিন ওসি মাথা নাড়লেন।

“সে’টাই অদ্ভুত লাগছে। যোগ তো একটা থাকতেই হবে। ও খুন না করলেও… এক মিনিট, মেট্রোর সিকিউরিটি ফুটেজ এসেছে?”

ময়দান বললেন, “এসেছে। পৌনে সাতটায় শ্যামবাজার, ঘন্টাখানেক পরে নেতাজী। ওই একই ট্রেন স্যার। মানে নেমে পরের ট্রেনে এসেছে, সে’রকম কিছু নয়। আর ময়দানে নামতেও দেখা যায়নি। প্লাস ওর এক কলিগ তো বলল ওরা একসঙ্গে এসেছে কালিঘাট অবধি। মানে কালিঘাটে সেই লোকটি নেমে গেছে। কিন্তু সে তো ময়দান পেরিয়ে”।

“পেরিয়ে তো বুঝলাম। কিন্তু ভেবে দেখো, ট্রেন যখন ময়দান স্টেশনে, টাইম অফ ডেথ ও ঠিক তখন। ঘেঁটে যাচ্ছে। টাইম মিলছে। স্পেস মিলছে। কিন্তু কন্টিন্যুয়াম হচ্ছে না। একজন পাতাল ঘরে, একজন ধরণীপরে”।

“সেই সময় তো ময়দান স্টেশনে কয়েকশো লোক ছিল স্যার”, রিজেন্ট বললেন।

“তা তো ছিল। কিন্তু তাদের কতজনের আঙুলের ছাপ মার্ডার ওয়েপনে ছিল বলো তো?”

“কেউ ফাঁসাচ্ছে স্যার, শোভনকে?”

“দেখো সান্যাল, আমি যদি কাউকে খুন করে অন্য কারুর উপর দোষ চাপাতে চাই, তা’হলে এমন কাউকে বাছব যার সঙ্গে ভিক্টিমের একটা কোনও রিলেশন আছে, ঝগড়া আছে, মোটিভ আছে, তাই না? নিদেনপক্ষে একটা কনেকশন, যে হ্যাঁ ওরা একে অপরকে চেনেনা, কিন্তু একই অফিসে চাকরি করে, বা একই ডাক্তারের কাছে যায়, বা একই ট্রেনে ফেরে। না। না। ওসিগন। খোঁজো। খোঁজো। একে শূলে চড়াতে চাইলেও কনেকশন না পেলে এই সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স কোর্টে টিকবে না। হয় রিলেশন বের করো। নয়ত ছুরিরহস্য ভেদ করো। মোট কথা, কথা বলাও। দেখো কোন বারে টারে দেখা হয়েছিল। কী কোনও বিয়েবাড়িতে। হি মাস্ট হ্যাভ মেট হার সামহোয়ার। বাই দি ওয়ে, পালবাবু কী বলছেন?”

উত্তরপাড়া জিজ্ঞেস করল পালবাবু কে। রিজেন্ট বললেন ফরেন্সিকের অফিসার। ময়দান বললেন, “পালবাবু বলছেন ছুরিটা ধরা হয়েছিল ক্রিকেট ব্যাটের মতো। মানে আপরাইট, বা সবজি কাটার মতো। আর উন্ড হয়েছে পিছন থেকে সামনে, মানে”-

“ব্যাকস্ট্যাবিং। মানে ডানহাত এই। শোভনও ডানহাতি। বেশিরভাগ মানুষই ডানহাতি। কিছুই কংক্লুসিভ হচ্ছে না যে পার্থ”।

তিন ওসি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাঁদের কারুর নাম পার্থ নয়।

ছয়

**********

ঘন দাদাগিরি দেখছিল। দেখছিল। কিন্তু শুনছিল না। তার কান পড়ে ছিল খাবার ঘরে, যেখানে তিন ওসি আর কেদার চাটুজ্জ্যে বসে খেতে খেতে কথা বলছিলেন।

উত্তরপাড়া বললেন, “সাহাবাবুর অবস্থা খুব খারাপ। চোখে দেখা যাচ্ছে না। আমি শ্মশানে গেছিলাম। ওখান থেকে ওঁর বোন ভগ্নিপতি এসে তাঁদের বাড়ি নিয়ে গেলেন। উনি কীসব বলছিলেন মাথামুণ্ডু বোঝা যাচ্ছিল না। তালা দেওয়া হয়নি না কীসব। ওঁর স্কুটারটাও থানায় পড়ে রয়েছে”। কেদার চাটুজ্জ্যে হেঁচকি তোলা শুরু করলেন হঠাৎ। ঘন তাড়াতাড়ি উঠে এসে গ্লাসে জল ভরে এনে দিল। এক নিঃশ্বাসে গ্লাস খালি করলেন কেদার। ঘন বলল, “কেউ খিস্তি করছে স্যার আপনাকে”। কেদার রক্তচক্ষুতে তাকালেন তার দিকে। তার হেঁচকি থামেনি। ঘন বলল, “নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকুন। কমে যাবে”। হেঁচকির মধ্যে মধ্যে কেদার বললেন, “তাই তো তুই চাস”। ঘন আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বেল বাজল। হঠাৎ করেই কেদারের হেঁচকি থেমে গেল। এক মিনিটের মধ্যে সুস্মিতা এসে ঢুকল খাবার ঘরে। কেদারের ঘনকে বকতে ইচ্ছে করল। মেয়েটাকে দুম করে খাবার ঘরে আনবার দরকার ছিলো না। বসবার ঘরটা রয়েইছে বসানোর জন্য। আহাম্মক। কিন্তু মুখে বললেন, “তুই বাইরের ঘরে গিয়ে বোস মা এক মিনিট, আমি হাত ধুয়ে আসছি”। সুস্মিতা বলল, “আপনি খেয়ে নিন না, তাড়া নেই”।

