ফটিক বাতাস-রিমোটের বোতাম টিপে চারপাশের আওয়াজ কমিয়ে এক এ রেখেছে। মিউট করা ঠিক নয়। স্টপ এলে টের পাবে না। এই কমিয়ে নেওয়াটুকু বড় প্রয়োজন। শব্দ, দৃশ্য ঘ্রাণ বড় ক্লান্তিকর। পাদানি থেকে ঠেলে সরিয়ে গুঁতিয়ে বাসের পেটের মধ্যে ঢোকাটা খুব নৈমিত্তিক ঠেকলেও নিত্যের ঘষায় ক্ষয় হয়। এমনিতেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে তিন ডিগ্রী উপরে আর আর্দ্রতা মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয়। বেঁচে থাকাটাই ধকল, মনে হয় ফটিকের। ঘন্টাদরে ওজন বাড়ে বোঝার। শেষ বেলায় ইন্দ্রিয়গুলো শাকের আঁটি হয়ে দাঁড়ায়। বাসের ছাদের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ঢলে পড়তে চায় শরীর, ভিড় তাকে ঠেকিয়ে রাখে। টিকিটের গোছায় আঙুল বোলানোর ফরফর, বাসের শরীরে ধাতব থাপ্পড়, গেট থেকে সরে দাঁড়ান, টিকিটটা দেখি আর একবালপুর একবালপুর হাতুড়ি পেটে। ইয়ারফোন এক কানে মূক। তাই নীচের বোতাম টিপে সবুজ দাগটা এক এ। চোখ বন্ধ। দু’পকেট ছুঁয়ে দেখা মাঝমধ্যে। সতর্কতা। ন্যাশনাল লাইব্রেরী নাগাদ কোন মন্তরে বসতে পেয়ে গেল ফটিক। লালবাতি নাগাদ পদোন্নতি হয়ে জানালার ধার। দৈবাৎ চললে বাসটা, কিছু খুচরো হাওয়া। এইটুকুই তো জীবন। জানালার ফ্রেমে মাথা রেখে ফের চোখ বোঁজে ফটিক। ভ্যলিউম একেই। বাসটা নড়ছেই না। বয়ে গেছে। কোলের উপর কালো ব্যাগটা। মুঠোয় ভাড়ার খুচরো। ব্রাইটনেস শূন্য। ভ্যলিউম এক।

——————————————————————————————————————————————————————

“এই শহরটাকে একটু ঠাণ্ডা করা যায় না?”
লেকের শ্যাওলা পচা গন্ধর সামনে তামাকপোড়া ধোঁয়াকে সুবাস মনে হয়।
“এখান থেকে ওঠ তো। অন্যকোথাও চ।”

 

রোদের তাপ নেই, তীক্ষ্ণতা নেই। ভোঁতা গরম। অল্প আঁচে ভাপা। পায়ে পায়ে লেকের মাঠ। “একটু বৃষ্টি নামলে পারে।” “রিকশাগুলো একটু চওড়া হলে পারে।” ফটিকের তথাস্তু বলতে ইচ্ছে হয়। রিকশা থেকে শহরটা পুরোনো সাদা কালো বাংলা সিনেমার গাড়ির সীনের মত লাগে। গাড়িটা স্থিত, পিছনে সীন নড়ে চলেছে। কনুইতে কনুইতে গিঁট। প্যাডেল সাইনকার্ভ আঁকে। এ’সব অগ্ন্যুৎপাতের পূর্বাভাস, এই গুমোটগুলো। টাটা স্টিলের বাড়িটার চূড়ো থেকে লাভা গড়িয়ে নামবে চটচটে মধুর মত, বাথরুমে গিয়ে ধুয়ে ফেলা যাবে না। ছ্যাঁকা লাগছে এখন, কাঠকয়লা জীবাশ্ম হয়ে যাবে মানুষ। গলা-পিচ-কংক্রীট-ধাতু স্রোতের কিনারা এড়াবার জন্য রিকশা ছুটবে, এইট-বির ভিড় চাপা দিয়ে ছুটবে অটো। আয়নায় দেখবে কেমন হলুদ ট্যাক্সিটাকে গিলে ফেলল লাভাটা, উরেবাবা। লেকের জল ফুটবে, তাতেই জালিয়ানওলা বাগের মত ঝাঁপ দেবে মানুষ। তারপর সমাধি হবে। দৌড়ে লাফিয়ে বাড়ির ছাদে উঠবে। চাঁদে উঠবে। পার্ক স্ট্রিটের সবচেয়ে উঁচু বাড়িটা। রাইফেল ক্লাব থেকেও দেখা যায়। তার উপর। নিস্তার পাবে না। হাজার বছর পরে বাচ্ছারা বলবে “কলকাতা সত্যি ছিলো বাবা? নীলসাদা একটা আস্ত শহর ছিলো?” ছিলো। গুপ্তধন ছিলো। প্রেমপত্রের লাইব্রেরী ছিলো। কেউ কেউ বলবে “উঁহু, কাল্পনিক শহর, কবীর সুমনের গানে পাওয়া যেত। ওরকম আবার শহর হয় নাকি? পুলিশচৌকিতে বৃষ্টি থেকে লুকিয়েছে একটা পাগল? ধুর! কই, ম্যাপে দেখাও তো?” গবেষণা হবে। পি এইচ ডি। পেপার। টেকটনিক প্লেটের পেট গরম হয়ে এই আগ্নেয়গিরি। পুরোহিত শোনাবে ঘেঁটু দেবী রুষ্ট হলে কী হয়।

