মাছরাঙাটা উড়ে এসে মূর্তির মাথায় বসল, আর পর্যটকের দল হাজির হল মূর্তির সামনে। মূর্তির দিকে পিঠ করে গাইড আবোল তাবোল বকতে আরম্ভ করল। মাছরাঙার সে’সব মুখস্থ হয়ে গিয়েছে এতদিনে। মূর্তিটা খুব সাধারণ। কোনও কেউকেটা কারুর নয়। নেতাজীর নয়, বিধান রায়ের, হীরক রাজারও নয়। সৌধর উপর টাঙানো আবক্ষ মূর্তি নয়, মাথার উপর ছাতা মেলা নেই। তবু এই মূর্তি দেখতে এ’দিক সে’দিক থেকে লোক জড়ো হয়। এর ছবি ঘোরে বাজারে, কাগজে ম্যাগাজিনে লেখা হয় একে নিয়ে। চারপাশের লোক কিছু আয় করে তাই থেকে। চায়ের দোকানটা, কচুরীর দোকানটা। গাইড কামরুল। রুবায়েৎ এর তলায় বসে  প্রেমপত্র বিক্রি করে। বাসিন্দারা নিজ নিজ বাড়ির হদিশ দিতে মূর্তির উল্লেখ করে। মোটকথা অবিস্মৃত হয়ে পড়ে থাকেনি মূর্তিটা। যার মূর্তি, তার “কেউ মনেই রাখবে না” ভয় কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাড়ার মধ্যমণি হয়ে আছে মূর্তিটা। “গল্পটা অন্য জায়গায়।” উৎসুক দর্শকদের নাটকীয় গলায় বলতে থাকে কামরুল। “কেউ জানেনা মূর্তিটা কার। কে-ই বা বানালো। কবেই বা বানালো। কেনই বা বানালো। হঠাৎ করে একদিন দেখা গেল, মূর্তিটা এখানে রয়েছে। খুব জাগ্রত মূর্তি কিন্তু।”

*********************

“বাবুউউউ”
ফটিক যেন এতক্ষণ কান পেতে ফোনের এপারের কথা শুনতেই পায়নি, যেন মা কে বলতে শোনেনি “হ্যাঁ হ্যাঁ। এ’বার জিজ্ঞেস করো আনন্দপল্লীর অটো কোথায় পাওয়া যায়। হ্যাঁ, একটু এগিয়েই। হ্যাঁ, তারপর অটোয় উঠে বলবে অরবিন্দ পার্ক নামব। বললেই নামিয়ে দেবে। ক্লাবের কাছে নামবে। নানা, ফটিক থাকবে তো ওখানে। হ্যাঁ, রাখি তালে?”।
“হ্যাঁ মা?” “মোড়ে গিয়ে দাঁড়া। বাসস্ট্যান্ড এ এসে গেছে।”

অবিশ্বাস্য দ্রুততায় চটি গলিয়ে মাটিতে পা না ফেলে গলি পেরিয়ে মোড়ে এসে দাঁড়াল ফটিক। শান্তাদের হাগুমুতুর দোকানের সামনে। বুড়ি নেই ভাগ্যিস। থাকলেই হাজারটা প্রশ্ন করত এক্ষুণি। ফটিক একটা কমোডের উপর ঢাকনা লাগিয়ে বসল। চারপাশে সিঙ্ক বেসিন পাইপ কমোড ভারতীয় হাগুপাত্র ছড়ানো। এত অগোছালো হার্ডওয়ার স্টোর ভূভারতে নেই। একপাশে একটা ইয়াব্বড় আয়না রাখা। ফটিক দেখল তাকে বেশ লম্বা দেখাচ্ছে তাতে। হাইট মাপা হয়নি দু’হপ্তা হল। এর মধ্যে কি আর একটুও বাড়েনি? এক ইঞ্চিও না? ফুলপ্যান্ট পরলে ভালো হত। একটু গোঁফ দেখা যাচ্ছে না? ফটিক আয়নাটার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর খেয়াল করল হাফশার্টের বোতাম গুলো ভুল ঘরে লাগিয়েছে। চট করে রাস্তার দিকে পিছন ফিরে বোতাম খুলে যে যার ঘরে ফেরত পাঠাল। রাস্তার দিকে ঘুরবার আগেই সে শুনতে পেলো একটা অটো বেরিয়ে গেল হুশ করে। এইরে। এই অটোয় ছিল না তো? হবার কথা নয়। কম করে চোদ্দ মিনিট লাগে বাসস্ট্যান্ড থেকে ক্লাব। আর কালীতলার ব্রিজে একবার ফাঁসলে তো হয়েই গেল। ফটিক এসেছে তিন মিনিট ও হয়নি।

