নয়না বলার মধ্যে বলেছিল যে ও মোটা হতে চায়। “না, মানে হাত-পা গুলো লিকলিকেই থাকুক, একটা বড় মতন ভুঁড়ি হলেই হবে।” দেবজিৎ কথাটা মাটিতে পড়তে না দিয়ে লুফে নিল। “সে ব্যবস্থা আমি করতে পারি।” গোটা স্টেডিয়ামের শ্বাস বন্ধ। “মানে তোর যদি আপত্তি না থাকে।” ক্রাউচিং টাইগারের ক্ষিপ্রতায় তৃতীয় বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে পড়ছিল বিশু। হেঁইয়ো এক আপার কাট। নির্মম হুক। এলোপাথাড়ি কিলচড়ঘুঁষি।

“আহ! রক্ত বেরোবে যে!” নিতাই এর ডাকে সম্বিৎ ফিরল। খোলা পা’টা ছেঁকে ধরেছে মশায়। মা পইপই করে বলেছিল ফুলপ্যান্টটা পরতে। হাজারখানেক টোপলার একটাকে মনের ঝাল মিটিয়ে চুলকোচ্ছিল বিশু, নিতাই মুচির দোকানে বসে। ডান পায়ে কার একটা বেঢপ সাইজের শুকতলা ক্ষয়া পেরেক উঁকি মারা জুতো। নিজের চটিটা সেলাই করছে নিতাই। সপাটে চড় কষাল পায়ে। সাতআটটা মরল।

“ছোবড়ায় কাজ হয়? খালপাড়ে দোকান তোমার। কচ্ছপধূপ লাগাও।”

“পয়সা কি তোমার বাবা দেবে?” নিতাই এর একটা পিকদানি আছে। সেটায় টিপ করে পুচুৎ করে এত্তখানি পিক ফেলল নিতাই। অব্যর্থ। বিশু নাক সিঁটকালো। গা রিরি করছে। মুখ বুঁজে দেবজিতের টিপ্পনীটা শুনতে হল। ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস আদপে হয় নি। মারকুটেমো তার ধাতে সয় না। তাছাড়া যে অধিকারবোধটা নিজের ভিতরে সে সযত্নে লালন করছে দেড় বছর ধরে, সেটার অস্তিত্ব বহির্জগতে নেই। তার নিজের অস্তিত্ব কতজনের কাছে আছে সেটাই সন্দেহ। নয়নার কাছে তো নয়ই। কেউ জেনে গেলে কেলেঙ্কারি হবে। টিটকিরিতে টিকতে পারবে না বিশু। প্রত্যাখ্যানের ভয় সঙ্গলাভের আনন্দের থেকে বেশি শক্তি ধরে। আর এমনও নয় যে “হ্যাঁ” শোনার বিন্দুমাত্রও সুযোগ আছে। দেবজিৎ সপ্রতিভ। রসিক। হারামজাদা। আরেকটা থাপ্পড় না দেখেই কষালো পায়ের গুলিতে। দু’টো মশা পেট ভর্তি রক্ত নিয়ে চেপ্টে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে মোছার কাপড় খুঁজতে লাগল বিশু।

“হল তোমার?”

“এইত্তো। আটা লাগাচ্চি।” একটা মাথা ঝিমঝিম গন্ধ আঠাটায়। মধুর মতন গাঢ়, বাদামী। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠল। সদ্য-সিলিত চপ্পল পরে সাইকেল ঠেঙিয়ে টেম্পোটার পিছুপিছু কালীবাড়ির ব্রিজে উঠল বিশু।

খালি পায়ে হাঁটলে অনেকরকম নতুন অনুভূতি হয়। তার সবকটা যে ভালো তা নয়, কিন্তু নতুন। এই যেমন ফুটপাথ জিনিসটা যে মোটেই মসৃণ নয় সেটা জানা ছিল না। পিচের রাস্তা আরও রুক্ষ। আরও গরম। প্যাচ করে পায়ের তলায় কী একটা পড়ল একবার। কাদা মতন। কাদা নয়। তারপর থেকে চোখ আকাশে তুলে হাঁটছে নয়না। নীচে তাকানোর সাহস নেই। সাধের হিল’টা মট করে ভেঙেছে। গোড়ালির ফিতে হাতে ঝুলিয়ে শাড়ির কুঁচি সামলে নাক সিঁটকে তার ওডিসি। পায়ের তলায় আসন্ন নরম কিছুর তাল এড়াতে রামনাম জাতীয় কোনও মন্ত্র নেই? তার থেকে কাঁটা ফুটুক।

ট্যাক্সি রাত্তিরে ভিতরের রাস্তায় ঢুকতে চায় না। রিকশাও নেই একটাও। অটোর জন্য এটিএম এর মত লাইন। হেঁটেই মেরে দি। গোড়ালি দেহ রাখার পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় এদিক ওদিক দেখে নিয়েছিল নয়না। কেউ দেখেনি তো? উঁহু। দূরে একটা ছেলে পানের দোকানের সামনের ল্যাম্পপোস্টে পাকানো জ্বলন্ত দড়ি থেকে সিগারেট ধরাচ্ছিল। লক্ষ্য করেনি বোধহয়। অস্ফুট কোনও মন্ত্র জপতে জপতে হাঁটা লাগিয়েছিল নয়না।

না। ওদের দেখা হয়নি। বিশুর ফাঁপা অধিকারবোধ মিইয়ে গেছিল।

নিতাই আজ অবধি টিপ ফসকায়নি।

Advertisements