একটা গান দিনের। একটা গান রাতের। সুর মিলেমিশে যায়। একটার সঞ্চারী অন্যটার আভোগীতে গুঁতো মারে। সুরটা স্থায়ীতে থেকে যায়।

দিনের গানটা দুর্গাপুরের। মায়ের ছোটবেলার বাড়ির, দাদুর কোয়ার্টারের। তিন ধাপ সিঁড়ি নেমে ছোট্ট একফালি রাস্তা। পেরোলেই তেপান্তরের মাঠ। যার শেষ দেখা যায় না। মায়ের স্মৃতির। আমার বিস্মৃতির। আমি বড় হলাম, আর মাঠটাও ছোট হয়ে গেল। মাঠের ওপাশের বাড়িগুলোর সামনে স্কুটার রাখা। তাও দেখতে পাই। কেমন করে? সেই মাঠের একধারে একটা শালবন। উঁই এর ঢিবি। গাছের গায়ে কাঠপিঁপড়ে। ম্যাটাডোর এ দাদু দিদার সম্বল তোলা হচ্ছে। কোয়ার্টারের মেয়াদ ফুরিয়েছে। মায়ের চোখে জল। মানির চোখে জল। দাদু কাঁদে না। দিদা আটকাচ্ছে। মশাই চুপ। বাবা চুপ। আমার মেজো হতে থাকা বড় রাজপুত্তুর মাঠের ঠিক মাঝখানে আমি শুয়ে আছি। আকাশটা এই মাঠের থেকেও বড়। কিন্তু ঠিক মাঠের মাপের আকাশটুকু আমার। আজ হাওয়া যেমন পাতায় পাতায় মর্মরিয়া বনকে কাঁদায়, তেমনি আমার বুকের মাঝে কাঁদিয়া কাঁদাও গো…

রাতের গানটা দীঘার। দুপুর বেলা আকণ্ঠ স্নান করেছি। দিদাকে করিয়েছি, এক পাশে মা, এক পাশে আমি। মুখে রোদ নিয়ে দাদু দাঁড়িয়ে দেখেছে। এখন আমরা শান বাঁধানো পাড়ে বসে রয়েছি। সমুদ্রের জল আকাশে উঠে যেতে চাইছে। পারছে না। তাই নিষ্ফল আক্রোশে আছড়ে পড়ছে আমাদের পাড়ের কাছে। দু’মিনিট অন্তর চশমা মুছতে হচ্ছে। গুঁড়ো গুঁড়ো বাষ্প আঁকড়ে রয়েছে কাচে। মনে হল চেঁচিয়ে বলি, “কী? কী? কীসের এত প্রগলভতা ভাই? চুপটি করে বসতে পারো না দু’মিনিট?” হুশ করে দুই নিমেষের জন্য ঢেউ বন্ধ। ঢেউ এর আওয়াজ কানে স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। এই দুই নিমেষের স্তব্ধতা বড় অস্বস্তি দেয়। কালা হয়ে গেলাম?

“নিমেষ মানে কতখানি সময় জানো? চোখের পাতা পড়তে যতটুকুন, ততটুকুন।”
“জ্ঞান দিয়ো না। একটা মোটকা পুকুর বই তো নও। এত অস্থির কেন?”

মেঘ সরে গিয়ে পৌনে-গোটা চাঁদ বেরিয়ে পড়ে। আবার ঢেউ এর হুটোপাটি শুরু হয়ে যায়।

জানবে না কেউ, কোন তুফানে, তরঙ্গদল নাচবে প্রাণে,
আমি চাঁদের মতো অলখটানে জোয়ারে ঢেউ তোলাবো…”