পাঁচজন অপ্রস্তুত মানুষ বসে ছিল কেদার চাটুজ্জ্যের বসবার ঘরে। তথ্য কিছু আছে। আলগা। তাদের কে জোড়া লাগানোর মত যথেষ্ট আঠা নেই। শুধু টেবিলের উপর একটা ঢাকা দেওয়া কার্ডবোর্ডের বাক্স রয়েছে। কেদার তার ঢাকনা খুলে একটা খাম বের করলেন। সে’খান থেকে একটা ছবি বের করে সুস্মিতাকে দিয়ে বললেন, “দ্যাখ তো, একে চিনিস?” সুস্মিতা ছবিটা নিল। দেখল। তার মুখের ভাব পড়বার চেষ্টা করলেন চার ধুরন্ধর। দেখে কারুরই মনে হল না চিনতে পেরেছে সুস্মিতা। সুস্মিতা সময় নিল। তারপর বলল, “এই মেয়েটিই…?” কেদার ইতিবাচক মাথা নাড়লেন। সুস্মিতা বলল, “চিনতে তো পারছি না। ভিড়ের মতো মুখ আসলে, মনে থেকে যাবার মতো নয়। শোভন চিনেছে?” এবার উত্তর দিলেন ময়দান। বললেন, “না, শোভনবাবুও বললেন চিনতে পারছেন না। সমস্যাটা ওখানেই”। সুস্মিতা বলল, “আপনারা কি নিশ্চিৎ শোভনই…?” কাউকে উত্তর না দিতে দিয়ে কেদার বললেন, “শোভন এখন কোথায়? বাড়িতে?” সুস্মিতা বলল, “উহুঁ। আমরা কেউ বাড়িতে নেই। বাবার কাছে আছি সবাই মিলে, ওর দাদাও এসেছেন। আমি আর থাকতে পারছি না ওখানে। আসলে এতগুলো প্রশ্ন। উত্তর না পাওয়া অবধি…” রিজেন্ট বললেন, “প্রশ্ন তো আমাদেরও। এই দু’জনের মধ্যে কোনও সূত্র আমরাও পাচ্ছি না। সারাদিন খুঁজেছি। শোভন, শ্রেয়া, কোথায় কোথায় নিয়মিত যায়, কোনও কমন বন্ধু আছে কিনা… ওদের ফেসবুকেও তো তেমন কোনও সূত্র পেলাম না। ফোন রেকর্ড চেক করা হয়েছে, কেউ কাউকে কখনও ফোন ও করেনি। শোভন কে ছেড়ে দেওয়াই যেত, যেহেতু অ্যালিবাই এত স্ট্রং, কিন্তু ওই ছুরিটাই…” উত্তরপাড়া এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এবারে বললেন, “দেখুন, শোভন কে নির্দোষ প্রমাণ করাটা আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য কিন্তু নয়, আপনার হয়ত শুনতে খারাপ লাগবে, কিন্তু ঘটনা হচ্ছে একটি মেয়ে খুন হয়েছে, আপনারই বয়সী, এবং তাকে খুন করা হয়েছে যে অস্ত্রে, তাতে আপনার স্বামীর ছাড়া আর কারুর আঙুলের ছাপ নেই। মেয়েটির খুনীকে খুঁজে বের করাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য, এবং তাতে এখনও অবধি শোভনবাবুই প্রাইম সাসপেক্ট”।

কেদার বুঝলেন রিজেন্ট পার্ক গোটা জিনিসটাকে দেখছে শোভনের দিক থেকে, উত্তরপাড়া খুব স্বাভাবিকভাবেই শ্রেয়ার কোণ থেকে। ময়দান খাচ্ছে হিমশিম। তিনি বললেন, “শ্রীধর, তোমায় তোমার স্টেশনে ফিরতে হবে না? কোনও চাপ নেই?” উত্তরপাড়া মাথা নাড়লেন। কেদার বললেন, “বেশ। তুমি ধরে নিয়েছ যেমন শোভনই খুনটা করেছে, তাই ধরে রাখো। এ’বার ভাবো আর প্রমাণ খোঁজো, কী করে একটা মানুষ একটা ট্রেন থেকে বেরিয়ে পাতাল থেকে উপরে উঠে ময়দান স্টেশন থেকে গোষ্ঠ পালের মূর্তি, মানে রেড রোড অবধি গিয়ে কাউকে খুন করে পুরো রাস্তাটা ফিরে ফের ওই ট্রেনেই উঠল”।

