হাজরার সিগনালটা সবুজ ছিল। লালসাদা ছয় থেকে নামতে পেরেছিল কৌশিক। সতেরো মিনিট লাইন দিয়ে অটোয় উঠে টের পেয়েছিল টি টা ভেঙে গেছে। একটা কান আলগা হয়ে ঝুলছে খোসার মধ্যে। আবার চাঁদনী যেতে হবে। সত্তর টাকার তফাত টা একটা তফাত। ঘি রঙের রুমালটায়  ভাদ্রর ঘাম মুছে লাল গেটটা দিয়ে ঢুকল কৌশিক। আকাশি জামাটা জবজব করছে। পাশে কেউ বসবে না। গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে ফুটপাথে চোরাই গন্ধজল বিক্রী করে। একশো কুড়ি টাকার ডিও সত্তরে। বাথরুমে ঢুকে মুখ ধুয়ে ঘি রুমালে মুখ মুছে উপরের তিনটে বোতাম খুলে হাত ঢুকিয়ে বগলে বুকে ছড়িয়ে দিল কৌশিক। এবার বসবে। ঘাড়ে ঝুঁকে উত্তর দেখতে চাইবে। মুখটা হাসি হাসি করে নিল কৌশিক। দু’তিনটে করে সিঁড়ি টপকে ছাদের ঘরে উঠল। বারো টাকা দিয়ে সাদা ড্রয়িং পেপার কিনতে হয়। দু’টাকার খুচরো আর একটা কোণা ছেঁড়া দশটাকার নোট অম্লানদা কে ধরিয়ে পাকানো পেপারটা নিয়ে ডেস্কে বসল কৌশিক। চালিয়ে দেওয়া গেছে। এই ঘরটা খুব পছন্দ কৌশিকের। বড় বড় জানালা। গঙ্গা দূরে নয়। প্রভূত হাওয়া আসে। চিড়িয়াখানার আওয়াজ আসে। ন্যাশনাল লাইব্রেরীর বই এর গন্ধ আসে। সেটা যদিও আর কেউ পায় না। ছেত্রী এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। সারাদিন পান খায় লোকটা। “টি কই?” তথ্যপ্রমাণ সামনে মেলে ধরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট উল্টোলো কৌশিক। “ভারী কাজের ছেলে তো তুমি! দেখো কারটা হয়েছে, চেয়ে নাও।”

 

দিনটা কেটে গেল। রোজ যেভাবে যায়। টেবিলে আঁক কেটে। অরূপকে ক্ষেপিয়ে। জেরক্স করে। স্কোর দেখে। সৌত্রিকের টিফিন চেখে। ঢুলে, ঘুমিয়ে। কন্ট্রোল সিস্টেমস এর ক্লাসে রোহিতরচিত উর্দূতে নোট নিয়ে। পদনার মাথা মালিশ ক’রে দিয়ে। অর্পিতাকে দেখে বেকার আদিখ্যেতা করে। তারপর নিজেকে খিস্তিয়ে। আড়মোড়া ভেঙে। যেভাবে রোজ কাটে। লাল গেট থেকে বেরোনো অবধি। হাজরা গেলে হবে না। টি। “আজ বিষ্যুদবার ছিল। রত্নার টিকিয়া রোল দিবস।” রোহিত কিছু খাবার সময় ওর বাঁ চোখটা ছোট হয়ে যায়। “কাল”, বলে দু’শো আঠেরোয় উঠে পড়ল কৌশিক। একটা লেডিজ সিট ফাঁকা। চোখ বুঁজে বসে পড়ল সে। কেউ এলে দেখা যাবে। রেসকোর্সের সামনে ঘোড়ার হাগার গন্ধ। রেড রোডে সুমন, কানে, ফোনের রেডিয়োয়। অবোধ্য কবিতায়, ঠুমরী খেয়ালে। কড়া সেন্ট। মাথা তুলে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল কৌশিক। গোলাপি সালোয়ার বসে পড়ল। বড্ড কড়া সেন্ট। টিপু সুলতান মসজিদের সামনে নেমে পড়ল। রেজালার গন্ধ নাকে হারিয়ে গেল চাঁদনীর ভুলভুলাইয়ায়। পায়ে পায়ে বস্তা মাথা আর লুঙ্গি পা পেরিয়ে হলুদ শাটারে সেঁধিয়ে গেল সে। “টি।” পেড়ে আনল স্যাণ্ডো গেঞ্জি। কুড়িটাকা খুচরো পকেটে পুরে বেরিয়ে হঠাৎ একটা ক্লান্তি পেয়ে বসল কৌশিককে। সারাদিনের ভড়ংটার থেকে বেরিয়ে আসার বিদ্রোহ বাষ্প হয়ে বেরোতে থাকল কান, নাক থেকে। মিথ্যে বইবার ভড়ং। ঠিক আছি’র ভড়ং। চাপানো সুখ মেনে নেবার ভড়ং। তখনই জিনিসটা চোখে পড়ল কৌশিকের। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দেখল সে। এইটুকুই বিদ্রোহের দৌড় তার। এ মাসে রত্না অধরা থাকবে। 

