তারপর একটা সময় গান থেমে যায়। জগৎজোড়া মৌনতার মধ্যে জেগে থাকে ইঞ্জিনের গোঙানি। জানালার শার্সি তোলা, তবু কোন ফাঁকে একটু বাতাস ঢোকে অনভ্যস্ত ফুঁয়ে বাজানো বাঁশির মতো শব্দ করে। হেডলাইটের আলোয় সামনে কতটুকুই বা দেখা যায়? যতটুকু, ততটুকু। অনেক সামনে আরও কারুর যাত্রা অব্যাহত। আচ্ছন্নের মতো তার ল্যাজার লাল আলো অনুসরণ। সে কোথায় চলেছে? বাড়ি ফিরছে নিশ্চয়ই। আর আমরা? যদ্দুর, তদ্দুর। যতক্ষণ গান ছিলো, ছন্দ ছিলো। রাক্ষুসে ট্রাকগুলোকে আশ কাটিয়ে এগোনো ছিল। এখন ঢিমে তালে রাস্তা বাওয়া। এ রাস্তায় থেমে থাকা যায়না, জানো না? থেমে থাকলেই পিছিয়ে পড়তে হয়। বাতাসে আর্দ্রতা। কাঁচে বাষ্প জমে। জমুক। দেখার মতো আছে টা কী? একটা হলুদ সরলরেখা বই তো নয়। এপাশটা আমার। ও’পাশটা… রাত্রিবেলা কিচ্ছু পালটায় না। দু’পাশে গাছের সারি সরে সরে যায় না। একটা কালো ক্যানভাসে একটু ময়লা হলুদ রাস্তা। গাড়ি চললেও কী, না চললেও কী। এমন সময় পাশের রাজ্য থেকে একটা হাত এসে আমার কোলে পড়ে। আমার আঙুলের মধ্যে আঙুল গোঁজে। খাপে খাপ। তবে আমার বুড়ো আঙুলটা বাইরে থাকা চাই। দাবী। তার কনিষ্ঠ আর অনামিকার মধ্যে আমার কড়ে। তার মধ্যমা আর অনামিকার মধ্যে আমার অনামিকা। তার তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যে আমার মধ্যমা। আর বৃদ্ধ আর তর্জনীর মধ্যে আমার তর্জনী। একপাশে আমার বুড়ো, অন্য ওই পাশে ওর কড়ে। দশটা আঙুলে তালা। চাবি গেছে দামোদরে।

সামনের গাড়িটা একটু গতি কমিয়ে ডানদিকে ঘুরে রাস্তা ছেড়ে নেমে যায়। এবার? ককপিটের মৃদু নীল আলোয় তার মুখ দেখতে পাইনা ভালো। তবু পড়তে পারি। সেই সজনেখালির মোড় আয়নায় রেখে। এ রাস্তার আমরা একচ্ছত্র অধিপতি। দু’পাশের ক্ষেত থেকে অগণিত ছায়ামূর্তি উঠে আসে রাস্তায়। সেলাম ঠোকে। “স্বাগতম জাঁহাপনা। মুলুক চিনতে দিক্কত হয় নি তো?”  তা হয়নি। কিন্তু এখন রাস্তা দেখতে প্রবল দিক্কত হচ্ছে। ঘন কুয়াশা। “গুস্তাখি মাফ করুন হুজুর। এ রাস্তায় তো বড় একটা কেউ আসে না, প্রজারা ভিড় করে এসেছে তাই, দেখবে বলে। তক্‌লিফ হলে কবুল করুন সরকার, এরা দফা হয়ে যাবে।”