সুস্মিতা বলল, “কিন্তু অভি তো বলছে ও নামেনি। ফুটেজেও তো…”

কেদার বললেন, “একটু চুপ করে বোস তুই। আমাদের নিরপেক্ষ হতে দে”।

সুস্মিতা চুপ করল। বড় সোফাটার এক কোণে পা তুলে বাবু হয়ে বসে কেদার বললেন, “এ’টার থিওরি আগে দাও। থিয়োরি দাও, তারপর সে’টা প্রমাণ করো। ডিসপ্রুভ হলে অন্য থিওরি খোঁজো”। উত্তরপাড়ার সামন্ত কিছুক্ষণ ফাঁকা হাওয়া আওড়ালেন। মুখ খোলেন, আর থেমে যান। তারপর এক সময় বলেন, “উনি উপরে উঠলেন। ট্যাক্সি নিয়ে গোষ্ঠ পাল গেলেন, খুন করলেন, সে ট্যাক্সিতেই পরের কোনও স্টেশনে, যতীন দাস পার্ক বা ওই নাগাদ আবার উঠলেন। আর তাছাড়া মেট্রো স্টেশনের ক্যামেরা এড়ানো এমন কিছু বড় ব্যাপার না। সবক’টা গেটের ক্যামেরা সবসময় কাজ করে নাকি?” রিজেন্ট ফুঁসে উঠলেন। “রাবিশ। আপনি ময়দান থেকে যতীন দাস পার্ক একই সময় একটা মেট্রো আর একটা ট্যাক্সিকে ছাড়ুন। এবার দেখুন কে আগে পৌঁছয়। আর আপনি বলছেন অতটা রাস্তা ঘুরেও একই সময় পৌঁছেছে!” উত্তরপাড়া বললেন, “আহ্‌ মেট্রো বিভ্রাট হয় না? হয়ত দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ”। রিজেন্ট বললেন, “যা খুশি তাই! শোভনবাবু তো ভগবান, আগে থেকে জেনে বসে আছেন যে মেট্রো গোলযোগ করবে, আর তার উপর ভিত্তি করে উনি অ্যালিবাই গড়বেন”। উত্তরপাড়া মিনমিন করে বললেন, “ঘুষ দিয়ে ফিট করে রাখাই যায় সিগন্যাল ম্যান কে”। ময়দান এবার মুখ খুললেন। “আপনারা কি ছেলেমানুষ? এ’রকম বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছেন কেন? এতগুলো যদি কিন্তু নিয়ে কেস হয়? আর তাছাড়া সিকিউরিটি ফুটেজ বলছে দু মিনিট ও দেরী হয়নি ওই ট্রেনের নেতাজী পৌঁছতে। আর সে’টা হামেশাই হয়। দরজা খোলা বন্ধ করতে করতেই নাকাল। এ থিওরি খাটল না”। সবাই চুপ করে গেল।

আবার একটা অপ্রস্তুত নিস্তব্ধতা। কেদার বললেন, “পার্থ, তুমি এবার শোভনের দিকটা ছাড়ো। ধরে নাও ওর হাতের ছাপ ছুরিতে ছিল না। একটা ডেডবডি পেয়েছ, তার নাম ঠিকানা পেয়েছ। সেই লাইনে দেখো, কার মোটিভ ছিল, কার সু্যোগ ছিল। যে’ভাবে নরম্যালি তদন্ত করতে, সেইভাবে করো। মেয়েটার দিনটা ট্রেস করো। বউবাজার থেকে হাওড়া যাবার পথে সে মেয়ে ময়দান যায় কেন, সে’সব দেখ। ওইদিকটা নেগলেক্ট করছ তোমরা”। ময়দান বললেন, “আজ্ঞে পার্থ কে স্যার?” কেদার বললেন, “পার্থ বললাম বুঝি? পার্থ আমার সি আই এর নাম ছিল। ধুস। তোমার নাম যেন কী?” ময়দান বললেন, “খরাজ”। কেদার মাথা নাড়লেন। “খরাজ। লোকজন নিয়ে রাস্তায় নামো। সময় বয়ে যাচ্ছে। শোভন কোথাও যাচ্ছে না। আসল খুনী কোথায় চলে যাবে তার কোনও ঠিক নেই”।

তিন ওসি উঠে দাঁড়ালেন। বসে থাকা দু’জনকে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন। সুস্মিতা ছলছল চোখে বলল, “কী হবে কাকাবাবু?” কেদার সোফায় পা টানটান করে দিলেন। তারপর বললেন, “একজন আর্কিওলজিস্ট ও একজন গোয়েন্দা, জানিস তো?” সুস্মিতা চোখ মুছল আঁচলে। কেদার বলে চললেন। “একজন প্রত্নতাত্ত্বিক এর কাজ ও একজন গোয়েন্দার মতো। তারা তো র‍্যান্ডম জায়গায় খুঁড়তে শুরু করে না। কোনও ক্লু পেলে, সেখানে মাটি খোঁড়ে। তারপর যা পায়, তাই থেকে একটা কাঠামো গড়ার চেষ্টা করে। সবটাতো অক্ষুণ্ণ পাওয়া যায় না। অংশ মেলে। বাকিটুকু ইমাজিনেশন। আমি যে শুরুটাই পাচ্ছি না। কোথায় খুঁড়ব? ছুরির হাতলে তোর বরের হাতের ছাপ। ব্যস। তারপর? মাঝখানে শূন্য। একদিকে তোর বরের হাত। একদিকে ছুরি। মিসিং লিঙ্ক আমি কোথায় পাই? ইয়োর বর ইজ নট হেল্পিং। সে ছুরিটা চিনতেই পারছে না”।

