গল্পগুলো কোথাও যায় না। শেষ হয় না। শুরু হয়, অনেকক’টাই, আশা জাগায়, কিন্তু শেষ হয় না। হারিয়ে যায়। গল্পটা শেষ হওয়ার আগেই যিনি শোনাচ্ছিলেন, “এবাবা আমার স্টেশন এসে গেছে–” বলে নেমে যান। বাকিটা কখনও শোনা হয় না। রোজ হয় এ’রকম।
 
——————————————————————————————–
 
“চাকরিটা ছেড়ে দেবে তাই বলে?” জামার ডান হাতার বোতামটা কিছুতেই আটকাচ্ছে না। ফুলহাতা জামার এই এক অসুবিধে। বাঁ হাতের বোতামটা চট করে আটকে যায়। কারণ ডান হাতের আঙুল সচল। আর বাঁ হাতের গুলো অকম্মার ঢেঁকি। তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে ফুটোটা স্থির রেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঢোকানো, এইটুকু তো কাজ। তবু কত সময় লেগে যায়। কাঠের টেবিলে রাখা কাঁচের গ্লাসটা তুলে দুই ঢোঁক দুধ খেয়ে নিলেন অমিয় হালদার। টেবিলে গ্লাসের তলার মাপের দুধ-বৃত্ত।
 
“হ্যাঁ, বুঝলাম যে তোমার বাবা মারা গেছেন সদ্য। মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা সব বুঝি। কিন্তু তাই বলে ইস্তফা দিচ্ছ? আরে, বাবা মা কি কারো চিরকাল থাকে? আমার বাবা দেহ রাখেন আমি যখন সেভেনটিন। ছেড়ে দিয়েছিলাম সব? না তো? আর তাছাড়া –“
 
দুধ খান অমিয় হালদার। প্রসূন দেখছে। চা নয়। কফি নয়। মদ নয়। দুধ। গরম। ঠাণ্ডা। চিনি দেওয়া। দুধ। হাতার বোতাম আটকেছে। চেয়ারের কাঁধে ঝোলানো কোটটা ঘুরিয়ে নিজের স্কন্ধগত করলেন ভদ্রলোক। বেরোবেন এবার। গলায় হাত দিয়ে টাইটা ঠিক করে নিলেন। পেপারওয়েট চাপা প্রসূনের ইস্তফাপত্র।
 
” — তাছাড়া এখনই তো তোমার চাকরিটার দরকার। বাবার চিকিৎসার জন্য খরচাপাতি হয়েছে। ওনার পেনশন ও নেই নিশ্চই এখন। এখন চাকরি ছাড়লে অর্থনৈতিক দিকটার কথা ভাববে না? আর বুঝছ না? যত কাজের মধ্যে থাকবে, তত মন অন্য দিকে…”
 
“আপনার দুধ গোঁফ হয়েছে।” নির্বিকার ভাবে বলল প্রসূন।
 
—————————————————————————————
 
মেট্রোর দরজার কাঁচে গাল চেপ্টে দাঁড়িয়ে থাকি। গল্প তখন দুই হাঁটুর ফাঁকে ব্রিফকেস চেপে মানিব্যাগ খুলে স্মার্টকার্ড খুঁজছে। প্ল্যাটফর্মের চাপা হলুদ আলো পেরিয়ে অন্ধকারের বিস্ফোরণ। মেট্রোর সুড়ঙ্গগুলো কেমন কল্পবিজ্ঞানের ওয়ার্মহোলের মত লাগে। সাঁইসাঁই করে টিউবলাইট গুলো পেরিয়ে যাচ্ছে। ধাঁ করে শনির বলয়। হুশ করে আলফা সেন্টাউরি। একটা ধূমকেতুর সঙ্গে ধাক্কা লাগো লাগো। টুক করে কালীঘাট। প্ল্যাটফর্ম ডান দিকে।
 
 —————————————————————————————-
 
সামন্তবাবু কাঁধ থেকে ব্যাগটা খুলে ডেস্কের উপর রাখতে গিয়েও রাখলেন না। ডেস্কময় চকের গুঁড়ো। ঝাড়ুর ন্যাকড়াটা কই? রুমালে নাক চেপে গুঁড়ো হটিয়ে জামার হাতা গুটিয়ে চেয়ারে বসলেন সামন্তবাবু। সামনে চামড়ার কাঁধ-ব্যাগটা।  চশমার খাপটা বের করে ছোট্ট মখমলি রুমালটায় মুছে নিলেন চশমাটা। ঘন্টা পড়ল। এদেশের কারুর সময়জ্ঞান নেই। এই জন্য বাঙালিদের কিছু হল না।
 