ফটিক এলোমেলো পায়চারি করতে করতে রিকশাস্ট্যান্ডের পাশের বেঁটে পাঁচিলটায় উঠে বসল। দু’টোই রিকশা রয়েছে এখন। পল্টু আর জামাই। সব রিকশাওলাদের শরীর এক রকম হয়। রোগা। কিন্তু হাতে পায়ে গুলি। নতুন কেউ বাড়িতে এলে এ’টাই নিয়ম। তারা ৪১ব বাসস্ট্যান্ডে নামবে। তারপর ফুলের দোকানের ফোন থেকে লোকাল কল করবে বাড়িতে। বাবা, মা, যেই ধরবে, পরের রাস্তাটাটুকু বাতলে দেওয়া তার কাজ। আর ফটিক বিরসবদনে হাজির থাকবে ক্লাবের সামনে। আজকাল সেও ফোন ধরে। মুখস্থ করা বুলি আওড়ায়। কেউ কেউ তাকে বাবা বলে ভুল করে। বুঝতে পেরে বলে “একদম তোর বাবার মতো গলা হয়েছে তো তোর!” ফটিক খুশি হয়। আজকের ব্যাপারটা আলাদা। যারা আসছে, তাদের একজনকে ফটিকের খুব পছন্দ। খুব।

মায়ের রান্না শেষ হয়নি। ভালো কাপডিশ বেরিয়েছে। বসবার ঘরে, খাবার ঘরে একাধিক বার ঝাড়পোঁছ পড়েছে। জানালায় পর্দা উঠেছে নতুন। এ’সব হয়। ক’মিনিট হল? হাগুমুতুর দোকানের ঘড়ি খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে দুই মাস। খারাপ হয়নি বোধহয়। ওরা ব্যাটারি বদলায়নি। সাতটা বাইশ হয়ে রয়েছে। ফোন এসেছিল ন’টা ষোলোয়। “সকাল সকাল এসো কিন্তু” ব্যাপারটা এরা সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছে। ভালোই। কিন্তু এত সময় লাগছে কেন? লাইন পড়েছে অটোয়? রবিবার একটু কমই থাকে অটো। ফটিক পাঁচিলের উপর বসে ফটছট করে। একটা অটো আসছে। কালো হলুদ অটো। ফটিক নেমে এগিয়ে যায়। অটোটা একটু মন্থর হয়। থামে না। উঁহু। নেই ভিতরে। অল্প হতাশ হয় ফটিক। প্রত্যেকটা অটোর উপর তার আস্থা, বিশ্বাস, প্রত্যাশা তৈরী হয়। কোনওটা থামে, লোক তোলে। নয়ত অবাঞ্ছিত কাউকে নামায়। ওরা কি জয়শ্রীর অটোয় উঠে পড়ল?

“কেউ আসবে?” ফটিক সম্বিৎ ফিরে পায় পাঁচিলের উপর। ঝিঁঝিঁ ধরা পা নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। শান্তা বুড়ি বেরিয়েছে ভিতর থেকে। একটা লোক দু’টো কল কিনবে বলে কখন থেকে ঠায় দাঁড়িয়েছিল। মনে মনে তাকে সঙ্গী পাতিয়েছিল ফটিক। তারও অপেক্ষা শেষ হল। “ওই আর কী।” ব্যাজার হাসে ফটিক। গোটা পাড়া জানে তাদের এই আচারের কথা। পাঁচিলের উপর ফটিক মানেই ওদের বাড়ি কেউ আসবে। টাকা গুনে ড্রয়ারে রাখে বুড়ি। লোকটা সাইকেলে উঠে বাজারের থলিতে কল ভরে পাড়ি দেয়। শান্তা এগিয়ে আসে। “কে আসবে র‍্যা?” তাতে তোমার কী? রাতদিন কে আসবে কে এসেছিল কোত্থেকে এসেছিল বড্ড কৌতূহল। “আসবে একজন।” বলল ফটিক। মিথ্যে বলল। তিনজন আসছে। একজনই মূলবান।”অনেক দূর থেকে আসছে?” ফটিক খুব কষ্টে মুখ ভ্যাংচানো সামলে বলল, “অনেক দূর। কামচাটকা পেনিনসুলা।” “দূর মুখপোড়া। বল না। কে আসছে?” “আমার বউ।” বুড়ি বিড়বিড় করে গালমন্দ করতে করতে ভিতরে ঢুকে গেল। তাই দেখতে পেল না ফটিক হাল্কা লজ্জা পেয়েছে। জিভ কেটেছে। ইচ্ছে ষোল আনা। বয়েস ষোল হয়নি তো কী?

