“তোর কানে কত ময়লা! আমার হিংসে হয়!”

ফটিক তার সুদূরপ্রসারী কল্পনাতেও এ’রকম কোনও বাক্য কখনও গঠন হতে পারে, সে’টা ভাবেনি। কিন্তু সে স্পষ্ট শুনেছে। নিজের কানে শুনেছে। ময়লা ভর্তি হোক, ভুল সে শোনেনি। সে মনে মনে তার আত্মজীবনীর নাম ঠিক করে ফেলল। ‘তুলো-কাঠি অভিযান।” ধূধূ কুমীর ভর্তি মরূভূমি, হাঙরময় মেপল গাছের জঙ্গল, দুর্লঙ্ঘ্য তিন তলা লিফ্‌ট-নেই-ছাই-সিঁড়ি-ভাঙো-এখন চিরতুষার এর পাহাড় পেরিয়ে পাড়ারমোড়পুরের ওষুধেরদোকান-কেল্লা থেকে কান খোঁচানোর তুলো-কাঠি খুঁজে আনতে চলেছে রাজপুত্তুর। তুলো কাঠিই তার জিয়নকাটি মরণকাটি, ঘুমন্ত রাজকুমারী ঘেঁটুর কানে ছোঁয়ালে তবেই সে প্রাণ ফিরে পাবে। নইলে তার নিজের কানের পোকা খোয়া যাবে। সেই পরম দুঃসাহসী রাজপুত্রের জীবনকাহিনী, তুলো-কাঠি অভিযান! আপাতত বিশ্বজয় করে ফিরেছে সে, পুরষ্কার-স্বরূপ ঘেঁটু দেবীর কোলে মাথা দিয়ে শুতে পেয়েছে। পরমানন্দে কান খোঁচাচ্ছেন ঘেঁটু, তার মুখ অবশ্য ফটিকের দেখবার উপায় নেই, অন্তত কোলে শুয়ে না। কিন্তু দেবী তার কান দেখতে পেয়েছেন। এবং আক্ষেপ করে বলেছেন, “আমার হিংসে হয়। আমার কান থেকে কিচ্ছু বেরোয় না!”

 

ফটিকের ভয় হয়, স্বপ্নটা ভেঙে যাবে এক্ষুণি। কাঁঠালের আঠা দিয়ে সে জোড়াতাপ্পি লাগিয়ে রাখার চেষ্টা করে। মনে মনে নরওয়েজিয়ান উপকথার সেই বেড়ালটাকে খোঁজে, যে গোটা পৃথিবীটাকে আঁকড়ে এক জায়গায় রেখেছে। একটা পাথুড়ে খিলানের তলায় ঘাসের উপর তার স্বপ্ন বিচরণ করে। ঘেঁটু হঠাৎ তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। ফটিকের মাথা ঠুকে যায় কিছুতে। নরম কিছুতে। ব্যথা লাগে না। স্বাভাবিক, ফটিক ভাবে, ভালো স্বপ্নে ও’রম ব্যথা ট্যথা লাগেটাগে না। জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?” ঘেঁটু চারপাশে ভনভনরত কিছু পোকা দেখায়। অচেনা পোকা। “গায়ে বসেছিল। যেখানেই যাই, আমায় পোকা কামড়ায়।” স্বপ্নেও? পোকাগুলো ওদের চোখের উচ্চতায় খানিক পাক খেলো। তারপর দপ করে আগুন লেগে গেল পোকাগুলোর পাছায়।

“জোনাকি?!”

জোনাকি ই বটে। বেশ কয়েকটা। বাস্তবে শেষ কবে জোনাকি দেখেছে সে, ফটিকের মনে পড়ে না। মনে পড়ে না শেষ কবে জোনাকির থেকে আগুন ধার করে সিগারেট জ্বালিয়েছে ঘেঁটু। ঘেঁটুর সিগারেট থেকে ধূপকাঠির গন্ধ বেরোয়। ভুস করে এতখানি ধোঁয়া ছেড়ে ঘেঁটু বলে, “রিং হচ্ছে না। হাওয়া আছে।” ডাহা মিথ্যে। একটা গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। গুমোট। বৃষ্টি’পরের গুমোট। ঘাসে বসে পিছন ভিজে গেছে। ফটিক আঙুল বাড়ায়। একটা লম্বা টান দিয়ে সেই আঙুলের ফাঁকে সাদা সিগারেট গুঁজে দেয় ঘেঁটু। জোনাকির পিছন হলুদ। সিগারেটের পিছন লাল। লিপস্টিক। ঘেঁটু জিভ কাটে। তাই-ই ঠোঁটে গোঁজে ফটিক। ধূপের গন্ধ মিলিয়ে গিয়ে তামাকপোড়া গন্ধ নাকে ঠেকে। আজগুবি স্বপ্ন। ফটিক হাসে।

 

“হাসছিস কেন?” ঘেঁটু কান খোঁচাতে খোঁচাতে জিজ্ঞেস করে।

“কিছু না। স্বপ্ন দেখছি এখন তোকে।”

ঘেঁটুর চোখ বিষুবরেখা পাক খেয়ে আসে। “আদিখ্যেতা!”

“কিন্তু খুব সত্যি সত্যি লাগছে।”

তুলো-কাঠির আরামে ঘেঁটুর চোখ বুঁজে আসে। বাকি সিগারেটটা ঘেঁটুর হাতে ধরিয়ে দেয় ফটিক। চোখ বন্ধ করলে ঝিঁঝিঁ। চোখ খুললে জোনাকি। সব ঝিঁঝিঁই জোনাকি হবার স্বপ্ন দেখে।

 

“উঠতে হবে এবার। ব্যাগ গোছাতে হবে।”

 

এ’রকম তো হবার কথা ছিলো না। হুট করে ঘুম থেকে উঠে একটা গুম হয়ে বসে থাকার দিন হবার কথা ছিল। তারপর কোনওরকমে দিনটা পেরিয়ে আবার…

 

“ফিরে গিয়ে অনেক কাজ আছে। অনেক কাজ।”

ঘুম থেকে উঠবার জন্য ছটফট করে ফটিক। এই জায়গাটা পছন্দ হচ্ছে না তার। বড় বড় করে চোখ খোলে সে। নিঃশ্বাস আটকে রাখে। কাজের কাজ হয়না।

 

“আমি চলে গেলে তোকে আর পায় কে। বারান্দা থেকে হাফপ্যান্ট পরা মেয়েই দেখবি শুধু। চোখ গেলে দেবো।”

 

তারপর ধূপের গন্ধের স্বাদ নিজের মুখের মধ্যে টের পায় ফটিক। ঘুমিয়েই যদি থাকে, এখন ওঠা ঠিক হবে কিনা সেটা বোঝার চেষ্টা করে। থাক, আর পাঁচ মিনিট।

 

একটা লিপস্টিক লেগে থাকা সিগারেটের ছিবড়ে ঘিরে কয়েকটা জোনাকি পাক খেতে থাকে।