 

পরিত্রাণ নেই? আছে। চোখ বন্ধ করে মুখ টা মুখের একেবারে কাছে এনে বলবে “একটু ফুঁ দিয়ে দে তো।” কলকাতার স্বার্থে সমস্ত লজ্জার মাথা খেয়ে বাধ্য ছেলেটির মত ফুঁ দিয়ে দিতে হবে মুখে। “আঃ” রুষ্ট দেবী সন্তুষ্ট হবেন।
——————————————————————————————————————————————————————-
হঠাৎ কানের কাছে আঠেরোর ভ্যলিউমে হুট করে ঢুলুনিটা ভেঙে গেল ফটিকের। চোখ খুলেই বাহান্নর ব্রাইটনেস এ ধাঁধিয়ে গেল কর্নিয়া। শিউরে উঠল ফটিক। ভয়ে না। ঠাণ্ডায়। হাজরা নামবে। হাজরা। হাজরা। কন্ডাক্টরের হাতে খুচরো গুঁজে দরজায় দাঁড়াল ফটিক। ফটিককে আপাদমস্তক পড়ে নিলো মাঙ্কিটুপি লোকটা। “সোয়েটার না পরে বেরিয়েছ?”

 

এইরকম সময়েই ঘুম ভেঙে যাবার কথা। কিন্তু স্বপ্ন হবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হাতে হাত ঘষে নীচে নামল ফটিক। পায়ের তলায় কুচিকুচি বরফ। হাজরার মোড়ে। মেঘলা আকাশ থেকে মুঠো মুঠো গুঁড়ো বরফ নামছে নিঃশব্দে। শিলের তীব্রতায় নয়। শিমুল তুলোর মোলায়েমতায়। চোখের পাতায় আটকাচ্ছে। জুতোর ফিতেয়। কাঁধে খুস্কির মতন। আর কেউ অবাক হচ্ছে না কেন? তারপরেও বলবে স্বপ্ন নয়? নয়। স্বপ্ন হলে নিজে থেকে এগোত গল্পটা। এগোচ্ছে না। নাক থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। হাতের পাতায় ব্যথা। ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি? কাঁচা সিমেন্টে পায়ের ছাপ দেখেছে ফটিক। সাদা বরফে নোংরা জুতোর ছাপ দেখছে এখন। সবুজ অটোর হলুদ ছাদে বরফ। মেট্রোর গেট দিয়ে পাতালপ্রবেশ করল ফটিক। কামড়টা কম এখানে। স্মার্টকার্ড ছুঁইয়ে নামল পায়ে পায়ে ভিজে প্ল্যাটফর্মে। একশো লোকের উষ্ণতা। স্রোতে ঢুকেও গেল ভিতরে। ওভারকোটের ভিড়ে বেমানান হাফ শার্ট হয়ে। কেমন অভ্যেসমত ভ্যলিউমটা এক এ নেমে গেল আবার। ব্রাইটনেস শুন্যে।

 

রিভলভিং দরজার মত চারপাক খেয়ে তন্দ্রা ছুটল ফটিকের। নেমে গেল টালিগঞ্জে সবাই। কামরায় দু’জন ফুলশার্ট এখন। ট্রেনটা কেঁচোর মত মাটির উপরে উঠেছে। দরজার কাঁচে নাক ঠেকিয়ে দাঁড়াল ফটিক। মুহূর্তে বাষ্পে সাদা হয়ে গেল সেটা। হাতের চেটোয় মুছল ফটিক। নড়ছে ট্রেন। স্টেশন ছেড়ে বেরোল। চোখ ফুঁড়ে দিয়ে রোদ ঢুকল কামরায়।

 

ঠকঠক করে কেঁপে উঠল ফটিক।
Advertisements