বেলা হয়ে যাচ্ছে। খিদে পাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে যে জেনে আসবে আর ফোন করেছিল কিনা ওরা, রাস্তা গুলিয়েছে কিনা, তারও উপায় নেই। তার মধ্যে যদি অটো এসে হাজির হয়? ফটিক একদৃষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তা বেয়ে তাকিয়ে থাকে। ওইদিকেই বাসস্ট্যান্ড। ওইদিকেই তিব্বত। ওই দিক থেকেই ওরা আসবে। ও আসবে। হাতে মিষ্টির প্যাকেট থাকবে। কমলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের। কেউ বাসে করে মিষ্টি নিয়ে আসে না নিজের পাড়া থেকে। বাসস্ট্যান্ড এ নেমে কমলা থেকে মিষ্টি কেনে। “আজ বোধহয় আর এলো না!” ফটিক মুখ ঘুরিয়ে হঠাৎ পাওয়া ভীষণ রাগে তেড়ে ওঠে। “আসবে না মানে? বাসস্ট্যান্ড থেকে ফোন করেছিল, আসবে না? তোমার জন্য কেউ আসবে না বলে…” বলেই রাগটা তেমনি হঠাৎ করে চলে যায়। শান্তা বুড়ি চুপ করে থাকে। সত্যিই তার কাছে কেউ আসে না। ফটিকদের বাড়ি কেউ এলে তবু ফটিক এসে পাঁচিলে বসে। বুড়ি দু’টো কথা বলে। ফটিক মাথা নামায়। বুড়ি আবার ভিতরে চলে গেছে। পল্টু, জামাই তিনবার করে ভাড়া কেটে এসে দেখেছে সে ঠায় বসে, উত্তরদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে। তাদের চোখে হাসি দেখতে পায় ফটিক। রাস্তা চলতি সবার মুখে হাসি দেখতে পায় ফটিক। সবাই মজা লুটছে। সবাই জানে যে কেউ আসবে না। ষড়যন্ত্র করে ফটিক কে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ফটিকের কান লাল হয়ে ওঠে।

রাস্তার আলোগুলো জ্বলেছে। পাপ্পু গুল্টু ডেকে ডেকে ফিরে গেছে। খেলতে যায়নি ফটিক। ও আসবে। “যখন আসবে আসবে, ওরা দেরী করছে ওদের ব্যাপার। তুই খেয়ে তো যা। খেয়ে নিয়ে আবার বেরোস’খন।” ফটিক খায়নি। পাড়াশুদ্ধু লোকের সামনে ভাতের থালা নিয়ে এসেছিল মা। তবুও খায়নি। কী একটা রোখ চেপে গেছে। এইখানে বসে থেকে থেকে সে ওদের নিয়ে আসবে। বিকেলের ফুচকাওলা সন্ধ্যে পেরিয়ে প্যাঁটরা গুছিয়ে উধাও। নাইটি ওড়না বৌদিদের দল ফিরে গেছে। দেড় হাজার অটো এপাশ ওপাশ করেছে এর মধ্যে। ফটিক পাঁচিল থেকে নামেনি।

 ************************************************************

“এ মূর্তি কীসের তৈরী?” ভিড় থেকে কেউ একটা গলা তোলে।”পাথরের। নিরেট পাথর। চুন সুড়কি ও মারে নি। এক পাথরে তৈরী। পাথর খুদে বের করা। কম পরিশ্রম? আর কী সুন্দর কাজ দেখুন? একদম জীবন্ত! চোখ দু’টো দেখুন!” অনেকগুলো চোখ একটা পাথরের পাঁচিলের উপর বসানো একটা বছর চোদ্দর ছেলের পাথর মূর্তির দৃষ্টি অনুসরণ করে।

খুব কাছেই একটা বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক মহিলা তার মুঠোফোন কানে ধরে বলেন “তোর ড্রাইভারকে বল মূর্তির কাছে নামিয়ে দিতে। আমি ইলতুকে পাঠাচ্ছি।”