মিনিট পাঁচেকের মাথায় ভুরু কোঁচকালেন অরিন্দম সামন্ত। তিরিশ জনের একজনও সময়ে আসবে না? মগের মুলুক নাকি? অন্যদিন জনা চব্বিশ এতক্ষণে হাত তুলে ইয়েস স্যার প্রেজেন্ট স্যার বলা শুরু করে দিয়েছে। দু’একজন মুখ বাড়িয়ে কাঁচুমাচু হয়ে এসে ঢুকবে। তপন ছোঁড়াটা দড়াম করে দরজা খুলে নির্লজ্জ বেহায়ার মত হাসতে হাসতে এসে ব্যাগ উড়িয়ে বসবে পিছনে গিয়ে। অরিন্দম সামন্ত তাতে বিশেষ গা করেন না। আসছে তো। সেটাই অনেক। আর কোন কলেজে কার ক্লাসে এত উপস্থিতি হয়? কিন্তু আজ হল কী ওদের?
 
স্টিল ব্যান্ডের এইচএমটির সাথে দেওয়ালের অরপ্যাটের সময় মিলিয়ে নিলেন সামন্তবাবু। ন’টা ছেচল্লিশ। ইয়ার্কি হচ্ছে? এক ঘন্টার ক্লাসে ষোল মিনিট খালি? পা ঠুকে দরজার বাইরে বেরিয়ে এপাশ ওপাশ দেখলেন অমিয়বাবু। একটু মিইয়ে গেলেন। অন্য ক্লাসগুলো থেকেও তেমন সাড়াশব্দ তো আসছে না। ভ্যাজানো দরজায় টোকা দেবেন কিনা ভাবলেন তিনি। নাহ। পড়াচ্ছে বলে চুপচাপ। প্রথম পিরিয়ডে এমনি ই হল্লা কম হয়। কিন্তু তাই বলে… আজ বিষ্যুদবার তো? হন্তদন্ত হয়ে ডেস্কে এসে ব্যাগের হাতলে গুঁজে রাখা খবরের কাগজটা বের করলেন তিনি। নিয্যস বিষ্যুদবার। এবং ন’টা পঞ্চাশ। কোনও ভুল হয়নি। হয়নি তো? ক্লাস বাতিল টাতিল করে দিয়েছিলেন? মনে তো পড়ছে না। মঙ্গলবার শেষ ক্লাস ছিল। উঁহু। পরীক্ষা নেবেন বলেছিলেন? সেই ভয়ে? ধুস। তাও না। পরীক্ষা নেবেন বলে কোশ্চেন পেপার না বানিয়ে চলে আসার মানুষ অরিন্দম সামন্ত নন। দশটা আঠেরো। সামন্তবাবু পায়চারি করা শুরু করলেন। আবার।
 
 —————————————————————————————-
 
–  গ্রাউন্ড কন্ট্রোল টু মেজর টম। ইয়ে, টমস্যার, শুনতে পাচ্ছেন?
 
–  হুঁ? পাচ্ছি। কী হয়েছে?
 
–  বলছি যে ইয়েতে… মানে ওই আপনার জাহাজে…
 
–  কী?
 
–  বাঁদিকের ফ্যালাঞ্জি টা , মানে কাজ করা , মানে বন্ধ করে দিয়েছে।
 
–  দিয়েছে বুঝি? তো?
 
–  ইয়ে, তেমন কিছুই না, মিনিট তিনেক সময় আছে আপনার আর।
 
–  …
 
–  স্যরি।
 
–  দিস ইজ মেজর টম টু গ্রাউন্ড কন্ট্রোল! মানে…? হ্যালো? হ্যালো?! সত্যি ই? উপায়? নেই? শুনুন? হ্যালো? গ্রাউন্ড কন্ট্রোল? আমার স্ত্রী কে…
 
মহাকাশযানটার মুখের দিকে আলোর বিস্ফোরণ হলো এবার। গতিশূন্য মনে হল নিজেকে। একটা প্রচণ্ড উজ্জ্বল সাদার মধ্যে প্রবেশ করলাম। স্ক্রিন সাদা। এবার টাইটেল কার্ড পড়বে। মেট্রোর গতি শ্লথ হয়েছে। রবীন্দ্রসরোবর থেকে বেশ অনেকখানি টালিগঞ্জ স্টেশন। ভুঁইফোড় হয়ে উঠে এলো মেট্রো টা। এক কানে ডেভিড বোই।
 
