দু’শো মিলির কাঁচের বোতল থেকে গোলাপি স্ট্র দিয়ে সুরুৎ সুরুৎ করে মিরিণ্ডা টানছিল কলকাতা। কখনও ফুঁ দিয়ে বোতলের পেটে কমলা বুড়বুড়ি ফোটাচ্ছিল। স্ট্র’টা নীল-ডালডার-বাক্স-ডাস্টবিনে ফেলে তলানিটুকু বোতলে মুখ লাগিয়ে পিছনটা উর্ধ্বগগনে তুলে কোঁৎ করে গিলে ফেলল। বোতলটা নামিয়ে রাখল খোপখোপ পেপসি রাখার ইয়েটায়। ঘামে ভিজে ন্যাতানো একটা কুড়ির নোট দোকানদারকে ধরিয়ে  খুচরো ঢোকালো পার্সে। কমলা জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বাসস্ট্যান্ডে নামল তারপর।

মাঝদুপুরের ঘেমো মধ্যবিত্ত কলকাতা। নীল প্যাকেটের লে’জ এর চিপ্সের দিকে তাকিয়ে থাকা কলকাতা, তারপর “ধুর!” বলে কমলা সুধা পান। ছ’নম্বরে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যাবে না, এস সেভেনে দু’টাকা ভাড়া বেশি। কালো-হলুদ ট্যাক্সির ভিতর থেকে ছাই-পাগড়ি দৃকপাত ও করে না। কোডাক কেবি-টেন এর পেটে পোরা ফুজিফিল্মের রঙিন ফিল্মে সে কলকাতা ধরা থাকে। একটা ফিল্মে তিরিশটা ছবি, এক দুটো ফাউ পেয়ে গেলে রান্নাঘরে মায়ের খুন্তি নাড়ার ছবি। সাদা ফটো ভিলার খামে চতুষ্কোণ কিছু আবছা, কিছু পুড়ে যাওয়া, কিছু হাত কেঁপে যাওয়া, কিছু “এইটা দারুণ এসেছে”  ছবি, আর নেগেটিভ। ফেরত পাওয়া ফিল্ম রাখার কৌটোয় বোতাম, সেফটিপিন। পুরী ফেরত অ্যালবামে দেড় খানা রিল খরচা হয়েছিল। বাকি আধখানা সেলিমদের কোয়ার্টারের ছাদ থেকে তোলা ডবল-ডেকার বাস, কমলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে শালপাতার প্লেট থেকে আইসক্রীমের চামচ দিয়ে রসমালাই খেতে ব্যস্ত বৃদ্ধ, আলো আঁধারি ট্রাম।

কলকাতায় গোধূলি হয় না, মিনিবাসের ধোঁয়া হয়। দিনশেষটা কমলা হয়ে ওঠে দিগন্তে। কলকাতা গা ধুয়ে পাউডার মাখে। হ্যালোজেন আর নিওনের চচ্চরি মন খারাপে ফোড়ন দেয়। দক্ষিণ কলকাতায় কিছু এ’রকম গলি আছে। পার্থ স্যারের বাড়ি পড়তে যাওয়ার “ঈশ কী দেরি হয়ে গেল” গলি। বল পিটিয়ে সময়ের হুঁশ না থাকা সাইকেলে দুদ্দাড় ফেরত আসা গলি। কলকাতার পিঠ শিরশির করে। বহুকাল বাদে শহরে ফেরা কলকাতার মেট্রো থেকে রিকশায় বাড়ি ফেরার সময় ওইসব গলির মুখে বুক চিনচিন করে। কী জানি কেন। “বাড়ি ফিরতে হবে, দেরী হয়ে যাচ্ছে, বকবে।” অথচ আকাশ কালো হয়নি, আবছা উজ্জ্বল নীল। কমলা বাতির কন্ট্র্যাস্ট। কলকাতা, কবে সাবালিকা হবে?

Advertisements