অনেক ঝামেলা। অনেক। অটো করে আসতে পারবে, কিন্তু ঠিক বাড়ির গলির সামনে নামতে পারবে না। কেন? না, সব অটোওলা ওর মা কে চেনে। তারা পনেরো ষোল বছর ধরে কালীবাড়ি টু আনন্দপল্লী অটো চালাচ্ছে, মা নিত্যযাত্রী। বেশ। নামল না হয় অগ্রণীতে। এমনিতেই দুপুররোদে পা চলে না, না হয় সে’টুকুও হেঁটে দিলো। কিন্তু ঠিক গলি দিয়ে ঢোকা যাবে না। সামনের গলিতে মোটে চারটে বাড়ি। গলির মুখে কালা শান্তা তাদের বাড়ি লাগোয়া হাগুমুতুর স্টোর্সের সামনে ডাঁই করা কোমড আর জলের ট্যাঙ্কি আর পাইপের মধ্যে জেগে ঘুমোয়। সেই হার্ডওয়ারের হার্ডল টপকালে ওদের বাড়ি, কিন্তু তার প্রায় মুখোমুখি অকর্মকাররা। মাইরি, আটটা মেয়েমানুষ ওদের বাড়িতে। ওরা নাকি পালা করে তাদের কেল্লার উপর থেকে নজরদারী চালায়। তাতে শান্তাদের বাড়ি থেকে বাহারি কলের স্যাম্পল চুরি হওয়া থেকে আটকায়না বটে, কিন্তু শোনা গেছে বর্মণদের বড় মেয়ের প্রেম ভেঙে যাবার জন্য ওরাই দায়ী। অতএব পিছনের গলি। এই গলিটা মোটামুটি নিরাপদ। একদিকে মসজিদের পাঁচিল, অন্যদিকে পুপুনদের বাড়ি। পুপুন ছেলেটা নিজে বখে গিয়ে এদের অনেক সুবিধে করে গেছে। পুপুনের মা বাড়িতে লোকজনের আনাগোনার হিসেব ছেড়ে দিয়েছেন। তাই ওদের গেট দিয়ে ঢুকলেও কেউ সন্দেহ করবে না। এছাড়া আর কোনও সেপায় সান্ত্রী নেই বটে, কিন্ত গলির পরিখায় কুমির, ইয়ে, কুকুর আছে।

কুকুর জিনিসটা বেশ ভয়ঙ্কর। ওর মতে কুকুর আসলে ভিন গ্রহের প্রাণী। লেজটা ওদের অ্যান্টেনা। ওর মধ্যে দিয়ে নির্দেশ আসে। যাইহোক, আজ কুকুরগুলো ছিলো না। কয়েকটা হতোদ্যম রিকশাওলা ছিল। তারা চোখ টেরিয়ে ওর মসজিদের গলিতে পদার্পণ করা দেখল। দেখুক। আর পারা যায়না। “আজ ভরদুপুরে আমার অভিসার।” মাইরি। পুপুন দের গেটে আওয়াজ হল অল্প। দম বন্ধ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর কোনও নড়াচড়া টের না পেয়ে সিঁড়ির দরজার পাশ দিয়ে নর্দমার পাশের একফালি রাস্তা দিয়ে পুপুনদের বাড়ির পিছনে এলো। তারপর চটি হাতে নিয়ে ওড়না টা কোমরে বেঁধে পাঁচিল এ উঠল। উফ! সালোয়ার কামিজ পরে পাঁচিল টপকানো যায়? ঘষা খেয়ে নুনছাল উঠে গেল পায়ে। লুকিয়ে প্রেম করতে যে শুধু ছেলেরাই আসে, তার একটা যথাযথ কারণ আছে। প্রেমিকও জুটেছে তার কপালে, সত্যি! একটা চারশো টাকার টিউশনি করবে, আর তার পয়সার শ্রাদ্ধ করে চিলি পর্ক গিলবে। বাবুর শুধু রোল কাটলেটে মন ওঠে না। আর তারপর তাকেই পাঁচিল ডিঙিয়ে প্রেম করতে আসতে হবে। ঘেঁটু কোনওরকমে কারিপাতার গাছের ডাল মটকে দুর্গে প্রবেশ করল। করেই টের পেল, ছড়িয়েছে।

সর্বশেষ চ্যালেঞ্জটার কথা ঘেঁটু ভুলেই গেছিল। এবাড়ির দোতলায় একটা দোর্দণ্ডপ্রতাপ বুড়ি থাকে। তার সাতটা চোখ। সবক’টাতেই ছানি, কিন্তু চোখ সাতটা। তার একটায় বোধহয় মোশন সেন্সর ছিলো, উপরের জানালা থেকে হাঁক এলো, “কে রে নীচে?” ঘেঁটুর হৃদপিণ্ডটা খুলে হাতে চলে এলো। একতলার খিড়কির দরজাটা টুক করে একটু ফাঁক হল। “কে? কে? নীচে কে?” ঘেঁটু নিন্‌জার তৎপরতায় সেই ফাঁক দিয়ে সেঁধিয়ে গেল। ফটিক চলে এলো বাইরে। “আমি রে বাবা। আমি। উফ। এতো পুরকি কীসের তোমার, বুড়ি?” “অ্যাই আমায় বুড়ি বলবি না!” “সাত বুড়ির এক বুড়ি। অ্যামাজন থেকে চরকা অর্ডার করে দেবো, সাহাদের দোকান থেকে পঞ্চাশ সর্ষের তেল এনে ওতে দিও। সারাদিন খ্যানখ্যান।” পাপোষে পা মুছে মুখ চুন ফটিক ঘরে ঢুকল। ঘেমো মুখটা থেকে একগাছি চুল সরিয়ে বলল, “সরি রে। এইভাবে রোজ রোজ…”
ঘেঁটু একগাল হেসে বলল, “বিয়ের পরেও লুকিয়ে লুকিয়ে আসব, হ্যাঁ? আমার হেব্বি লাগে!”