———————————————————————————
 
এ’রকম অবস্থায় হাত কামড়ানো ছাড়া কিছু করার থাকে না। অবশ্য জল এতটা গড়াবে সেটাই বা কে ভেবেছিলো? সব ঠিক থাকলে অর্ণব এতক্ষণে চেতলামুখো। গ্রেগরি পেক এর মত পকেটে হাত গুঁজে। ডিস্ট্রেসিত ড্যামসেল কে উদ্ধার করেও বিনিময়ে কিছুর (খোদ ড্যামসেলের) প্রত্যাশা না করার আত্মত্যাগের (আত্মত্যাগ না হাতি। ধ্বক ই নেই।) গৌরবে গাল চুলকে রহস্যময় “তুই আর কী বুঝবি” হাসি হেসে। বদলে এখন রিকশায়। বেলতলামুখী।
 
হাজরায় চার পাঁচটা ম্যাটাডোর টপকে মারোয়ারি গলির মধ্যে জেরক্সের দোকান ছিলো। একশো সত্তর পাতার পার্ট থ্রি এর নোট্‌স ছিলো। তুতের দিব্যি, তুঁতে কুর্তা ছিলো। গোল বাঁধাল জেরক্সওলা। “আভি বহুত বিজি হ্যায়। কাল আইয়ে। করকে রাখেঙ্গে।” এই জাতীয় কিছু। হিন্দি নিয়ে খোঁটা দিয়ে লাভ নেই। তুঁতে কুর্তার খিদে পেলো তারপর। রত্নার দোকানে টিকিয়া রোল। পয়সা দিতে দিল না। দিলে চাপ ছিলো। পার্স ভোঁভাঁ নাকি পেট খারাপ, কোনটা বেশি সম্মানের হত? যাই হোক। হাজারো খেজুরি। তারপর একটা “ভাগ্যি তুই ছিলি!” উফ্‌, শিবুদা। পাঁজরে এসে লাগে। বার খাওয়াচ্ছে, নাকি… নাকি?
 
তারপর, “আমায় বাড়ি অবধি ছেড়ে দিবি না?”। ঘাড়টা নিজের অজান্তে হেলে যায়। তারপর এই রিকশা বেলতলা যাবে? এই রকম সময়ে হাত কামড়ানো ছাড়া কিছু করার থাকে না। একটা ফুল পকেটে করে নিয়ে আসতে পারলি না গর্দভ? না হয় নাই দিতিস। সুযোগ না হলে ফেরৎ নিয়ে গিয়ে বিনীর মা কে দিলে চিঁড়ের পোলাও করে দিত, মুখ করত না। নইলে হেব্বি মুখ করে মহিলা। ফেরার সময় বাদাম নিয়ে ফিরতে হবে। চিঁড়ের পোলাও মুখে বাদাম না পড়লে ইনকমপ্লিট। পেটুক, হাঁদা কিস্যু হবে না তোর। এই টিকিয়া রোল গিললি তুঁতের ঘাড় ভেঙে। এক্ষুণি। এখন চিঁড়ের খোঁজ? এদিকে ফুলটার কী হবে?
 
সাদার্ন অ্যাভিন্যু দিয়ে সরসর করে রিকশা টানছে। ডানপাশে বকবক। মিষ্টি রিনরিনে গন্ধ।  হাল্কা ছোঁয়া। সেটা না হয় রিকশার অনুঘটকে। হাত সরিয়ে না নেওয়া? সেটা? মুখে বলা হয়ে উঠবে না অপদার্থ। যেটা চাইছিস, সেটা বোঝাতে জেশ্চার লাগত। ফুল। ফুল লাগত। ওই দেখ। রাস্তাজুড়ে চেপ্টে যাওয়া রাধাচূড়াগুলো তোকে ব্যঙ্গ করছে! এক মিনিট। এক মিনিট! রাস্তায় ফুল এলো কোত্থেকে?
 
অর্ণব কেবল প্রেজেন্ট স্যার এর কায়দায় হাতটা তুলল। রাস্তার পাশ থেকে ঝুঁকে পড়া ডালের এক দুটো তাজা ফুল চলে এলো তার মুঠোয়।
 
——————————————————————————
 
– দরজায় হেলান দিও না।
 
– উঁ?
 
– বলছি দরজায় হেলান দিও না! খুলবে এক্ষুণি।
 
বটেই তো। পরবর্তী স্টেশন নেতাজী সুভাষ। প্ল্যাটফর্ম বাঁ দিকে। নামতে হবে। গল্পগুলো কোথাও যায় না। প্রান্তিক স্টেশন আসার আগেই আমায় নেমে যেতে হয়।
Advertisements