মুশকিল হচ্ছে এই, যে কাঠিগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাঠিগুলো বলতে দু’টো। একটা সদ্য কিনে আনা পেন্সিলের সমান লম্বা। কিন্তু পেন্সিলের থেকে সরু। ধাতুর। কী ধাতু, সে’টা পরিষ্কার নয়, পরীক্ষা করা হয়নি। কাঠি দু’টো ইলতুৎমিশ পেয়েছিল মরোক্কোর একটা বাজারে। তার আগে এগারো সপ্তাহ তার কেটেছিল জাহাজে। সমুদ্ররোগ তার ছিল না, দুলুনিতে দিব্যি ঘুম এসে যেত। গায়ের চামড়া নোনা হয়ে যেত কেবল। কিন্তু ডাঙায় নামা ইস্তক তার ঘুম হচ্ছে না। শরীরে একটা দুলুনি রয়ে গেছে। গা গুলিয়ে উঠছে। করাচি থেকে জাহাজে উঠেছিল ইলতুৎ। সে জাহাজ খানিক আরব সাগরে ভেসে আডেন উপসাগর হয়ে লোহিত সাগরে এই বন্দর ওই বন্দর থামতে থামতে সুয়েজ খাল দিয়ে গলে ডুকে এসেছিল ভূমধ্য সাগরে। রাস্তার বেশিটাই আফ্রিকা আর ইউরোপকে দুই পাড়ে রেখে সরলরেখায় চলেছে জাহাজ। শেষ থেমেছিল জিব্রালটার এ। জিব্রালটার ভারি মজার জায়গা। প্রচুর পীচফল উঠেছিল জাহাজে। প্রথমটায় খেতে বেশ লাগত। তারপর মুখ মেরে গেছিল। জিব্রালটার প্রণালী দিয়ে অতলান্তিক মহাসাগরে হালার্পণ করেছিল ইলতুতের জাহাজ। মিশের এই প্রথম অতলান্তিক দর্শন। তারপর মরোক্কোর পাড় ঘেঁষে এসে থেমেছিল ক্যাসাব্লাঙ্কায়। জাহাজ অন্য কোথাও চলে গেছে এর মধ্যে। নিদ্রাহীন ইলতুৎমিশ একটা ছোট্ট সরাইখানায় এপাশ ওপাশ করেছে। তারপর তিন দিনের দিন বেরিয়েছিল ঘুমের ওষুধ কিনতে। লোলচর্ম ফোক্লা দোকানিকে দেখে ফ্রেঞ্চ মনে হয়নি মিশের। অথচ ফ্রেঞ্চেই “একটু দাঁড়াও।” বলে পর্দা তুলে ভিতরে চলে গিয়েছিল লোকটা। বেরিয়ে এসেছিল কাঠিজোড়া নিয়ে। তারপর সে’দুটো তার হাতে গুঁজে দিয়ে মাথা নেড়ে অর্থ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কাঠি দিয়ে ঘুমের সুরাহা কীভাবে হবে সে’টা ইলতুৎ বুঝতে পারেনি। কোথায় গুঁজলে ঘুম হবে – এ’টা অনুবাদ করার মতোও ভালো ফ্রেঞ্চ সে জানেনা। হাঁ করে তাকিয়ে থেকেছিল, তারপর কিছু টাকা দিতে গিয়েছিল লোকটাকে। কাঠি দু’টো দেখতে ভালো। কারুকাজ করা। একটা সোনালী। একটা রুপোলী। কিন্তু সোনা রুপো নয় নিশ্চয়ই। দোকানি মাথা নেড়েছিল। মিশ ভেবেছিল মরোক্কোয় নিশ্চয়ই অন্য মুদ্রা চলে, এই উপভারতীয় মুদ্রা তার কাছে কানা। সে বদলে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু দোকানি শোনেনি। তার দিকে