সাত

**********

সুস্মিতা জিজ্ঞেস করল, “এ’টা কোন মাস চলছে?” শোভন খানিকক্ষণ মাথা চুলকালো। তারপর বলল, “জুলাই তো। হ্যাঁ জুলাই। আজ দোসরা”। সুস্মিতা বলল, “তোমার কি শীত করছে?” শোভন বিস্মিত হয়ে বলল, “দেখে তাই মনে হচ্ছে? বগলের তলায় ঘামের ছোপ। শুঁকবে?” সুস্মিতা ছিঃ বলে নাক কুঁচকালো। তারপর বলল, “কোন সুস্থ মস্তিষ্কের লোক এই ভ্যাপসা গরমে গ্লাভ্‌স পরে?” শোভন নিজের হাতের দিকে তাকাল। হাত উল্টেপাল্টে দেখল। নিজের চামড়া বলেই মনে হল তার। তারপর সুস্মিতার দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের পিছনে সেই লোকটাকে দেখতে পেল সে। “বরের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ঝারি মারছ?” সুস্মিতা মুখ ঝামটা দিল। “বিল চেক করবার নাম করে এই পাঁচ মিনিট আগেই কাউন্টারের মেয়েটাকে আপাদমস্তক গিলছিলে। তার বেলা?” তারপর বলল, “দেখো না, লোকটার হাত দেখ?” শোভন দেখল একটা বেশ বেঁটে রোগা লোক, ছিটের ফতুয়া আর পাঞ্জাবী পরে হাত বাড়িয়ে ট্যাক্সি থামাচ্ছে সুপারমার্কেটের বাইরে। তার হাতে কালো দস্তানা। শোভন বলল, আরে, পুরে গেছে হয়ত। অনেকের হয় ও’রকম। কোনও ডিফর্মিটি থাকলে লুকিয়ে রাখে। সবাই সব জিনিস নিয়ে কমফর্টেবল হয় না। নীহার কাকা সবসময় ফুলহাতা জামা কেন পরে? ওর বাঁহাতে একটা পুড়ে যাবার দাগ আছে। মেলায়নি। বিশ্রী লাগে দেখতে। একটা ট্যাক্সি থামল। দস্তানা আগন্তুক তাতে চড়ে বিদায় নিল।

আজকে হঠাৎ সেই দিনটার কথা মনে পড়ল সুস্মিতার। দস্তানা মশাইএর মুখ মনে নেই। কিন্তু অবিকল সেই আকারের একটা লোক তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। উপরের দিকে তাকিয়ে। ইতস্ততঃ করছে। সুস্মিতা রিকশা থেকে দেখতে পাচ্ছে। চালক আর এক ডজন পা ঘোরালেই পৌঁছে যাবে লোকটার কাছে, বাড়ির সামনে। রিকশাওলার বোধহয় হাত চুলকোচ্ছিল, নইলে সে বেকার ফাঁকা রাস্তায় ভেঁপু বাজাবেই বা কেন? সেই ভেঁপু শুনে লোকটা ফিরে তাকালো। বাড়ির সামনের আলোটা তার মাথার পিছনে পড়েছে। মুখটা ঠিক মতো দেখা গেলো না। লোকটা মুখ নামিয়ে পিছন ফিরে হনহন করে পিছনের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। সুস্মিতা বলল, “অ্যাই রাজা, রিকশা ফেরা, ওই বাড়িতেই যাবো। একটা জিনিস ফেলে এসেছি”।

কেদার জিজ্ঞেস করলেন, “কবেকার কথা এ’টা?” ময়দান কার্ডবোর্ডের বাক্সটা নিয়ে যায়নি। যাওয়া উচিৎ ছিল। এভিডেন্স থানার বাইরে না থাকাই ভালো। কথা উঠবে। আগে এ’টা ছিল না, পরে ঢোকানো হয়েছে। বা এ’টাও ছিল ওর মধ্যে, সরিয়ে ফেলেছে কেউ। যদিও ক্যাটালগে সব লিখে রাখার নিয়ম একদম শুরুতেই। কী কী পাওয়া গেছে, লেবেল আর ছবি সমেত। তবু। ফালতু ঝামেলার দরকার তো নেই। প্রত্যেকটা জিনিস একটা প্লাস্টিকের মুখ আঁটা ব্যাগে রাখা। তার মধ্যে থেকে শ্রেয়ার পার্সটা তুলে নাড়াচাড়া করছিলেন কেদার। এমন সময় ঘন এসে বলল, “পা নামিয়ে বসুন স্যার। আপনার দিদিমণি ফের আসছে। বলেন তো একটা এক্সট্রা বিছানা পাতি”। ঘনর প্রগল্‌ভতা মাত্রা ছাড়িয়ে যায় মাঝেমধ্যে। অথচ এই দোষ হোক গুণ হোক, জিনিসটা না থাকলে অন্ধকার থেকে মনোযোগ সরানো মুশকিল হত। সুস্মিতা এসে গেটের বাইরে নামল। রিকশাওলাকে ছেড়ে দিতে হল। রাত হয়েছে। ভিতরে ঢুকে এসে হড়বড় করে দস্তানার গল্প বলল কেদারকে।

