বৃষ্টির শব্দ একেক জায়গায় একেক রকম। ফটিকের বাড়ির সামনে সিমেন্টের রাস্তায় বেশ তেড়ে একটা আওয়াজ হয়। খালি পিঠে চড় মারার মতো। অগণিত পিঠে অগুনতি চড়। খানিকটা সে’রকম। তার সাথে মেশে পাশের গেঞ্জি কারখানার অ্যাসবেসটসের ছাদে বৃষ্টি পড়ার আওয়াজ। রাস্তার উলটো দিকে দাঁড় করানো ট্যাক্সিটার সারা গায়ে আছড়ে পড়া হাল্কা ধাতব একটা শব্দ। তারপর রাস্তায় জল জমতে শুরু করলে সেই সম্মিলিত শব্দরাশি একটু পাল্টাতে থাকে। বালতিতে কল খুলে রেখে আসলে বোঝা যায় না কতটা ভরল? আওয়াজটা ফাঁপা থেকে ভরাট, প্লাস্টিক ছোঁয়া থেকে জলের উপর জল, এইসব হতে থাকে। বোতলে ফুরুৎ করে বগবগ গুমগুম করে জল ভরে ওঠে। না দেখেই বোঝা যায় যে ভরে গেছে। বোতলে বালতিতে জল ভরার শব্দে এখনও এই বয়েসেও হিসি পায় ফটিকের। এই সব শব্দ খুব চেনা। তাই যখন মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে ফটিক টের পেলো বৃষ্টি পড়ছে, আর ঝড় ও উঠেছে দিব্যি, আর কারেন্ট গেছে, কিন্তু তাতে অসুবিধে হচ্ছে না একটুও, কারণ পর্দা ঠেলে ভেজা হাওয়া ঢুকছে মশারি ভেদ করে, আর ছাঁট ও আসছে অল্প, বিছানাটা আবার জানলার গায়েই, তখন সে মশারিটা খুলে পর্দাটাকে উড়তে দেবে আর হাওয়া-ছাঁট কে আহ্বান করবে, না জানালার পাল্লা ভেজিয়ে তোশক-বালিশের ভেজা আটকাবে, সে’টা স্থির করতে না পেরে উঠে বসল। বসে টের পেল, এ’টা তার চেনা পাড়ার বৃষ্টির শব্দ নয়।

ফটিক উঠে বসে চোখ কচলালো। চশমা না পরেই বিছানা থেকে নামল। মশারি খুলল। আবার খাটে উঠে গোটা মাঠ ডিঙিয়ে জানালার ধারে গিয়ে বসল। এ শব্দ জঙ্গলে বৃষ্টির শব্দ। হাজার হাজার পাতায় আঘাত করে তবে মাটি পাচ্ছে ফোঁটাগুলো। ঝড়ে পাতায় পাতায় চুলোচুলি করছে। পর্দা সরিয়ে বাইরে চোখ রাখল ফটিক। বাস্তবিক ই তাই। জানলাটা আনুমানিক দোতলায়। বাইরে নিয্যস জঙ্গল। হাত বাড়ালে প্রায় ছোঁয়া যাবে। ফটিক হাতড়ে চশমা খুঁজে বের করে চোখে দিল। আকাশটা আলো হয়ে আছে প্রায়। ঝাপসা হলেও দেখা যাচ্ছে। জঙ্গলের পেটের মধ্যে একটা হলুদ আলোও দেখা যাচ্ছে। সে’টার উৎস বুঝতে বেগ পেতে হল ফটিককে। তারপর দেখল একটা গাড়ি বেশ দিগন্ত আলো করে হেডলাইট জ্বালিয়ে বেরিয়ে গেল ওই আলোটার তলা দিয়ে। ও’টা তার মানে রাস্তার আলো। এই মর্মটুকু উদ্ধার করে ফটিক পড়ল ফাঁপরে। হিসেব অনুযায়ী তার ঘর একতলায়। বাইরে নিরেট একটা গেঞ্জি কারখানার ইঁটের দেওয়াল। এই দৃশ্যই গত অন্তত ষোল বছর সে দেখে এসেছে।

ফটিক একটা হাই তুলল। এই অস্তিত্ব সংকটের মধ্যেও হাই উঠছে দেখে অবাক হল খানিক। কিন্তু যাই বলো, হাওয়াটা বেড়ে। আর ফটিক শুনেছে। বৃষ্টির ছাঁট ঘামাচির জন্য মহৌষধ। ফটিক স্যান্ডো গেঞ্জির পিঠের ইউতে হাত বুলিয়ে নিল। এক মিনিট। ঘামাচিগুলো কই? এক মিনিট এক মিনিট। তার একগাল দাড়ি গজালো কখন? ফটিক তড়িঘড়ি বেড স্যুইচ টিপল। আলো জ্বলল না। বাহ্‌, এ পৃথিবী ও পৃথিবী দুয়েই লোডশেডিং। একটা “আর পারিনা বাপু তোমাদের ছিষ্টিছাড়া অলুক্ষুণে কাণ্ডকারখানা দেখে” বেশ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ষাট হাজার পাওয়ারের বিদ্যুৎ চমকানিতে ফটিক দেখল তার খাটে একজন শুয়ে আছে। আত্মারাম এতক্ষণ খাঁচার ভিতর পটঝট করছিল। বিদ্যুৎ পড়ার পরের বাজ পড়ল যেই, আত্মারাম ধীর স্থির ভাবে ঠোঁট দিয়ে খাঁচার দরজাটা খুলে “আমি চললাম” বলে উড়ে পালাল। ফটিক দেখল। বাধা দিলো না। হাল্কা একটা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। তার খাটের আগন্তুক অল্প মাথা তুলে বলল “ঘুমোসনি ইলতু? অনেক রাত হ’ল তো।”