ঝুঁকে পড়ে কানে কানে ফিসফিস করে চারটে শব্দ বলেছিল। বাংলায়। ইলতুৎমিশ ভারতবর্ষ দেখেছে। সিকান্দর আর সেলুকাসের বিচিত্র ভারতবর্ষ। কিন্তু এতো অবাক সে কখনও হয়নি। চুপচাপ কাঠি নিয়ে ফিরে এসেছিল। রাত্রে সরাইখানার একতলার খাবার দোকানে রুটি মাংস খেয়ে নিজের ঘরে উঠে এসেছিল। দোকানদার কী করতে হবে বলে দেয়নি কাঠিগুলো নিয়ে। তবে মিশ বুঝে নিয়েছিল। সেই যে সে ঘুমিয়েছিল, পরের দিনের সকাল দুপুর পার করে সন্ধ্যেবেলায় চিন্তিত সরাইমালিক নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ডাকাডাকি করে, ঠেলাঠেলি করেও না জাগাতে পেরে তার খদ্দের টেঁসে গেছে ভেবে ভয়ের চোটে ডাক্তার ডাকতে পাঠাবে ভেবেছিল। হট্টগোলে লোক জমা হয়েছিল বিস্তর। মালিকের মেয়েও ছিল ভিড়ে। সে নাড়ি টিপে দেখেছিল দিব্যি বাহাত্তর দিচ্ছে মিনিটে। তারপর বুঝেছিল ব্যাপারটা। সবাইকে বের করে দিয়েছিল ঘর থেকে। বাবাকেও। খানিক বাদে চোর চোর মুখ করে মিশ আর হাসি হাসি মুখে সরাইকন্যা বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। মালিকের ভুরু সেই যে কুঁচকেছিল, মিশ মরোক্কো ছাড়ার আগে আর সোজা হয়নি। আজ কাঠি খুঁজতে গিয়ে মিশের মনে পড়ল, সেই মেয়েটির নাম জানা হয়নি। তাকে ঘুম থেকে তুলে মেয়েটা বলেছিল, “এ’রকম যথেচ্চাচার করবেন না কাঠিগুলো নিয়ে। এই কাঠি দিয়ে নিজেকে ঘুম পাড়ানো সহজ, ঘুম ভাঙানো অসম্ভব।” ইলতুৎকে স্বীকার করতে হয় এ কথা সে ভেবে দেখেনি। সত্যিই ঘুম ভাঙাতে অন্য কারুর প্রয়োজন।
তারপর থেকে কাঠি আর সে’রকম ব্যবহার করেনি ইলতুৎমিশ। একবার শুধু ইবনকে বিশ্বাস করানোর জন্য প্রয়োগ করতে হয়েছিল। ইবনকে শিখিয়ে দিয়েছিল মিশ। শোবার সময় সোনার কাঠিটা মাথার দিকে, আর রূপোরটা পায়ের দিকে রাখবি। ওঠাতে হলে জায়গা বদল। ব্যস। ইবন তবু বিশ্বাস করেনি। ভেবেছিল মিশ মটকা মেরে পড়ে আছে। এত তাড়াতাড়ি কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে নাকি? শোওয়া মাত্র? ইয়ার্কি হচ্ছে? কিন্তু সত্যিই ওঠাতে পারেনি ইবন মিশকে। তারপর কাঠি দু’টো নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল। “দরকার হলে আমি বের করে দেবো। আমার অনুপস্থিতিতে কক্ষনও এগুলো বের করবি না। ছুঁয়ে বল?” ইলতুৎ অনেক জায়গায় অনেক রকম ভাবে ছুঁয়ে আশ্বাস দিয়েছিল ইবন বতুতাকে। কিন্তু