“দাঁড়ান। আজ হচ্ছে সোমবার রাত। ওকে তুলল শনিবার রাতে। আর আমরা বাজার করতে গেলাম”, সুস্মিতা ভুরু অনেকখানি কুঁচকে বেশ জটিল একটা হিসেব করল, তারপর বলল, “বুধবার। সন্ধ্যেবেলা”। কেদার বললেন, “বলিস কী রে। মানে তো মার্ডারের আগের দিন! তুই শিওর সেই লোকটাই তোর বাড়ির সামনে ছিল এখন?” সুস্মিতা বলল, “আমি বোকামো করছি, না কাকাবাবু? সর্ষের মধ্যে ভূত দেখছি”। ঘন ঘরের পাতাবাহার গাছটায় একটা গ্লাসে করে জল দিচ্ছিল। বলল, “উঁহু, আপনি দড়িকে সাপ দেখছেন”। কেদার আর সুস্মিতার কথোপকথনটার তালগোল পাকিয়ে গেল। দু’জনেই ভুলে গেল কী নিয়ে কথা হচ্ছিল। কেদার বললেন “ঘন কে একদিন আমি খুন করব। লোকাবোও না। জনসমক্ষে। পিটিয়ে খুন করব”। ঘন বলল, “স্যারের দয়ার শরীর”। তারপর নিজেই খেই ধরিয়ে দিল সুস্মিতাকে। “স্যার আপনাকে জিজ্ঞেস করছিলেন যে আপনার বাড়ির সামনের লোকটা আর ওই গ্লাভ্‌স পরা লোকটা একই কীনা”। দু’জনে মাথা নাড়ল। কেদার বললেন, “তুই আমায় পুরো ঘেঁটে দিলি মা। একটা অদ্ভুত খাপছাড়া তথ্য দিলি আমায়। এই ঘটনাটা আমি কোন ছকে ফেলব? আর কিছুর সঙ্গে তো আমি” –

সুস্মিতা একটা অদ্ভুত শব্দ করে আঁৎকে উঠল। চমকে উঠে ঘনর হাতের গ্লাস থেকে জল পড়ল মেঝেতে। কেদার এক সেকেন্ডের থেকে একটু বেশি সময় নিয়ে কারণটা বুঝলেন। অন্যমনস্ক হয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে কখন বাক্সটা থেকে প্লাস্টিক ব্যাগ মোড়া ছুরিটা বের করেছেন। তিনি লজ্জিত হয়ে বললেন, “আরে, আরে কিছু হয়নি। এ’টা তোর সামনে বের করা ভুল হয়েছে। আমি ইচ্ছে করে করিনি। শান্ত হ”।

কেদারের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সুস্মিতা বলল, “কাকাবাবু, আমি জানি শোভনের আঙুলের ছাপ কী করে ওই ছুরিতে গেছে”।

আট

**********

“আপনাদের সব এভিডেন্স ই সারকামস্ট্যানশিয়াল”, উকিল দত্ত বললেন। গলার স্বরে তেমন তেজ নেই। তেজ নেই তার মক্কেল কৈলাসের শরীরভঙ্গিতেও। কেমন নেতিয়ে পড়ে আছে চেয়ারে। মঙ্গলবার দুপুরে ডেকার্স লেনে পাঁউরুটি আর ঘুগনি খাচ্ছিল সে। তারপর কোথা থেকে কী হয়ে গেল, এখন ময়দান থানাতে বসে খাবি খাচ্ছে। কাঠের চেয়ারের হাতলের সঙ্গে হাতকড়ি দিয়ে বাঁধা তার বাঁ হাত। টনটন করছে। তার ডানপাশে উকিল দত্ত ব্যাজার হয়ে দাবী দিচ্ছেন কিছু। খানিকটা “ওকে সাসপেন্ড করবেন না স্যার। বাচ্চা ছেলে, মারপিট ও বিশেষ করে না, একদিন খেলতে খেলতে লেগে গেছে। আমি বাড়ি গিয়ে বকে দেবো আচ্ছা করে স্যার, সাসপেন্ড করবেন না” – এই ভঙ্গিতে। ওদের উলটো দিকে চেয়ার সরিয়ে একটা বড় বেঞ্চি পাতা হয়েছে। তাতে তিন ওসি আর কেদার চাটুজ্জ্যে বাবু হয়ে বসেছেন। দেখে মনে হচ্ছে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর আর বাবা লোকনাথ। এ’টা ভেবেই ফিক্‌ করে হেসে ফেলল ঘন। বাবা লোকনাথ। রণে বনে জঙ্গলে কুলকিনারা না পেয়ে সুস্মিতা এসেছিল লোকনাথের কাছে।