 

বালতিতে জল ভরার শব্দে লাস্য থাকে। ভাদ্র রাত্রের স্নানে পুনর্মিলনের মৈথুন থাকে। লাল সবুজ গামছায় আদর। চুল আঁচড়ে ভাতে চিচিঙ্গে মাখল কৌশিক। তেলাপিয়ার ঝোল। টুকটাক সংলাপ। আজ এত দেরী হল কেন’র উত্তরে কই? ওই আর কি। মেট্রোয় ঝাঁপ দিয়েছিল কেউ। শোনোনি খবরে? তারপর ডেটল সাবান। মশারির খুঁট। অনিচ্ছার পাতা উল্টানো। রোজকার মতন। কিন্তু আজ বিদ্রোহবার্ষিকী। দেড়টা নাগাদ উস্খুসে কৌশিক হুক থেকে চাবি নামিয়ে ছাদে উঠল। লম্বা নলের মত বাক্সটা নিয়ে। ভাদ্রের ছাদ ভালোবাসা। ভাদ্রের ছাদ “আমায় মনেই পড়ে না তোমার আর। সব জানি।” বাক্সের ঢাকনা খুলল কৌশিক। দূরবীনটা বের করল। টেলিস্কোপ, বাইনোকুলার নয়। টেনে লম্বা করা যায়। পাঁচিলের ধারে এসে তাতে চোখ রাখল কৌশিক। ঠাহর হল না কিছু। সরিয়ে নিয়ে খালি চোখে দেখল একবার। ওহ। মুখের ঢাকনাটা। ল্যাম্পপোস্টের তলায় মনু। ভদ্রদের বাড়ির জমিতে ফ্ল্যাট উঠেছে। তার তেতলার ঘরের রাস্তার দিকের জানাল্য তাক করলে বাপিদাকে সিগারেট খেতে দেখা যাচ্ছে। বৌদি চুল আঁচড়াচ্ছে। পাউডার ঢেলে দিচ্ছে বাপিদার ঘাড়ে। মজা পেলো কৌশিক। বেশ শক্তিশালী পাল্লা জিনিসটার। এত শস্তায় পাওয়া যাবার কথা নয়। ভাদ্র রাতের ছাদের হাওয়া “কী হয়েছে তোমার? বলো তো আমায়।” খুব অন্ধকার। কোনদিকে তাক করা যায়? ছাদের মেঝেতে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে সোজা আকাশের দিকে দূরবীন মেলে তাতে চোখ দিয়ে খুব অচেনা একটা তারা দেখতে পেল কৌশিক। সপ্তর্ষির বুকের উপর।  আঙুল দিয়ে প্রত্যেকটা ঋষির সাথে জুড়ে দেওয়া যায়।
“সাতটা মাথা কী কী বল তো?”
“হুহ। পরীক্ষা নিচ্ছিস?”
“নিচ্ছি।”
“একটা পার্ক স্ট্রীট। একটা গড়িয়াহাট। একটা ওই আমাদের কলেজের সামনে দিয়ে, সি আই টি রোডের দিকে…”
“তিন হল।”
“দাঁড়া না। একটা বাইপাস।”
“চার।”
“আর? আর… তুই নিজে যেন জানিস।”
“এজেসি। নন্দনের উপর দিয়ে।”
“এই এটা জানতাম।”
“ফুস। পাঁচ হল। আর-“
“আর? কী হল? বল? বল!”
“আর…”
“বলছি পার্ক সার্কাস কী সত্যিই সাত মাথা?”
বশিষ্ঠ আর মারীচ একটু ম্লান হয়ে গেল কি?
Advertisements