পাখীক পাখ মীনক পানি।

জীবক জীবন হাম তুহু জানি॥

এত বুদ্ধি কার? কার এত ব্যথা? হ্রস্ব বলতে পারত? বলে তো। হ্রস্ব ই। হ্রস্ব উ। বলতে পারত হ্রস্ব গা। না, কোমল ই বলতে হল। কোমল। সে শুদ্ধ নয়, শুদ্ধর থেকে কোনও অংশে কম নয়। হ্রস্ব নয়। কোমল শুধু। নিষাদ অবধি উঠতে হল না। কোমল নিষাদ। কোমল গান্ধারে হারানোর ব্যথা, কোমল নিষাদে বিরহের। অপেক্ষার।

তানপুরার মত ঝিঁঝিঁ ডাকে। সা পা মিশে যায়। ষড়জ। বাকি ছয় সুরের জন্ম যার থেকে। সা। ধরে থাকে। অন্ধকারে অদৃশ্য বৃষ্টি পড়ে। ছাঁটের ছোঁয়া লাগে। রাস্তার পাশের ঢ্যাঙা বাতির দিকে তাকালে তার চলন টের পাওয়া যায়। কেমন তেরছা হয়ে পড়ে। হাওয়া দিলে গোল পাকিয়ে যায়। রাস্তার কোলের অগভীর নর্দমা তিরতিরে ঝোরার মত এগোয়। এক আধটা গাড়ি এক পুকুর জল ছপাৎ করে ছিটকে বেরিয়ে যায়। সে পুকুরে এক ছটাক তেল ভেসে থাকে। রাস্তা-বাতির আলোয় তেলে জলে রামধনু হয়। তিন তলায় ঠাকুর্দা ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে তেপায়ার উপর পা তুলে চোখ বুঁজে আধ শোয়া। দেখতে পাচ্ছি না, আমি দোতলায়। কিন্তু জানি। ঠাকুমার কাজ হয়ে গেছে গতকাল। আমি একটা শুকনো ন্যাকড়া দিয়ে ঠাকুর্দার গ্রামোফোনটা পরিষ্কার করে দিয়েছি সকালে। সেখানে একজন মুসলমান ভদ্রলোক রাধা কৃষ্ণের গান গাইছেন। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ উপরের সা তে আটকে থাকার পর একটা মাছরাঙার পুকুরের ঠিক জলের চাদরটা ছুঁয়ে যাবার মত সূক্ষ্মতায় কোমল নি তে ল্যান্ড করলেন। এই রাগটা আমার। একান্তই আমার। এ রাগের সমস্ত গান আমার। এ আমার দেশ। ভিজে রেলিঙে তাল রাখি। আজ আমায় কেউ কিছু বলবে না। না পড়লেও না। বিরহিণী চাহিয়া আছে আকাশে। বিরহ মানে আমি বুঝি। ঠাণ্ডা কাঁচে হাহ করে শ্বাস ছেড়ে বানানো এক বৃত্ত বাষ্প ছোট হতে হতে উবে যাওয়া কে বিরহ বলে। আমি জানি।

ডানহাতে ছাতা আর বাঁ হাতে প্রাণ নিয়ে সাইকেল চালানো কত কঠিন আমি জানি। দু’হাত ছেড়ে চালানো তার থেকে অনেক সোজা। নীচে সাইকেলের ঘন্টি বাজছে। উপরে রাবণহাতা। শুনলে সারেঙ্গী বলে ভুল হয়। এক রাজস্থানী বালিকা বলছে, তার নাগর ভারী এক বাউণ্ডুলে আপদ, এদিকে তার যে এত দুর্দশা, তার দিকে কোনও নজর আছে? ছত্রধারী সাইকেল আরোহী টিং টিং করতে করতে কুনো ছাতা নিয়ে কোন চুলোয় যাচ্ছে, কে জানে। কার সাথে আলাপ করতে? উপরে আলাপ চলছে। আ-আ করে। রে থেকে গা হয়ে সা তে ফিরছে। আজু রজনী হাম ভাগে পোহায়লু, পেখলু পিয়া-মুখ-চন্দ। বিদ্যেপতি বলে গেছেন। সৌভাগ্যবান সে। আজু বিহি মোহে অনুকুল হোয়ল টুটল সবহু সন্দেহ। বটেই তো। কিন্তু এদিকে? ধূপকাঠিটা ছোট হতে হতে নিভে গেছে। গন্ধটা ভারী হয়ে আছে এখনও। কত গন্ধ। চন্দনবাটা। রজনীগন্ধা। কালো জিরে। ধুর ছাই। র‍্যান্ডম বিদ্যুতের মত অসংলগ্ন, তালকানা হয়ে যাচ্ছে চিন্তা গুলো। বারান্দাটা জলে ভেসে যাচ্ছে। যাক গে। ক’টা মেঘ কোনও রক ব্যান্ডের পোড় খাওয়া বেসিস্টের মত শব্দ করছে। বাবা হলে বলত মেঘনাদ হচ্ছে। শৌভিক হলে বলত ইন্দ্রজিৎ ছিল স্নাইপার। আমি ডান হাত দিয়ে দূরবীন বানিয়ে গোটা পাড়ার উপর নজর চালাই। সব শান্ত। শুধু তেতলার ঘরে কোনও এক বাঈ এর গলায় মীড়। হুটোপুটি করে তিনটে সিঁড়ি একেকবারে টপকে তিন তলায়। অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে ঠাকুর্দার ঘর।