ময়দান বললেন, “আপনি কি আদৌ উকিল? আপনার মক্কেলের নামে কীসের চার্জ বলুন তো?” উকিল দত্ত মিনমিন করে কিছু একটা বললেন। ঘনর শুনে মনে হল তিনি বলছেন “ক্লাসে কথা বলছিল। মনিটর নাম লিখেছে”। ময়দান গলার জোর বাড়িয়ে বললেন, “আহ্‌, যা বলবেন চেঁচিয়ে বলুন!” দত্ত বলল, “খুন, খুন। খুনের”।

ময়দান বললেন, “দশে পাঁচ পাবেন। আরও আছে। একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক, কেমন? শ্রেয়া সাহার বউবাজারের রিয়েল এস্টেটের অফিস, কৈলাসবাবু তার জুনিয়র। ঠিক?” দত্ত আর দত্তর মক্কেল একসঙ্গে মাথা নাড়লেন।

“শ্রেয়া সাহার কাজ ছিল ক্লায়েন্ট পার্টিকে বাড়ি দেখানো? কেমন? আর কৈলাসবাবুর কাজ কী ছিল?”

কৈলাস এই প্রথম মুখ খুলল। “পোটেনশিয়াল বাড়ির খোঁজ আনা”।

ময়দান বাচ্চাদের মতো হাততালি দিলেন। “ঠিক। আপনার কাজ ছিল কোথায় কোন বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট করা যায়, কোথায় কোন বাড়ি খালি পড়ে আছে, সে’সবের খোঁজ রাখা। সেই করতে গিয়ে আপনি বেকবাগানের রাসমণি আমলের বাড়িটার সন্ধান পান। তাই তো?” নীরবে মাথা নাড়ল কৈলাস।

“হ্যাঁ। আপনার আপিসের পসিবিলিটি রেজিস্টারে সেই প্রপার্টির নাম আছে। সে নাম উঠেছে তিন বছর আগে। এর মধ্যে কেউ ওই বাড়িতে ইন্টারেস্ট দেখায়নি। আপনার বস বলেছেন এ’কথা। আপনার কোম্পানি না পেয়েছে প্রোমোটার, না পেয়েছে বাড়ি কেনার খদ্দের। কেবল খাতায় কলমে একটা সম্ভাবনা হয়ে থেকে গিয়েছিল। তাই না?” ময়দান একটু থামলেন। উত্তরপাড়া আর রিজেন্ট পার্ক উশখুশ করছেন। এই গল্প তাঁদের জানা। ঘনর জানা নেই। ঘন নখ কাটছে দাঁতে। জমে উঠেছে ব্যাপার স্যাপার। গরুচোরের মতো মুখ করে বসে আছে কৈলাস।

ময়দান আবার বক্তৃতা শুরু করলেন। “তারপর গত সপ্তাহে আপনাদের রেজিস্টার বলছে গাঙ্গুলি এন্টারপ্রাইজ যোগাযোগ করেছিল সেই বাড়ির ব্যাপারে। হোটেল হবে বা কিছু। বড় বাড়ি। হবেও বা। তো আপনার শ্রেয়া ম্যাডামের উপর ভার বর্তালো সেই বাড়ির হাল হকিকত জেনে আসতে। মহিলা চাবি আনতে গেলেন রাজারহাট। সে’খানে আমরা কথা বলেছি। সে হল মঙ্গলবারের ব্যাপার। বুধবার শ্রেয়া সাহা চাবি নিয়ে বেকবাগানের বাড়িতে গিয়ে কী দেখলেন?”

কৈলাস বলল, “আমি কী করে জানব?”

ময়দান বললেন, “ঠিক। আপনার কপাল মন্দ। আপনি শ্রেয়া সাহার মুখ যথাসময় বন্ধ করে দিয়েছিলেন, কিন্তু শ্রেয়ার যে ওই বাড়িতে যাবার কথা, ওইটেই তার মৃত্যুর আগে শেষ কাজ, তা আপনাদের বস ও জানতেন। স্বাভাবিকভাবেই। বেকবাগান থানাকে নিয়ে আমরা গেলুম সেখানে। কী দেখলাম জানেন?” কৈলাস ভাবলেশহীন মুখে বসে রইল।

“গিয়ে দেখি ঘরদোর সব চকচকে তকতকে, বাইরে থেকে যতই শ্যাওলার ডিপো মনে হোক না কেন। দিব্যি ঘরে ঘরে ফার্নিচার, সাফসুতরো মেঝে, কেবল এক দিকে ডাঁই করে রাখা মদের বোতল। এইখানে লাগল খটকা। ফাঁকা বাড়িতে পাতাখোরেরা ডেরা বাঁধে। আজীবন বাঁধছে। ফাঁকা বাড়ি তাঁদের হকের জায়গা। কিন্তু তারা এ’রকম পরিষ্কার করে সবকিছু রাখে, এ বদনাম তাদের কেউ কোনওদিন দিতে পারবে না। যাইহোক। পালবাবু লোকজনকে নিয়ে এলেন, কোটি কোটি হাতের ছাপটাপ উদ্ধার করলেন। দিয়ে বেরোতে যাবো, দেখি এক ধোপদুরস্ত ভদ্রলোক শিস দিতে দিতে গেট দিয়ে ঢুকেই আমাদের গাড়ি দেখে চমকে পৃষ্ঠাপ্রদর্শন”।

