প্রথমে মনে হয়, এত আওয়াজে ঘুম হবে কী করে? হাজার হাজার লোক, সবাই বাঙময়। বিভিন্ন স্বর, গ্রাম। কত বক্তব্য। কান্না। অভিযোগ। রসিকতা। দুশ্চিন্তা। কত ভাষা। টুকরো জুড়ে জুড়ে গল্প হয়ে যায়। তারপর নিজের ভিতরের চিন্তাগুলোকে আমল দিতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হয় কোলাহলটা একটা নির্দিষ্ট তারে বাঁধা। কেউ চেঁচিয়ে বলছে না কথা। কারুর গলা সেই তারের উপর দিয়ে শ্রবণ কাড়ছে না। সয়ে গেছে কানে। এখন ওটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। হাজার একটা আলাদা গলা মিশে দলা পাকিয়ে এক শরীরের গুঞ্জনে রূপান্তরিত হয়েছে। একটা টানা একঘেয়ে গুনগুন। একঘেয়ে। ট্রেনের দোলার মতন। একঘেয়ে। ঘুম এসে যায়। বেকায়দার চেয়ারে বসে পাশের দেওয়ালে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বোঁজে স্বাগত। সিকিভাগ সচেতনতা জিইয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। সময়ের জ্ঞান হারায়। স্থানমাহাত্ম্য লোপ পায়। তবু কী একটা শোনার জন্য এক চামচ চেতনা ঘুমোয় না। কী একটা “শুনতে যদি না পাই”-এর ভয়। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দেবার ঘোষণা? পেশেন্টের বাড়ির লোক কে আছেন? কী একটা। সবাই তাদের কথা-নাকথা-ঘুম-ফোনঘাঁটা সবকিছুর মধ্যে সেই কী একটা’টার অপেক্ষায়। যেন ডাক এলেই যাবতীয় সব ফেলে উঠে যেতে হবে। স্বাগতরা দু’বার সু্যোগ পায়না জীবনে। সুযোগ হাতছাড়া হবার খুব মধ্যবিত্ত ভয় তাদের। তার। তবু তার মধ্যেই একটু আলগা দেওয়ার বিলাসিতা। কোলাহলের সুরে হ্যামলিনের বাঁশিওলার থেকে বেশি মাদকতা। আর দুপুরের ছায়ায়। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নেওয়া। “আড়াইটেয় তো বলছে।” কী বলছে? অপারেশন শেষ? ট্রেন ঢুকবে? কী? একটা সীট বাড়তি পেয়ে পা-টা ছড়িয়ে দেয় স্বাগত। দেওয়ালটুকুই প্রাপ্তি। তারপর ঘুম এসে যায়। 

“হয়ে গেছে।”
“কী?”
“ঠিক।”
“কী?”
“সব।”

রাস্তায় ওড়না লুটিয়ে চলা একটা মেয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে কথাগুলো বলছিল। সব ঠিক হয়ে গেছে। আর নাকি ভাবতে হবে না। “কিন্তু ওইটা—?” উঁহু! রাগ দেখায় মেয়ে। বলছি তো সব ঠিক। এবার চলো তো!। কোথায়? রাস্তাগুলো চেনা চেনা। ছবিতে দেখা? হলুদকালো ট্যাক্সি। দেওয়াল জুড়ে পোস্টারের উপর ভোটের ব্যঙ্গচিত্রের উপর গদের আঠা দিয়ে বিজ্ঞাপন। স্বাগত খুব চেষ্টা করেও জায়গাটার নাম মনে করতে পারে না। কিছু একটা নিয়ে তার দুশ্চিন্তা হবার কথা, সেটাও মনে পড়ছে না তেমন। শুধু একটা বোধ গলা অবধি আইঢাই করছে। সব ঠিক হয়ে গেছে। শরীরের ভরকেন্দ্রটা একটু পিছনের দিকে সরে গেছে কি? পিছনে হেলে যাচ্ছে কেন সে? শালপাতায় চাটনি মাখিয়ে শিঙাড়া খেতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটার থেকে সিগারেটটা কেড়ে… সিগারেট পায়ের তলায় দলে নেভানোর খুব শখ স্বাগতর। মেয়েটাকে চুমু খেলে কী খুব আপত্তি করবে সে? ভুরু কুঁচকে সেটা অনুধাবন করবার চেষ্টা করে স্বাগত। এতক্ষণ ল্যাম্পপোস্টের তলায় তারা দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন মনে হচ্ছে সাততলার ছাদ। অন্য বাড়ির জানলাগুলো টিমটিম করছে। ট্যুইঙ্কল। এইই ভালো। নো হোয়ার টু গো ব্যাক টু। সব কাজ সারা। জীবন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত। নিশ্চিন্ত। শান্তি। এই মেয়েটাকে যেন ও কোথায় দেখেছে? এই শহরটা…?

অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতায় বড় অস্বস্তিতে পড়ে স্বাগত। শোরগোলরত ক্লাসঘরে দেবযানী ম্যাডামের ঢোকার নিস্তব্ধতা। অশনি। অস্বস্তি। যেন চোখ খুলেই দেখবে এমপিআর তার দিকেই তাকিয়ে। গোটা ক্লাস হেসে উঠবে তারপর। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে স্বাগত। চেয়ারে তোলা পা-টায় ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। হেলান দিয়ে কাঁধে একটা আড়ষ্টতা। গোটা চত্বরটা ফাঁকা। লাঠির ডগায় ন্যাক্‌ড়া বাঁধা জিনিসটা বালতিতে ডুবিয়ে মেঝে মুছছে একজন। ফিনাইলের গন্ধ। মাথায় ঝিম। কীসের অপেক্ষায় বসেছিলো স্বাগত এখানে? এটা কোথায়? ভোম্বলের মত বসে থাকে স্বাগত। মিনিট দু’য়েকের বেশি চিন্তাটা স্থায়ী হয় না। যাক্‌গে যাক। সব ঠিক আছে। “সব ঠিক হয়ে যাবে”র তৃতীয় বিশ্বের মানুষ স্বাগত। এই প্রথম বিশ্বের নাগরিকত্ব সইবে তো?

ভেজা মেঝের উপর সাবধানে পা ফেলে বেরিয়ে আসে স্বাগত। ওয়েটিং রুম লেখা বোর্ডটার উপর একটা বাল্ব চিড়িক চিড়িক করে।
Advertisements