মেট্রো থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমেই ফটিক বুঝল যে বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। যখন সে মেট্রোতে উঠেছিল, তখনও বাইরেটা শুকনো খটখটে। একটা মেঘও খেলতে আসেনি। এখন এই চারটে স্টেশনের উবু দশ কুড়ির মধ্যে বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। প্ল্যাটফর্মের মেঝে জুড়ে জলকাদার পাদুকা চিহ্ন। হাঁটু অবধি গোটানো প্যান্ট পরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে ভিড়। তাদের জুতোয় ছপাৎ ছপাৎ। ফটিক সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠল। এসক্যালেটর কাজ করছে না। যথারীতি। মেট্রোর গেটে তখন উদুম ভিড়। বাইরে সাদা পর্দার মতো বৃষ্টির আস্তরণ। লোকের কনুই বগল কাঁধ পেরিয়ে ভিড়ের মাঝামাঝি দাঁড়াল ফটিক। কারুর কালো বন্ধ ছাতা থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে। সামনের দিকের লোকজন ছাতা খুলে রেখেছে। সে বেগুনী ছাতার কোণা এসে কারুর চশমায় ঠোকরালো বোধহয়। “ছাতাটা সামলে, দিদি।” গেট টা দেওয়ালের মতো করে আটকে আছে কত মানুষ। কেউ স্রেফ দাঁড়াবে বলে ঢুকছে। ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে ফুটপাথে। কেউ “আহ সরুন না, চারটে চল্লিশেরটা বেরিয়ে গেল বোধহয়” বলে দেওয়াল ফুঁড়ে ঢুকে আসছে। ফটিক অল্প অল্প করে পিছলে পিছলে এগোচ্ছে। একটা খোলা ছাতার ঢাল বেয়ে জল পড়ছে পিছনের জনের মাথায়। “আহ, দাদা, ভিজবই যদি, বাইরে গিয়েই তো দাঁড়াতে পারতাম।” ছাতাটা সরে গেল। একটা গলা সেই আদ্যিকালের “আমি ছাতা না আনলেই বৃষ্টি হয়” মার্কা মন্তব্য করল। কেউ হাসল না। ফটিক ছাতা এনেছে। কিন্তু সেটা লাল ফুল ফুল ছাতা। নিজের নয়। চুরি করা। সামনে কোণায় তিনটে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই বের করা চলবে না। ভিতরটা গুমোট। এতগুলো নিঃশ্বাস। এতরকমের গন্ধ। গুনগুন। মাঝে মাঝে এক দমকা আসছে বাইরে থেকে। ডিমভাজার গন্ধ নিয়ে আসছে। রোলের গন্ধ। রোলের দোকানদের বিজ্ঞাপন দিতে হয়না।

আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হওয়া শুরু করল। কাঁহাতক আর জল কমবার আশায় দাঁড়িয়ে থাকা যায়? কাজকম্ম তো আছে, নাকি? একটা একটা করে মানুষ পকেট থেকে ফোন বের করে ব্যাগে পুরছে, আর পর্দার ওপারে মিলিয়ে যাচ্ছে। মেয়েগুলো যাচ্ছে না। যাচ্ছেতাই। ফটিক ও যেতে পারছে না। শুধু এগোতে এগোতে সামনের সারিতে এসে পৌঁছেছে। তার ডানপাশে একটা কেঠো চেয়ারে একটা মেঠো পুলিশ বসে আছে। তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কোথাও যাবার নেই। ফটিকের হঠাৎ খুব হিংসে হল। এমন বসে থাকা আর মানুষ দেখার চাকরি যদি সে পেত। বৃষ্টি ধরছে অল্প। দি রেইন ইজ হোল্ডিং। সে বেবী পিসীকে ইংরেজি শেখাত যখন অনেক ছোট ছিল। আর ইতিহাস। আলেকজান্ডারের বাবার নাম ফিলিপ। যে ফিলিপ টিউবলাইট বানায়। আপাতত স্টেশনের টিউবলাইটের উষ্ণতায় কয়েকটা পোকা ভনভন করছে। আর স্টেশনের শুষ্কতায় কয়েকটা মানুষ। লাল টুনি বাল্বের ঘড়িতে চারটে বাহান্ন।

ফটিক এদিক ওদিক তাকিয়ে স্টেশনের ছাদ থেকে অল্প মাথা বার করল। উপর দিকে চাইল। চশমার জলের ফোঁটা ছাপিয়ে দেখতে পেল এক্সাইড বাড়িটার মাথায় মেঘদূত বসে আছে। তাকে দেখতে পেয়ে মেঘদূত নেমে এলো নীচে।

“বলুন স্যার।”

“কাজ হয়েছে?”

“হয়েছে আজ্ঞে। ভিজিয়ে দিইচি।”

“ছাতা আনেনি?”

“তা তো মনে হলনি। দৌড়ে ওষুধের দোকানের সিঁড়িতে সেঁধোল দেকলুম।”

“সেঁধোলেন। তুমি করছ কাকে?”

“আজ্ঞে ভুল হয়ে গেচে স্যার। দেকলুম ব্যাগখানা বুকে চেপে দৌড়ে বিশালাক্ষী দেবী অন্নপূর্ণা ডেরাগ স্টোরে ঢুকলেন আজ্ঞে।”

“তাহলে ভিজল কোথায়?”

“আজ্ঞে কার্নিশ তো তেমন চওড়া নয়, সিঁড়িতে লোকও ছিল। ছাঁট তো লাগবেই!”

“ধুর! আমি বল্লাম ঝুপ্পুস ভেজাতে! একটা কাজ যদি হয় তোমার দ্বারা! অকম্মা মেঘদূত!”

মেঘদূত কাঁচুমাচু মুখ করে বিদায় নিল। বৃষ্টিও থামল। ফটিক চুরি করা ঘেঁটুর ছাতা ব্যাগে নিয়ে কুমীর তোর জলকে নেমেছি বলে স্টেশন থেকে বেরোল।

Advertisements