ঘন বলল, “পাতা দেখালো? পাতাখোরেরা ও’রকম পুলিশ দেখলে পাতা দেখিয়ে দেয়?” সবক’টা মাথা একসঙ্গে ঘনর দিকে ঘুরে গেল।

ময়দান বললেন, “কী বলছ উল্টোপাল্টা, ঘনশ্যাম। পালালো, পালালো। চম্পট দিলো”। ঘন বলল, “ওহ্‌, পৃষ্ঠপ্রদর্শন। বলতে থাকুন স্যার, দিব্যি লাগছে। থামবেন না। ঘনর কথায় কান দিতে নেই, বড় স্যার শেখাননি?”

ময়দান একখানা দশাসই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুরু করলেন, “পালিয়ে আর যাবে কোথায়। তো সেই বাবুটির কাছে জানা গেল এ বাড়িতে তিনি, এবং তাঁর মতো আরও অনেকে আসেন মধু খেতে। তো এই মৌচাকের খোঁজ পেলেন কী করে জানতে চাইতেই বউবাজারের আরেক স্বনামধন্য ব্যক্তির নাম পাওয়া গেল। তিনি রয়েছেন পাশের ঘরে। ডাকব?” কৈলাস দু’দিকে মাথা নাড়লেন। ময়দান বললেন, “ওনাকে বলবেন না, আমিও ওনাকে ভয় খাই। কী চেহারা। ও লোক মোষ বলি দিতে পারে এক কোপে। যাক্‌গে। একা সাহসে কুলোয় নি, ফুল ফোর্স নিয়ে তুলতে হল। একটু কাতুকুতু দিতে হল। তারপর গিয়ে বেরোলো যে দুই দালাল মিলে দিব্যি ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলেন। আপনি যোগাতেন চাক, উনি যোগাতেন মধু। যাই হোক, শ্রেয়া ম্যাডাম গিয়ে পড়লেন আপনাদের যজ্ঞের মধ্যে। উনি আপনার ইনভল্‌ভমেন্টের কথা জানতে পারেননি। উনি আপনাকেই ফোন করলেন। কল রেকর্ডস ছিল। সন্দেহ করিনি। আপনারা সহকর্মী। ফোন করাকরি হওয়াই স্বাভাবিক। কল রেকর্ডস পাওয়া সোজা। কথোপকথন পাওয়া সোজা নয়। টেক্সট পাওয়া কিন্তু অত কঠিন নয় কৈলাসবাবু। সে যতই আপনি ডিলিট করে দিন না কেন। সময় লাগে। কোর্ট অর্ডার লাগে। কিন্তু পাওয়া যায়। তাই না দত্তবাবু? ভুল বলছি?”

উকিল দত্ত কিছু বললেন না। “তো যাই হোক, আপনাকে বোধহয় শুরুতে ফোনে পাননি ভদ্রমহিলা, খানদুই মেসেজ করেছিলেন। বলেছিলেন পুলিশে খবর দেবেন। এ’দিকে আপনি বলেছিলেন পুলিশ জানলে কোম্পানি ফেঁসে যাবে। আপনি ওনাকে ফোনে বলেন বাড়ি চলে যেতে। কাউকে কিছু না বলতে। পরেরদিন, অর্থাৎ বেস্পতিবার, উনি আপনাকে অফিসে বলেন অ্যাটলিস্ট বসকে জানানো উচিৎ। ভালো কথা,  আপনাদের বস ভদ্রলোকের বাড়ি কোথায় কৈলাসবাবু?”

কৈলাস বলল, “হাওড়া ময়দান”। ময়দান একগাল হেসে বললেন, “হাওড়া ময়দান এর ট্রিপ অকালেই শেষ হল কলকাতা ময়দানে, কেমন? বাই দি ওয়ে, আপনাদের একটা স্যুইফট এর ড্রাইভার তারককেও আনা হয়েছে। কেউ একটি সুড়সুড়ি নিতে পারে না। ভস্‌ভস্‌ করে সব বলে দেয়। আপনি শ্রেয়া ম্যাডামকে আপনাদের স্যারের বাড়ি নিয়ে যাবার নাম করে টুক করে রেড রোডে… তারক রাজসাক্ষী দত্তবাবু, সাক্ষী কি সার্কামস্ট্যানশিয়াল? আইন কী বলে?”

রিজেন্ট পার্ক আর থাকতে না পেরে বললেন, “এত সবের মধ্যে শোভন এলো কোত্থেকে?”

ময়দান বললেন, “আমি জানিনা”।

নয়

**********

কেদার চাটুজ্জ্যে বললেন, “সমাপতন”।

ঘন সহ সবাই এবার তাঁর দিকে ঘুরে তাকালো। কেদার কৈলাসের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বৃহস্পতিবার আপনি ছুরিটা কোথা থেকে জোগাড় করেছিলেন কৈলাসবাবু?”

