অথচ দিনটা এ’রকম ছিলো না।

সারাটাদিন ছায়া খুঁজেছে শহর। ছাতার তলায় খুঁজেছে। অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে ল্যাম্পপোস্টের একরত্তি আবডালে খুঁজেছে, দেওয়াল ঘেঁষে না দাঁড়িয়ে আড়াআড়ি বেঁকে গেছে লাইন। বন্ধ শাটারের সামনে কার্নিশের তলায় খুঁজেছে। পাঞ্জাব লরির পেটের তলায় খুঁজেছে। রিকশার ছৌ এর ভিতর, গামছার আড়ালে খুঁজেছে। খুঁজেছে মঞ্জিনিসের ভিতরে, “একটা কোল্ড্রিঙ্কস দেখি”‘র অছিলায়। কলকাতায় গাছ বড় কম।

 

দিনটা চোখ কুঁচকানো রকম উজ্জ্বল ছিলো। অবিরাম নিষ্ঠুর ছিলো। “এখনও উষ্ণতম হয়নি”, এই হুমকি ছিলো। তারপর কোথা থেকে কী হয়ে গেল। ভিজে রুমালটা কাচার বালতিতে ঢুকল, ভিজে বেড়ালটা বেরোলো কলতলা থেকে, আর ফ্যাটফেটে হলুদটা গোলাপি হয়ে গেলো। পাম্প চালিয়ে, স্নান করে, ঘাড়ে পাউডার মেখে ছাদে উঠে এলো কলকাতা। “উঃ” বলে পিছিয়ে গেলো, নেমে ফের উঠল হাওয়াই চটি পায়ে। ছাদের মেঝেটা এখনও গরম। ছাদের নিবিড়ে স্যান্ডোগেঞ্জির ফাঁস করা বুকের লোমের ভিতর পৈতে। ছাদের খোলা একান্তে শাড়ির আঁচল ব্লাউজ ভুলিয়ে দেয়, খুলিয়ে দেয়। জলের ট্যাঙ্কির পিছনে খুচ করে লাইটার জ্বলে। আলসে কুমীরের মত গোধূলি পোহাচ্ছে কলকাতা। কলকাতা শাঁখ বাজিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে সন্ধ্যে দিচ্ছে।

 

ফটিক ছাদের পাঁচিলে কনুই ভর দিয়ে ঝুঁকছিল। অল্প। সমস্ত মসজিদ কোরাসে আজানে ডেকে উঠল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে বাঁ পায়ের গোছ চুলকালো ফটিক। মশা। আকাশের গোলাপিটা বড় মলিন। কয়েক স্তর ময়লার নীচে আসল রঙ চাপা পড়ে গেছে। কানের তলা আর চুলের ভিতর দিয়ে একটু হাওয়া খেলছে। ফোন করবার মানে হয় না। পরিষেবাসীমার বেশ অনেকটা বাইরে। তবে আর কী? আজ যেন কী বার? ওব্বাবা। আরও… আঙুলে কর গোনে ফটিক। আহ্‌। অভ্যেসের মত চুলকাচ্ছে অনুপস্থিতিটা। আনতাবড়ি হাঁটতে হাঁটতে ধরে নেওয়া, যে পাশেই আছে, তারপর কাঁধ ধরে “ওই দেখ ওই দাড়িওলা ছেলেটা…” বলতে গিয়ে খেয়াল করা যে নেই। রাস্তার ওপারে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাবলা। নেই। ঠিকই ছিলো। কী যায় আসে। হুরর। হুট। কিন্তু নেই। আর দিনটাও এ’রকম ছিলো না। ফুরফুরে আর দমকা মিশিয়ে বাজে হয়ে গেলো। দিব্যি ছিলো পিচ গলা।

 

আজানের পিছন থেকে চলতি সাইকেলের কিড়িং আর হলদে সবুজ অটোর প্যাঁক আসে ছাদ অবধি। আর আসে দোতলার এফএম। “…চলছে হারানো সময়ের গান, আর আপনি শুনছেন…” ফটিক ছাদের দরজায় শিকল তুলে অন্ধকার সিঁড়ি নামতে থাকে। কথা ও সুর সলিল চৌধুরী। ফটিক ঠোক্কর খায়, পায়ের আঙুলে লাগে। গেয়েছেন শ্যামল মিত্র। ফটিক সিঁড়িতে বসে পড়ে। অ্যাকর্ডিয়ন কানে আসে। শ্যামলের উচ্চারণ। ফটিক সিঁড়ির রেলিং ধরে উঠে দাঁড়ায়। “বাইরের ঘরের জানলাটা খুলে দে এবার, ফটিক, সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে”। ফটিক জানে যে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। শ্যামল গেয়ে চলেন।

 

“…এমনও দিনে তুমি মোর কাছে নাই…
স্মৃতিরা যেন জোনাকির ঝিকিমিকি…”
Advertisements