বারান্দায় যাবার দরজাটা খোলা। পর্দাটা উড়তে উড়তে পালে হাওয়া না পেয়ে হঠাৎ করে নির্জীব হয়ে স্থির হয়ে যাচ্ছে। ঠাকুর্দা আমার অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, “এসো, দাদুভাই। তাক থেকে ডানদিকের সবার উপরের রেকর্ডটা নামিয়ে আনো তো?” উপরে কোনও ধূপকাঠি জ্বালানো হয়নি। তাই খাটটার পাশে এখনও ঠাকুমার গন্ধ। আমি নিশ্চিৎ করিমপুর গেলে এই গন্ধটা পাওয়া যাবে। এই গন্ধটা সেখানে তৈরী হয়। তুলসীপাতা, পানপাতা, জর্দা, সুরমা-আতর, বাতাসা, সন্ধ্যেবেলা, আজান, কীর্তন। আমার করিমপুর যাওয়া হয়নি। চিত্তরঞ্জন গেছি। ঠাকুর্দার গায়ে চিত্তরঞ্জন এর গন্ধ। কাছে গিয়ে দাঁড়ালে মনে হয় ভোঁস করে একটা পেল্লায় রেল ইঞ্জিন ছাড়বে। কোথাও একটা যাবার গন্ধ ঠাকুর্দার গায়ে। অভিযানের গন্ধ। গল্পের।

“কই? এনেছ?” এনেছি। হাতে করে দাঁড়িয়ে আছি।

“বোসো।” মোড়াটাইয় বসলাম।

“এ’টা শেষ হোক, তারপর।” ঠাকুর্দার মাথা এলানো। নদীয়া বৈরী বহে। আহারে। একটা লোক ছুটতে ছুটতে এসেছে নদীর পারে, মাঝরাত্রে। কী টান তার! ডাক এসেছে যে! ও’পারে যেতেই হবে। কিন্তু কী করে? সামনে মস্ত খরস্রোতা এক নদী যে! ঘাটে বসে ভিজতে ভিজতে শ্যাওলা জোনাকি ঝিঁঝিঁর মধ্যে টেনে টেনে ধরা গলায় গাইছে। মোরা সঁইয়া বুলায়ে আধি রাত কো। নদীয়া বৈরী বহে। জন্মের শত্রু, এই নদীটা। দু’চক্ষে দেখতে পারি না।

“বুড়ি কে মিস করছ?”

ঠাকুর্দা মাথাটা তুলে, চোখ দু’টো হাল্কা খুলে হাসল। “হুহ। বুড়ি আমার কে? গেছে বাঁচা গেছে। আপদ বিদেয় হয়েছে।”

একটা তেহাই দিয়ে ঠুমরীটা শেষ হল। আমি আলতো করে লং প্ল্যেইংটা বের করে, হাতের সিঙ্গলটা বসিয়ে দিলাম গ্রামোফোনের থালায়।

এই তোমারি পরশরাগে চিত্ত হল রঞ্জিত,

এই তোমারি মিলনসুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।

“এই গানটাও দেশ, জানো দাদুভাই? শুনলে বোঝা যায় না।”

তোমার মাঝে এমনি করে, নবীন করি লও যে মোরে…

গলায় কিছু আটকে আসে। এই জনমে ঘটালে মোর জন্মজন্মান্তর। এই জনমে। ভদ্রলোক কায়দা করে একটা কোমল গা গুঁজে দিয়েছেন। সে’টার থাকার কথা নয়।

কোমল গান্ধার। হারানোর ব্যথা।

Advertisements