উকিল দত্ত বললেন, “উনি আর একটিও কথা বলবেন না। উনি খুন করেননি। কোনও ছুরিছোরার গল্প উনি জানেন না”।

দত্ত থামার পরেই সবার মাথা নিজে থেকেই ঘুরে গেল কেদারের দিক। কেদার বললেন, “ছেলেছোকরা যারা বাড়িতে লুকিয়ে সিগারেট খায়, কেউ পাড়ার দোকান থেকে সিগারেট কেনে না জানেন? বিবাহিত, অবিবাহিত কোনও মানুষ নিজের পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে কন্ডোম, কন্ট্রাসেপ্টিভ কেনে না। সে’রকম ই কোনও প্রিমেডিটেটেড খুনী নিজের অঞ্চল থেকে অস্ত্র কিনবে না। একবার টাইমলাইনটা ঝালিয়ে নেওয়া যাক?

মঙ্গলবার, চাবি উদ্ধার।

বুধবার, শ্রেয়ার বেকবাগান গমন, এবং চাকে ঢিল প্রক্ষেপণ। আপনাকে অবগতকরণ, এবং আপনার প্ল্যানকরণ। আপনি বুধবার সন্ধ্যেতে টুক করে নিউ মার্কেট চত্ত্বরের বিগ বাজারে গিয়ে একপিস ছুরি সংগ্রহ করলেন।

বৃহস্পতিবার আপনি যথাসময়ে কাজে গেলেন। শ্রেয়া ও গেলেন। আপনাদের বস মশাই গেলেন না। তিনি খুব একটা অফিসে আসেন না। শ্রেয়া আপনাকে গোটাদিন উত্যক্ত করতে লাগলেন, টেনশনে ছিলেন। আপনাদের সহকর্মীরা বলেছে। তারা দেখেছে আপনারা তারকের গাড়িতে বেরিয়েছেন অফিস শেষে। আপনি বোধহয় ওনাকে বলেছিলেন বসের কাছে গিয়ে সুরাহা খোঁজা উচিৎ। অতঃপর ময়দানের কাছাকাছি হত্যা। ডিটেল্‌স আমি আলোচনা করতে চাই না। সে’সব পার্থ বুঝবে। তারক কিছু কিছু বলেছে।

শুক্রবার শোভনকে গ্রেপ্তার। আজ ফের আরেকটা মঙ্গলবার। কৈলাসবাবু, হাতে গ্লাভ্‌স পরে কেউ সুপারমার্কেট যায়? আর কোন বুদ্ধিতে আপনি শোভনদের বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করছিলেন?”

এবার কৈলাস সত্যিই অবাক হল। বলল, “শোভন নামে কাউকে আমি চিনিই না। অমন কারুর বাড়ি আমি যাইনি”।

ভুরুটা যতখানি কুঁচকানো যায়, কুঁচকিয়ে কেদার চাটুজ্জ্যে কতকটা নিজের মনেই বললেন, “একটা সম্পূর্ণ আনরিলেটেড ঘটনা থেকে এই গোটা ব্যাপারটা সল্‌ভ হল?”

ঘন বলল, “সমাপতন”।

দশ

**********

শেষটা বলে দিই?

সুস্মিতা একটা কাঠের খুন্তি নেড়েচেড়ে দেখছিল। বলল, “এই একটা কেনা উচিৎ। স্টিলের খুন্তি নেড়ে নেড়ে ননস্টিকগুলোর যা দশা হয়!”

“বলব শেষটা, নাকি তুমি দেখবে?”

সুস্মিতা বলল, “না বাবা। আমার ভয় লাগে। যতরাজ্যের উল্টোপাল্টা সিনেমা দেখাও তুমি রাতবিরেতে”।

শোভন হেসে বলল, “হিচকক্‌ উল্টোপাল্টা? শুনবে কিনা বলো?”

সুস্মিতা বলল, “তোমাকে নিয়ে আর যদি বাজার করতে এসেছি! কাজের সময় বড় জ্বালাও। বলো শেষটা”।

শোভন সারসার ঝোলানো ছুরির একটা তুলে নিলো হাতে। নিয়ে বলল, “মেয়েটা স্নান করছিল বাথটাবে। শুয়ে নয়। দাঁড়িয়ে। শাওয়ারে। পর্দার ওপার থেকে একটা ছায়া দেখা গেল। ছায়ামূর্তি। সে মূর্তির হাতে এইরকম একটা উদ্যত ছুরি”। বলে সে ছুরিটা হাওয়ায় তুলল।

এক মহিলা তাঁর ছেলেকে নিয়ে কড়াই পরখ করছিলেন। ভয় পেয়ে তাকালেন। শোভন অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি ছুরিটা রেখে দিল জায়গায়। সুস্মিতা বলল, “যত্ত নাটক! দেখবে হিচকক্‌ আর কমেন্টারি করবে হেমেন কুমারের মতো”। কাঠের খুন্তি একজোড়া নিয়ে দু’জনে বাসনপত্তরের এলাকা ছেড়ে বিস্কুটের আলনার দিকে এগোলো। কড়াই না নিয়েই মহিলা সে জায়গা ছাড়লেন।

কেউই দেখল না, দস্তানা পরা একটা লোক শোভনের রেখে দেওয়া ছুরিটা তুলে নিল।