সমান্তরাল বিশ্ব। যেখানে একাত্তরটা সিগনাল টপকে সময়ের আগেই হাজির হোস তুই। মা কালীর মতন জিভ কেটে অটোকাকু কে ভাড়া দিতে দিতে বলতে হয় না “বিশ্বাস কর, ঠিক সময়েই বেরিয়েছিলাম।” সমান্তরাল বিশ্ব। যেখানে তুই আমার থেকে ভালো রাস্তা চিনিস। “সুনিয়ে, ও যো ইউনিভার্সিটিকে বগল সে যো রাস্তা হ্যায় না, উসিকো পাকড়িয়ে। উসি সে জলদি হোতা হ্যায়।” কালো হলুদ ফিয়াট পদ্মিনী চলে সে শহরে। উর্দি পরা ডেরাইভার ব্যাঁকা রাস্তায় নিয়ে চলে গন্তব্যে। তুই কি কেবল চেনার ভান করিস?

সে শহরে একটা পাহাড় আছে। তোর গল্প মোতাবেক তোদের কোনও নিঃসঙ্গ বারান্দা থেকে তার গায়ে মেখে থাকা টুনি বাল্বের মত আলো দেখা যায়। তার চাঁদির উপর দিয়ে সুরুৎ করে অন্তর্হিত হওয়া পেলেন দেখে তোর আমায় পেতে ইচ্ছে করে। সব মিথ্যে। মন ভোলানো। বিশ্বাস করি না। আজগুবি। আষাঢ়ে। ভাল্লাগে না তোকে।

সেই পাহাড়টা অলীক। মরীচিকাসম। কাছে গেলে মিলিয়ে যেতে থাকে। অজস্র রাধাচূড়ার আড়ালে অদৃশ্য হয় ক্রমশ। তোর মনে আছে, বন্দর থেকে অনেকখানি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভুরু কুঁচকে (যেন আজন্ম আছিস এই শহরে) বলেছিলি অটোওলা কে। নিয়ে চলো সেখানে। চলো। তোমায় চিনতে হবে না। তুমি সারথি। নেভিগেটর আমি। ভাড়া বেশি নিলে এক কানের গোড়ায়…

উল্টানো বালতির উপর টপটপ করে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। রাস্তায় ঠিকরে পড়ছিল ট্রাফিকের আলো। ফুটপাথে ছ্যারছ্যার করে জল ছিটিয়ে মাভৈঃ রবে এগোচ্ছিল অটো। শ্যাওলাভরা উঠোনে পিছলে এগোচ্ছিল চাকা। আমায় ফেলে উধাও হয়ে গেছিলি তারপর। আতিথেয়তার কি ছিরি!
সমান্তরাল বিশ্ব। অন্য ডায়মেনশন। যেখানে তোকে একলা পাবার কথা। পেলাম? পেলাম তোকে? উঁহু! রাজ্যের অমানুষ এসে ভাগ বসাবে। এদিকে টাইম মেশিন টকটকাচ্ছে। সারাদিন ধরে বিস্তর বাচালপনা। টেনে ধরলেই “এক্ষুণি কেউ এসে পড়বে।” এই জন্য জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম…? ভাল্লাগেনা তোকে।

আমায় রাখলি কোথায়? গোয়ালে। কানের কাছে জাবর কেটে যাচ্ছে বাছুরগুলো। গোটা ইস্কুলে শুনে আসা মাছের বাজারে। এরকম কথা ছিল, বল? মুখ ব্যাজার করা ছাড়া আর কী উপায় ছিল আমার? সমান্তরাল বিশ্ব থেকে ত্যাজ্য-বাসিন্দা হবার অনেক ভয়। প্রথম বিশ্বে তুই নেই। তাই বলে শুক্কুরবারের হাটে? কোথায় কোন খাদের গায়ে পা ঝুলিয়ে ভালোমন্দ চাট্টি কথা ছিল… কলকাতা এই জন্য ভাল্লাগে না। একটু একলা হবার যো নেই।

তারুপর গায়ে পরে শোলমাছটাকে পুকুরে ছেড়ে আসতেই হত? দিব্যি ধেড়ে ছেলে। একলা যেতে পারত না? যা বুঝছি, সমান্তরাল বিশ্বেও কেউ কারুর সুখ সহ্য করতে পারে না। একটু মাথা গোঁজবার ঠাই দিলে না কেউ মাইরি? পোর্টাল বন্ধ হয়ে গেলে যে আলোকবর্ষের ধাক্কা সেটা কেউ বোঝেনা?

ফেরার সময়, পদ্মিনী সাক্ষী, তুই ঘুমিয়ে পড়েছিলি। সাগরের জোলো হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছিল তোকে। উষ্ণতা খুঁজছিলি তুই আমার কাঁধে। আর আমি ছিলাম ঠাণ্ডা হয়ে। সারাটা দিন। অভিমানে। অভিযোগে। কাঁহাতক। রিয়ার ভিউ আয়নায় যা লাইভ টেলিকাস্ট দেখে ট্যাক্সিওলারা, অত আর কেউ না। গোল্লাগোল্লা চোখ করে দেখল, তোর কপালে চুমু খেলাম। শুভ জন্মদিন।

পা টিপে টিপে গোয়ালে পুনঃপ্রবেশ, ঢুলন্ত চৌকিদারের বুঁজন্ত চোখ এড়িয়ে। সমান্তরাল বিশ্ব। যেখানে তুইও আমাকে চাস। মাঝরাতের স্নান সেরে বেরোলি। কানের ডগায় ঘেঁটুফুল। ঘাড়ে পারিজাতের সুবাস। সমান্তরাল বিশ্ব। যেখানে একটাই চাদর দিয়েছেন ভগবান। এক চোখ অপরাধবোধের দাম মেটানোর মতন বড়লোক আমি নই। কোনও বিশ্বেই।

আয়।
সমান্তরাল বিশ্ব। যেখানে তুই আমার পাশবালিশ।

Advertisements