সূর্য মাটির সমান্তরাল গেছে। সূর্য আসলে একটা টর্চ। বিভিন্ন কোণে তাক করা থাকে। এখন পূব দিকে মাটি ঘেঁষে তাক করা আছে। টর্চটা পশ্চিমে। পাঁচ সেলের টর্চ। তেজ কমে এসেছে। চার্জ দিতে হবে। চালক গম্ভীর মুখ করে উত্তরপানে চলেছে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে। রাস্তার দু’পাশে গাছের সারি। পাতা নেই। এমনি। ন্যাড়া। কাঁটা কাঁটা। ডান দিকের গাছে আলো পড়েছে। বাঁদিকের গাছগুলোর ছায়া রাস্তায় পড়ে ডপলারের নকশা তৈরী হয়েছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে জেব্রা ক্রসিং। আলো ছায়া আলো ছায়া। ঝিলমিল লাগছে চোখে। চালকের সে’সব উপভোগ করবার মতো অবস্থা নেই। তার তলপেটে জরুরী অবস্থা চলছে। সীট বেল্ট চেপে বসছে। রাস্তার পাশে ঝোপের আড়ালে যাওয়া যেত। নিজের দেশ হলে যেত। এখন পেট্রোল পাম্প লাগবে পেট খালি করতে। পাওয়া যাচ্ছে না। যাচ্ছে না। যাচ্ছে না। হু হা ছুটছে গাড়ি। চালকের মনে উদ্ভট খাপছাড়া চিন্তা আসছে। “গুপ্তচর ধরা পড়েছে? মুখ খুলছে না। কিল চড় থাবড়া ঘুঁষি অম্লানবদনে হজম করছে? জল খাওয়ান। গ্যালন গ্যালন জল। তারপর যেতে দেবেন না। হাত পা বেঁধে রাখুন। কানের কাছে সুসু হিসহিস আওয়াজ করুন। কল খুলে দিন, জলের শব্দ আসুক। উবু করে বসান, হাঁটু মুড়ে বুকের কাছে, চেয়ারের উপর। আর চেয়ারের তলায় থাকুক বিদ্যুৎবাহী পাত। হিসু করলেই চারশো চল্লিশ ভোল্ট। তারপর জিজ্ঞেস করুন। বল তোদের গুপ্তঘাঁটি কোথায়। দেখুন কত জলদি উত্তর আসে।” এক গ্যালন মানে পৌনে চার লিটার। অথচ কেন জানি গ্যালন শুনলেই পেট্রোল ট্যাঙ্কার ভেসে আসে মনে। ওই অত্তটা জল। চালক অনায়াসে একটা তেলের ট্যাঙ্কার পাশ কাটালো। মুখ গম্ভীর হচ্ছে। আসছে না। কতদূরে স্বর্গ? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোয়। চোখের সামনে রাস্তার উপরে জেব্রা ক্রসিং এর উপর সর্ষে ফুল, ছায়ামানুষ, সিলিয়া ফ্ল্যাজেলা, উঁট জিরাফ ভেসে ওঠে। উঁটের মুখটা আসতে আসতে একটা ডাকাতের মতো হয়ে যায়। ডাকাতিনী। মাথায় লাল ফেট্টি। শয্যাশায়ী চালকের পেটের উপর চেপে বসে আছে।

“ছেড়ে দিন হুজুর।”
“উঁহু। নোপ। কভি নেহি।”
“যা চাইবেন দিয়ে দেবো ধর্মাবতার।”
“যা চাইবো?”
“যা চাইবেন।”
“দাড়ি কাটবি না।”
“দশ মাসে রবীন্দ্রনাথ। মায়ের দিব্যি।”
“মায়ের দিব্যি দিবি না।”
“দেবো না। মায়ের দিব্যি।”
“মুড়ি মাখলে ঝুড়িটা নিজের কোলে রেখে দিবি না।”
“এক আঁজলা আমার, দুই আঁজলা আপনার। মায়ের দিব্যি।”
“আমার হাত। তোর থাবা। তোর এক আঁজলা, আমার চার।”
“ওয়ান ইজ টু ফোর। মায়ের দিব্যি।”
“চা করে খাওয়াবি প্রত্যেক বিকেলে।”
“দুধ এলাচ দিয়ে। মায়ের দিব্যি।”
“দুধ? তারপর তো বাড়িময়… অ্যাই, আমার সামনে কোনওরকম বায়ুত্যাগ চলবে না।”
“নিঃশ্বাস ও চেপে রাখব ধর্মাবতার। মায়ের দিব্যি”
“এক কানের গোড়ায়। মরার কথা বলবি না একদম।”
“সদা অমর রহে সর্দার। মায়ের-”
“ভালোবাসিস?”
“অ্যাঁ?”
“বাসিস? ভালো?”
“বাসি। প্রচ্চণ্ড।”
ডাকাত চোখ পাকিয়ে তাকায়।
“মায়ের দিব্যি। এবার ছাড়ুন স্যার, মানব বোমা হয়ে রয়েছি। সাক্ষাৎ বিস্ফোরণ। আপনিও ভিজে যাবেন যে।”
ডাকাত ওঠে না। নিজের শরীর সমান্তরাল করে দেয় চালকের সঙ্গে। চুল এলিয়ে পড়ে মুখে। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কী এক গুপ্তকথা বলে, ঠিক শোনা যায় না। সহসাই, অ্যামোনিয়া ছাপিয়ে জুনিপারের গন্ধ আসে নাকে।

ইন্টারস্টেট কুড়ির পাশে একপায়ে খাড়া বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। লাল হলুদ হৃদয় চিহ্ন। লাভ্‌স। পেট্রোল। ডিজেল। হট ডগ। কফি।
চালক অলিখিত আহ্বান পড়ে ফেলে। বাথরুম পাওয়া গেছে।