গল্প হচ্ছে সে কাঠিযুগল হাওয়া, এ’দিকে তাদের আশু প্রয়োজন। ইলতুৎমিশের না ঘুমোলেই নয়। বতু চলে গেছে। অনির্দ্দিষ্টকালের জন্য। শীতের দেশে। ইলতুৎ মিশে আছে ঝরা পাতার সঙ্গে, সুয়াশার অন্তরীপে। পাতায় হলুদ লাগছে। রাস্তায়, আস্তাবলে শুকনো পাতা জমছে। হেমন্তকে থামানো যাচ্ছে না। কথা শুনছে না। মিশ চেঁচিয়ে বলেছে, হে মন্ত, ও ফিরুক, তারপর পীত হয়ো। কিন্তু ঋতু অবিচল। শিগগিরি কমলা হয়ে যাবে। তারপর লাল। তারপর শূন্য। সারি সারি গাছ ন্যাড়া হয়ে ঝিম মেরে থাকবে এই ছোট্ট শহরে। সুয়াশার অন্তরীপ। কে দিয়েছিল নাম? কে ডেকেছিল কেপ অফ গুড হোপ বলে? পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে পর্তুগীজ অভিযাত্রী বার্থোলোমিউ ডায়াস আফ্রিকার এক্কেবারে দক্ষিণের এই শহরের নাম দিয়েছিলেন কেপ অফ স্টর্মস। পরে ভারতবর্ষের সঙ্গে বাণিজ্য স্থাপন হবার পর ইউরোপীয় জাহাজগুলির অন্যতম ভরসার জায়গা হয়ে গেছিল এই বন্দর। পর্তুগীজ কুমীরগুলো এই পথেই কালিকটে যেত। বিশ্রাম নিত। রসদ নিত। তাদের রাজা দ্বিতীয় জন নাম বদলে এই নাম রাখেন। আর এখন সুয়েজ খাল হয়ে জাহাজ বাড়ন্ত। একটা ফিরতি জাহাজ দেখার আশায় বন্দরে বসে থাকে ইলতুৎমিশ ও তার শহর। তারা তো চাইবেই, এ শহরে তুমি নেমে এসো।
জেগে থাকা গুলো ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। মাছি ভনভনে দুপুর। কোথা কোথা থেকে ভিনদেশী আরশোলা জুটেছে। প্রায় পরিত্যক্ত বন্দরের এক কোণায় দাঁড়ালে বাঁ দিকে ভারত মহাসাগর দেখা যায়, অন্যদিকে অতলান্তিক। সেইখানেই একলা বসে থাকে মিশ। ঠিক একলা নয়, একটা হোঁৎকা সিন্ধুঘোটক। এই নিয়ে বিস্তর ঝগড়া হয়েছিল বতুতার সঙ্গে। সোজা হিসেব বলে সিন্ধু হল সী, ঘোটক হল ঘোড়া। বতুতার তাইই দাবী ছিল। সিন্ধুঘোটক হচ্ছে সী হর্স। এদিকে টোলে পড়েছে ইলতু, মুলোর মত দাঁতওলা হোঁদলকুতকুত ওয়ালরাসগুলোকে সিন্ধুঘোটক বলে। বলেই ভেবেছিল হিপো কে জলগণ্ডার বলে এগুলোকে জলহস্তী বলা উচিৎ। রীতিমতো দাঁতেও মিল আছে। কিন্তু অভিধান অটল। এর নাম মিশ রেখেছে কুমড়োপটাশ। কুমড়ো আর মিশ মেছো গন্ধওলা জলের কাছে বসে থাকে। অবশ্য কুমড়োর যে সে’টা অপছন্দ, তা নয়। মাছের মাথা আর কুমড়ো দিয়ে পুঁইশাক রেঁধেছিল ইবন। বালি বালি হয়ে ছিল। মিশ মাছের মাথা খায় না। পটাশকে দিয়ে দিয়েছিল। হামলে হুমলে কুমড়ো খেয়েছিল পটাশ। এখন তারও খিদে কমেছে। শুকিয়ে যাচ্ছে বেচারী।
