এসে গেছে। অন্ততঃ সে’রকমই মনে হচ্ছে। গত তিনদিন পর্দাটানা বৃষ্টি হয়েছে। ফটিককে তারইমধ্যে যাওয়া আসা করতে হয়েছে কাজে। একবার ভেবেছিল চশমায় ওয়াইপার লাগিয়ে নেবে। দশ মিনিটের রাস্তা হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে খালি পায়ে হেঁটেছে। বড় পিছল। জুতো পরলে সারাদিনে পায়ের তলায় শ্যাওলা পড়ে যাবে। চটি পরলে সে’টা আর পায়ে থাকবে না। হাওয়ায় তেজ ছিলো তার উপর, যাওয়ার সময় পিঠ ভিজে ন্যাতা। ফেরার সময় বুক নিঙরোলে বালতি ভরে যাবে। গতকাল রাতে বাড়ি ফিরে জল পায়ে এ’ঘর ও’ঘর করেছে। এখন কাঠের মেঝেতে শুকনো পায়ের ছাপ। মোটেও লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের মতো দেখতে নয়। মাথা মুছে তোয়ালেটা এক কোণে গুটলি পাকিয়ে ফেলে রেখেছিল। গন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সে’সবে আর কিছু যায় আসে না। কারণ এসে গেছে। আজ সকালে উঠে কোনও জাদুবাজিতে আকাশ একেবারে পরিষ্কার দেখতে পেয়েছে ফটিক। উদ্ভট আকাররের সাদা মেঘ। আর একটা খুব খুব চেনা শিরশিরানি। হাজার জ্যাকেটেও সে’টা কাটবেনা, ফটিক জানে। বাবার বাদামী শালটা জড়ালে একমাত্র কাজে দেবে। বাবার দু’টো শাল। একটা রোজের। একটা বেরোনোর। বাবা বেরোলে রোজেরটা গায়ে দিত ফটিক। তাতে বাবার গন্ধ থাকত। যেমন থাকত বালিশে। একটা নীল একানব্বই বছর পুরোনো বোতাম ছেঁড়া জামায়, যে’টা বাবা ফেলতে দেবে না, যে’টা পরে বাবা ঘুমোয়। সেই শালটা থাকলে ভালো হত। শরৎ ইজ হিয়ার। হাতিশালে হাতি নেই, ট্যাঁক্শালে কালো টাকা নেই, বাবা’শালে ফটিকে নেই।

ফটিক তাই কালো টি’শার্ট টা পরেই বেরোলো। অনেক ময়লা জামাকাপড় জমে আছে। কাচতে দিতে হবে। ঝুঁকে গন্ধমাদন তোয়ালেটাও তুলে নিল সে। লন্ড্রির ঘরটা গরম হয়ে থাকে। একটা হাঁ করা কাচার যন্ত্রে মেপে মেপে গুঁড়ো সাবান ঢালল। বস্তা ভর্তি জামা চোবালো। খুচরো রূপো ভরল যন্ত্রে। ওয়াশিং মেশিন গমগম করতে লাগল। ফটিক বেরিয়ে এসে শ্যাওলা সিঁড়িটায় বসে সিগারেট ধরালো। এই একটা জায়গা পেয়েছে ফটিক। নিজের জায়গা। তিনধাপ সিঁড়ি। উঠে কোথাও যাবার নেই। একটা দেওয়ালে শেষ হয়ে গেছে। তাই কেউ ব্যবহার করে না। ফটিক নিজের করে নিয়েছে। আরেকটা ব্যাপার হল, এখানে সকালে, বিকেলে কক্ষনো রোদ পড়ে না। কিছু না কিছুর ছায়ায় সবসময় লুকিয়ে আছে ফটিকে সিঁড়ি। এখানে বসলে রাস্তার ওপারে নিজের বাড়ি দেখা যায়। বাড়ির পিছনে রেললাইনের চকচকে সরলরেখা চোখে পড়ে। কখনও সখনও পিলে চমকিয়ে মালগাড়ি গুলো যায়। অবার্নপুরে লোকাল, এক্সপ্রেস চলে না। শুধু সাদার্ন প্যাসিফিকের পেল্লায় ষাট কামরার মালগাড়ি। ফটিককে কেউ ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে বলে রেলের পাড়ের বস্তিতে থাকি। ছায়ায় ঠাণ্ডা লাগছে। রীতিমত। সুড়সুড়ি। জামাগুলো কাচা হতে এখনও চল্লিশ মিনিট। ফটিক ভাবল, একটু হেঁটে আসবে।