মাথা নাড়ি। কুয়াশা তফাৎ হয়ে রাস্তা স্পষ্ট হয়। এ কী! রাজপথ কই? সরু পাথুরে রাস্তা। দু’পাশে লাল ইঁটের দেওয়াল। খানাখন্দে ভরা। নাচতে নাচতে এগোই। কোনও এক উদয়সশঙ্কর সরণী। নাচিয়ে ছাড়ে। হলুদ নিশান হুঁশিয়ারি দেয়। সামনে রেললাইন। আপাদমস্তক চাদর মোড়া কালের চৌকিদার উদয় হয়। “গাড়ি এই অবধি সাহেব। বড়বাবুর আজ্ঞা। সামনে পয়দল।” দরজা বন্ধ করার শব্দে কেলেকুষ্টি কিছু পাখি ডানা ঝাপ্টায়। কোন অলপ্পেয়ে জ্বালাতে এলো অসময়। দাঁড়কাক? বাদুর? পায়ে পায়ে রেললাইন পেরোই। লাইনের দু’পাশে প্রাগৈতিহাসিক গুদাম। টিমটিমে গ্যাসবাতি। লাইনের ওপাশে একটুকরো চাতাল। বটগাছের বেদী। নাম-না-জানা দেবতার থান।

“এই কুয়াশার জন্ম কোথায় জানো?” বেদী থেকে দেবতা উঠে আসেন। উত্তর জানি। দেখতে পাচ্ছি।

“এ’টা কোন নদী?” প্রশ্ন করি।

“যে নদী চাও। গাঙুর। কোপাই। কঙ্গো। কাবেরী। মিসিসিপি।”

“ইরাবতী”, আমি বলি।

“বেশ।” দেবতা হাসলেন কিনা বোঝা যায় না।

“তোমরা কারা?”

“আমরা পথিক।”

“পথিক যদি, বোঁচকা কই?”

“আমার বোঁচকা ও, আর ওর বোঁচকা আমি।”

দেবতা এবার শব্দ করে হাসেন। মোমবাতি নিভিয়ে দিলে যেমন মোটা করে ধোঁয়া বেরোয়, সে’রকম ভকভক করে কুয়াশা বেরোচ্ছে নদী থেকে। তাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে দূরে ডানদিকে একটা সেতুর আলো। “ওই। আসছে।” দেবতার বাঁ হাতের তর্জনী বাঁদিকে উঁদিয়ে আছে। দক্ষিণে। কী আসছে? কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না। “দেখতে না পেলে কান পাতো!”

এই ইরাবতীয় বাতাসেরও আগে আমাদের জন্ম, বতুতা। এই সেজবাতির থেকে কিঞ্চিৎ উজ্জ্বল বেশি আমাদের উপস্থিতি। এই উপকূলে আমাদের রাজত্ব। ভেনিসীয় এক বণিকের সঙ্গে বাজি রেখে একটা জাহাজ জিতেছিলুম। And we sailed into the mystic. শুনতে পাচ্ছ, বতুতা? মাল্লাদের সমবেত নাদ। প্রায় গানের মতোই। হেঁইয়ো। দক্ষিণের সমুদ্রের জোলো নোনা বাতাস বয়ে আনছে শ্যাওলা জাহাজ। সে জাহাজের পেটের ভিতর থেকে গুরুগম্ভীর একটা ভোঁ বেরোয়। সেই ফগহর্ন বাজলে জানবে, এসে গিয়েছি। আমি, নবাবদের ক্রীতদাস, কারাকোরামের কবুতর, ইন্টারস্টেট পঁচাশির প্রেমিক। ইলতুৎমিশ।

রন্ধ্রে রন্ধ্রে জিপসি, রুমির ভাষা যার বুলি, পার্সী গালিচায় চেপে ইউফ্রেটিস আর আমু দরিয়ার সাত ঘাটে শরবৎ-সম জলপান করে ইরাবতীর পাড়ে এসে আমার আঙুলে তালা দিয়ে দাঁড়াল সেই ইবন বতুতা। মশালের আলোয় কালো পতাকায় খুলিচহ্ন উড়িয়ে আটটা মেলট্রেনের ইঞ্জিনের ভোঁ ছাপিয়ে বজ্রনাদ করে সহসা সামনে উপস্থিত হল একটা দস্যু জাহাজ।