আমার বারান্দাটা খুব লম্বা। সেই বারান্দার শেষে সিঁড়ি। সেই সিঁড়িতে আমি বসে থাকি মাঝেমধ্যে। গাড়ি গুনি। দীঘলদেহী দু’জন খাটো জামা পরে দৌড়চ্ছে। একটা সাইকেল হুট করে রাস্তায় নেমে পড়ল। কালো গাড়িটা ভিরমি খেয়ে ব্রেক কষল। ভিতরে ওদের মাথা ঠুকে গেল কি? খিস্তি করল? কে জানে। সিঁড়িতে দাঁড়ালে শহরের পশ্চিম মাথার জলের ট্যাঙ্কিটা দেখা যায়। তার মাথাটা এখন মেঘের মধ্যে ঢুকে আছে। আচ্ছা, মেঘ থেকে সরাসরি জল টেনে নেয় কি ট্যাঙ্কিটা? দেওয়ালটা ভিজে আছে। বৃষ্টি হয়েছে কিছু আগে। হেলান দিয়ে দাঁড়ালে শরীর টেনে নিচ্ছে জল। জোলো হাওয়া বইছে। দেশলাই জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সিঁড়ির নীচে দেশলাই এর স্তূপ। মিইয়ে গেছে। গোটা জগতটা মিইয়ে গেছে। দেশের দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার আর যৌনসমস্যা প্রতিরোধের বিজ্ঞাপন সাঁটা থাকত। বৃষ্টিতে ভিজে সেগুলো দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসত। গায়ের চামড়াটা ও’রকম মনে হচ্ছে। ঘষলে, চুলকালে উঠে আসবে। দু’হাতের তালু আড়াল করে দেশলাই জ্বালাচ্ছিলাম। একটা জ্বলল শেষ অবধি। ক্ষণিকের উত্তাপ। সিগারেটের মধ্যে মেঘ পোরা থাকে। সেই কবে একটা লোক ভেবেছিল মেঘের ব্যবসা করবে। মেঘগুলোকে ধরে ধরে কাগজের মধ্যে পাকাত। সত্যি! একদিকে আগুন জ্বালালে মেঘগুলো অন্যদিক দিয়ে পালায়। নইলে ঘুমোয় পড়ে পড়ে। পালায় যখন তখন হুশ করে টেনে নিলেই হল। আমার ভিতরটা মেঘমেঘ হয়ে আছে।

 

একজনের নামে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলুম ডাকে। সে’টা ফেরত এসছে। সাতহাত ঘুরে। ইবনটা ছাই কোথায় থাকে জানিও না। শেষ যে ঠিকানা জানতুম, তাইতে পাঠিয়েছিলাম। ফেরত এসেছে। আমার কোলের উপর বসে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুলে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ও চিঠি এখন আর আমার না। বারান্দার ভেজা মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। এই মেঘগুলোকে চিনি। মাসি চিনিয়েছে। কিউমুলাস। স্ট্র্যাটোকিউমুলাস। কিউমুলোনিম্বাস। তার মুলোর মতো দাঁত আর কুলোর মতো কান। ব্যাটা খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে হাসতে নেমে এলো আমার নাকের ডগায়।

 

“ঠাণ্ডা লাগবে।”

“তোর বাপের কী?”

“চটছ কেন?”

“বিরক্ত করিস না। যা উপরে যা।”

“কোলে ও’টা কী? দেখি!”

“ঝামেলা করিস না মেঘদূত। মেজাজ ভালো নেই। খিস্তিয়ে দেবো।”

“কতো বাকি রেখেছ খিস্তাতে!”

দু’জনেই খানিক চুপ। মেঘদূত বিপজ্জনক রকম কাছে নেমে এসেছে। মতলব ভালো নয়। “দাও। দিয়ে আসি।”

“ঠিকানা জানিনা।”

“জানো টা কী?”

“একটা বিচ্ছিরি ছেলের সাথে থাকে।”

“যারে দেখতে নারি, তার চলন ব্যাঁকা।”

“তোর বাপের চলন ব্যাঁকা।”

 

মেঘদূত খুব অভদ্র ভাবে হাসল একটু। চিঠিটা তুলে নিয়ে বলল, “দিয়ে আসব’খন।” তারপর উধাও হয়ে গেল। আকাশের ঠিক যেখানটায় জাতভাইদের সঙ্গে ভাটাচ্ছিল কিমুলোনিম্বাস মেঘদূত, সেখানটায় একটা ছিদ্র হল। হুড়মুড় করে এক বালতি সূর্যের আলো ঢুকে পড়ল সেখান দিয়ে। ওপারের নীলটা দেখা যাচ্ছে এখন। সেখানে একটা জেটপ্লেনের ছেড়ে যাওয়া সরলরেখা। আমি উঠে দাঁড়ালাম। একেকদিন একেক রকম সময় লাগে সারিসারি দরজা পেরিয়ে আমার দরজা অবধি যেতে। কোনও কোনও দিন নিজের দরজা পেরিয়ে এগিয়ে যাই, তারপর ফিরে আসি।

 

আজ আমার দরজাটা খুঁজেই পেলাম না।