রেলের মাঠে আর মাঠ নেই। কী একটা বানাচ্ছে ওরা। পাঞ্জাব লরি। কাঠ। মাটি। জিরাফের মত ক্রেন। ওপাশ দিয়ে যাওয়া আসার সময় ফটিক আর মাথা তুলে দেখত না। কানাঘুষোয় শুনেছিল পেট্রোল পাম্প হচ্ছে। সে তাও বেশ কিছুদিন আগে। সে মাঠ কেড়ে নিয়ে নিয়ে ওরা উদ্বাস্তু করে দিয়েছিল ফটিককে। ফটিক সিঁড়িতে এসে বসেছিল। কেউ সিঁড়িটাও না কেড়ে নেয় একদিন। ফটিক ভাবল তার দুই বিঘা জমির খতিয়ান নিয়ে আসবে। মাঠটার তিনপাশে রাস্তা ছিল। একপাশে রেললাইন। পশ্চিমকোণে একটা সাদা গীর্জা। তার চুড়োটা নীল। আকাশী। শরতের আকাশে সে চুড়ো ক্যামোফ্লাজ হয়ে যেত। এখন সে’টা মাঠের এ’পার থেকে দেখা যাবে কিনা সন্দেহ। ফটিক গুটিগুটি পায়ে রেললাইন পেরিয়ে মাঠের ধারে এসে দাঁড়াল। মাঠে যে’টা দাঁড়িয়ে এয়াছে সে’টা পেট্রোল পাম্প নয়।

ফটিক অবাক হয়ে এগিয়ে গেল। রেললাইনের ধার ঘেঁষে একটা বাড়ি। লাল ইঁটের বাড়ি। দোতলা। তার গায়ে হলুদ রঙের চৌকোতে কালো অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা আছে, অবার্নপোর ওয়েস্ট। তলায়, বাংলায়, অবার্নপুর পশ্চিম। বাড়িটার উত্তর দিকে, মাঠের উপর কয়েকটা রিকশা আর অটো দাঁড়িয়ে আছে। যদিও ওলাদের দেখতে পাচ্ছে না ফটিক। সে দ্রুত পায়ে কাঠের বেড়ার দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। কয়েকধাপ সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা বড় হলঘর মতো। তার বাঁ দিকের দেওয়ালে কয়েকটা খোপকাটা জানলা। জানলায় গরাদ। সে জানলাগুলোর উপর একটা পেল্লায় নোটিশবোর্ড ঝুলছে। ঘাড় উঁচু করে পড়তে আরম্ভ করল ফটিক। সারি সারি নাম, পাশে একটা করে নম্বর। ওপেলাইকা ৮/-, আটলান্টা ২২/-, বার্মিংহ্যাম ২৪/- … একেবারে শেষ নামটায় এসে থমকে গেল ফটিক। অবিশ্বাসে বাড়িটার দক্ষিণদিকের দরজাটা দিয়ে বেরোলো।

এদিকটায় একটা উঠোনমতো। ঢাকা উঠোন। উঠোনে কয়েকটা বেঞ্চি। একটা মস্ত ঘড়ি। উঠোনটা শেষ হয়েছে রেললাইনে। সেই উঠোনের এক প্রান্ত থেকে একটা লোককে হেঁটে আসতে দেখল ফটিক। কালো স্যুট। সাদা জামা। মচমচিয়ে হাঁটছে। “ক্যান আই হেল্প ইউ, স্যর?” ফটিক তাকিয়ে রইল। এই সাহেবটাকে সে কোথায় দেখেছে। মাইক অ্যান্ড এড’স এ বার্গার বিক্রি করে না লোকটা? এক মিনিট। না। টোব্যাকো স্টোর্সের সেই গল্পাড়ু লোকটা? যে সমানে ইঞ্জিনিয়াররা কত নাক উঁচু সে নিয়ে ভ্যানতাড়া করছিল? না না! এত চেনা! লোকটা আবার বলল, “আই অ্যাম স্যরি, ক্যান আই হেল্প ইউ উইথ সামথিং?” ফটিক মাথা নাড়ল। লোকটা হেসে বলল, “আর ইউ শ্যর? বাড়ি যাবে না, অন্তরীক্ষ?”

লোকটার মুখ আর ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না ফটিক। পশ্চিমের সূর্য্য লোকটার মাথার ঠিক পিছনে। সে সূর্য্যের আলো রেললাইনে পড়ে ঝকঝক করছে। আর সে রেললাইন দিয়ে এক পর্দা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একটা ট্রেন আসছে। লোকটা হাসছে। ফটিক দেখতে পাচ্ছে, একটা স্টিম ইঞ্জিন তেড়ে আসছে এদিকে। তার ল্যাজে আটকানো ওগুলো ওয়াগন নয়। কারণ ফটিক পশ্চিমি সূর্য্যতে সারি সারি জানালা দেখতে পাচ্ছে। ইঞ্জিনটা গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। তার কালো ধাতব গায়ে লেখা মার্টিন কোম্পানি। ফটিক চোখ বন্ধ করল। শত শত লাউডস্পীকারে একসঙ্গে ঘোষণা করতে লাগল কেউ।

“এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এক শূন্য এক শূন্য এক আট ডাউন বাড়ি এক্সপ্রেস। ইস্টবাউন্ড বাড়ি এক্সপ্রেস।” ফটিক কানে হাত দিলো। “ফটিক, বাড়ি যাবে না ফটিক? ফটিক, বাড়ি? ফটিক ট্রেন দিয়ে দিয়েছে। ফটিক, বাড়ি যাবে না?”

ফটিক দৌড়তে দৌড়তে বেরিয়ে গেল। ওয়েস্ট অবার্নপুর স্টেশন ছেড়ে, রেলের মাঠ ছেড়ে, শ্যাওলা সিঁড়ি ছেড়ে… লন্ড্রিতে জামা দেওয়া আছে।

ট্রেনটা কাল আসবে না আর?