বাড়ি চলে যেতে ইচ্ছে করে মিশের। ভারতবর্ষে। বাংলায়। দোকানি বাংলায় বলেছিল, জীয়ন কাঠি, মরণ কাঠি। কিন্তু জাহাজ অমিল। যাও বা পূবমুখো যেতে রাজী হয়, এত ভাড়া – মিশ কপর্দকশূন্য। জেগে থাকলে মাছি এসে বসে চোখে মুখে। শহরময় ম্যাকারেল মাছের গন্ধ। পীচফলের জন্য মনকেমন করে মিশের। তামাকের দাম বেড়েছে। দাম বেড়েছে মোমবাতির। শোবার ঘরের দেওয়ালে বড় করে ভাল্লাগছেনা লিখে রেখেছে মিশ। শহরটা পুরোনো হয়ে গেছে। অন্যকোথাও যেতে হবে এ’বার। অনেক হল। অনেক। যাবে। ও ফিরুক। নইলে ফিরে এসে খুঁজে পাবে না যে। কিন্তু কবে? দেওয়ালের ভাল্লাগছেনার জন্য একটা চৌকো ঘর এঁকে দেয় সে। মাকুন্দ ঘর তার। একটা রুবিকের ঘনক, একটা ফুলগাছের টব, একটা মই, একটা বিছানা, আর একটা ঘোড়া। ঘোড়াটার নাম মীরাবাঈ। মিশকালো। তারও তেজ কমতির দিকে।
শেষ বিকেলে গান শুনতে গেছিল ইলতুৎ। মশলাদারের দোকানে ফি শুক্কুরবার মজলিশ বসে। সে’খানে বসে একটা স্পেনীয় বুড়ো মশলা নিয়েই একটা গান শুনিয়ে গেল দিব্যি। সুরটা মাথা থেকে বেরোচ্ছে না মিশের। অদ্ভুত কথা গানটার। “Do you remember when you saw her last? I said, Her skin is cinnamon, her skin is cinnamon.” ইবনকে দারুচিনির মতো নয়, বরং খানিক লবঙ্গের মতো মনে হয় মিশের। শেষ কবে দেখেছে তাকে? হারিয়ে যাবার সময়ে পরনে কী ছিল? মিশ জানে না। সে ঘুম থেকে ওঠার আগেই পাখি ফুরুৎ। ইবন তামাক পাতায় আগুন দিয়ে তোম্বা হয়ে বসে ছিলো খানিকক্ষণ। দারুচিনি বুড়ো গেয়ে নেমে যাবার পর তিনটে আধ দামড়া লোক উঠেছিল গাইতে। মিশ অবাক হয়ে শুনেছে তারা বাজনা বাজিয়ে খবরের কাগজ থেকে আগডুম বাগডুম খবর পড়ছে সুর করে। পশ্চিমি ঝঞ্ঝার খবর। এদিকেই এগোচ্ছে। ভাল্লাগছেনা।
বতুতা দু’টো কাঁকড়া আর দু’টো প্রজাপতি রেখে গেছে। কাঁকড়াগুলো রেঁধে খাওয়া হয়ে গেছে। প্রজাপতিগুলোকে ধরা যাচ্ছে না। কঠিন বিষয়। ঘুমের আবাহন করতে হবে। অকালশয়ন। হেমন্তঘুম। কাঠিদু’টো টপাটপ শিয়রে আর পায়ের কাছে রেখে ক্ষীণজীবি মরণ। বতু এসে তুলে দেবে। কিন্তু কাঠি কই? কোথায় লুকিয়ে গেছে ইবন? মিশ আঙুল মটকায়। মট মট করে আওয়াজ হয়। হাই ওঠে। ঘুম আসে না। প্যান্ডোরার বাক্স খালি হতে থাকে। সুয়াশার অন্তরীপে একটা ছিপি আঁটা বোতল ভেসে আসে।