আমাদের বাড়িতে লাইব্রেরী ছিল না। আমরা লাইব্রেরীতে থাকতাম। ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি সিঁদুর দাড়ি কাটার ক্ষুর পাউডার আর বই। শোবার ঘরের দেওয়ালমারিতে ছবির অ্যালবাম, মুখ ঢাকা শো পিস, হলুদ বোতামের কৌটো, বই। পড়ার ঘরের আলমারি দু’টোর কথা ছেড়েই দিলাম। রুডিমেন্টারি ম্যাথমেটিক্সের পাশে আজকের যোধন। খয়েরি মলাট দেওয়া অ্যাডভান্সড ফিজিক্স আসলে ঘনাদা, কিন্তু সে অন্য গল্প। থরে থরে অনুষ্টুপ। এবং মুশায়েরা। খাবার ঘরের ছাদ-তাক ভর্তি শারদীয়া ও মাসিক কিশোর ভারতী। যেগুলো বাবার আমল থেকে জমছে। “মাস গেলে একটা করে হাতে পেতাম। তাও তোর ঠাকুর্দার মনমতো রেজাল্ট হলে। আর তুই হলি উই।” ছাদ দের ও ছাদ আছে, কবি বলে গেছেন। সেই ছাদের উপরের ঘরে পাখা নেই। থাকলে গলা কাটা যেত, সে ঘর এত ছোট। সে ঘরে কী আছে? বই। আমি আর বাবা বাৎসরিক পরিষ্কার করতে যেতুম। খালি গা লুঙ্গি একটা লোকের বাদামী শরীর ঘেমে চকচক করত। কিন্তু বই এর উপরে ঝুল জমতে দেওয়া চলে না।

অনেক, অনেএক ছোট থেকে দেখছি, বাবা লিখছে। এক দিস্তা ফুলস্কেপ কাগজ নিয়ে বসে লিখছে। কলমের পিছনে ঢাকনা গুঁজে লিখছে, তাতে নাকি চাপ কম দিতে হয়, হাতের লেখা সুন্দর হয়। কাঠের দেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে লিখছে। আমার তখন গরমের ছুটিতে হাতের লেখা প্র্যাক্টিস নিয়ে কালঘাম বেরোনোর জোগাড়, বাবাকেও অফিসে হলিডে হোমওয়র্ক দেয়? কী লিখছ বাবা? গল্প। তাই তো। কেউ গল্প না লিখলে আমার দিন রাতের খিদে মিটবেই বা কী করে, আর এত এত বই ভর্তি ই বা হবে কী করে। অতএব, আমায় ডাইরি দাও, হাম ভি লিখেগা। ওরেভাই সে অদ্ভুত লেখা। লাইটহাউসে আতঙ্ক। যেখানে যা পড়ছি, নাম বদলে স্থান বদলে সেই-ই আমার গদ্য। আর চার লাইনের পদ্য। পদ্য লেখা সোজা। তার মানে না থাকলেও হয়। গদ্য ভারী কঠিন। পিঠে ব্যথা করে।

বাবা তাই ব্যায়াম করে। কী অদ্ভুত, লোকটার লেখার নেশা দিব্যি শুষে নিলাম, শরীরচর্চাটা আত্মস্থ হয় ই না। মুখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নাও। হাহ করে ছাড়ো। অত সময় কথা না বলে একটা মানুষ কী করে থাকতে পারে? পারে, এখন বুঝি, যখন চার দিন টানা মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরোয় না, কিন্তু সে অন্য গল্প। এ গল্পে হুহা লোডশেডিং হয়। আর পড়ার ঘর-খাওয়ার ঘরের মাঝে দোরগোড়ায় একটা বাতি ঝুলে আসবে। জেনারেটর। সেই আলোর তলায় আমার এক পা ছোট পড়ার চৌকি, তার ছোট পায়ের তলায় কাগজ গুঁজে সমান করা। তার এক কোণে অঙ্ক কষার খাতা, অন্য কোণে ফুলস্কেপ কাগজ।

বাবার বই বেরোলে খুঁজি। এইটা আমি? এইটা আমি?
আমার লেখায় বাবা খোঁজে?