প্রদীপটা ঘষে কাজ না হওয়ায় উপুড় করে রিমোটে চাপড় মারার মত করে থাবড়াতে হল। একরাশ বিরক্তি মুখে জিনেন্দ্র বেরলো, পাজামার দড়ি আটকাতে আটকাতে। “তোমার মন কোথায় থাকে আলাদিনের পো?” বলে গালিমন্দ করতে যাবো, দেখি পিছন পিছন ব্যাটম্যান বেরুচ্ছে, আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে। ওরা দু’জন প্রদীপের ভিতর এই গরমে কী করছিলো জিজ্ঞেস করার সাহস হল না। ইলেক্ট্রিকের বিল দেবার ছিলো, আজ লাস্ট ডেট, হেবি লাইন হবে, জিনু কে পাঠালাম তাই। এই কড়া রোদ বাইরে, এক্ষুণি ঝমঝমিয়ে নামবে। ব্যাটম্যান দেখি মুখ মুছেই চলেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ” হল কী তোমার?” ব্যাটম্যান বলল “সর্দি লেগেছে।” বললাম, “বোসো, সেট্রিজিন নিয়ে আসছি।”

যা বোঝা গেল, তাতে ব্যাটম্যানকে শিবুদা অভিশাপ দিয়েছে। আগের শনিবার বিষ্ণুদার বিবাহবার্ষিকীতে পেটে বেশি পড়েছিলো বোধহয়, পার্বতীবৌদির আঁচলটা টেনে… তখনই শিবদাদা খচে গিয়ে বলল “তোর নিজের আঁচল নেই শালা?” সেই থেকেই ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে যাচ্ছে সে। শুকনো ডাঙায় আছাড়, নইলে সিজন চেঞ্জ নেই, কিছু নেই… যাক্‌গে, সহানুভূতি কিছু দেখানো উচিৎ। বললাম “আমারো হয়, এইত্তো সে’দিন উবের পুল এ সামনে বসেছিলাম, এমন এসি চালিয়েছে…” বেকার খেজুর। লোকটা সোফায় থম মেরে বসে আছে। জিনু ফিরলে বেরোবে বোধহয়। এইসব পরিস্থিতিগুলো আমার বেশ অস্বস্তিকর লাগে। কী কথা বলব? বাবা মায়ের খবর জিজ্ঞেস করতে পারব না, এমনিতেই নাকের জল, চোখেরটা যোগ না-ই করলাম। বউ ও নেই অভাগাটার। জিজ্ঞেস করলাম “জোকার এর খবর কী?” শব্দ করে কালো আঁচলে নাক ঝাড়লেন বাবু। “হাড়বজ্জাত। পয়সা আর বার খাইয়ে একটা কমলালেবু কে গথামতলার শেরিফ করেছে। কমলালেবুটাও সে’রকম। এক ফোঁটা ইয়ে নেই!” কথা ভুল দিকে মোড় নিচ্ছে। দেওয়ালেরও কান আছে। আর এ দেওয়াল অম্বুজা সিমেন্ট এর, পাড়া কে পাড়া, দেশ কে দেশ ভাগ করে দিয়েছে। কর্ণ সর্বস্ব। তড়িঘড়ি বললাম, “আর রবিন?” আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যাটম্যান বলল “সে খেলা ছেড়ে দিয়েছে অনেককাল। কোচিং টোচিং করে।”

আমি জিনুর জন্য অরেঞ্জ স্কোয়াশ বানাতে লাগলাম। বরফের ট্রে টায় জল ভরে ফ্রিজ অবধি নিয়ে যেতে পারি না। চল্‌কে যায়। বড্ড কঠিন। জিনুকে বললেই ও তুরন্ত ঠাণ্ডা স্কোয়াশ হাজির করবে। কিন্তু ওর জন্য স্কোয়াশ ওকে দিয়েই আনানোটা খারাপ দেখায়। জল আর স্কোয়াশের অনুপাতটা ঠিক হতে হবে। ব্যাটম্যান দেখি সানন্দা পড়ছে। “দই এর মধ্যেও ফ্যাট আছে?” আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে “আমি কী জানি?!” ভাব করলাম। লোকটা নিজের মনে বকে চলেছে। “এই জন্য আমার ত্বক এত রুক্ষ!” চিনি গোলার চামচ দিয়ে একটু স্কোয়াশ চাখলাম। এই সমস্যা। এ’বার জিনু ফিরতে ফিরতে আমারই পুরো খাওয়া হয়ে যাবে। মন শক্ত করে গ্লাসশুদ্ধু ফ্রিজে ঢুকিয়ে ব্যাটম্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। “এক কাপ চা করে দিই? আদা দিয়ে? সর্দি নাকে আর ঠাণ্ডা খেতে হবে না। চা দিই?” ব্যাটম্যান সানন্দা থেকে চোখ না তুলে মাথা নাড়ল। আমার সাধতে বয়ে গেছে।

কিন্তু এই কথাহীনতাটা কানে বাজে। বললাম “জিনু এই ফিরবে। তুমি খেয়ে যেও।” এটা একটা দারুণ উপায় শিখেছি। অবাঞ্ছিত অতিথি যদি সময় ভুলে যায়, তবে খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিলে তাদের হুঁশ ফেরে। তাতে সাপ ও পালালো, কার্বলিক অ্যাসিড ও খরচা হল না। ব্যাটম্যান চমকে উঠে ঘড়ি দেখে বলল, “নাহ্‌, আমায় বেরোতে হবে। কাজ আছে। ব্যাটমোবিলটা গ্যারেজে দেওয়া। কার্বুরেটর এ গড়বড়। আনতে হবে। বড় তেল খায় গাড়িটা, ফালতু মাইলেজ। একটা স্যুইফট ডিজায়ার কিনব ভাবছি।”
তারপর একটু থেমে বলল “এখন দাঁড়ালে অটো পাবো?”

Advertisements