-তারপর?

-এটা তারপরের গল্প নয়। এটা-

-দাঁড়া। আগে বল এটা দীর্ঘশ্বাসের গল্প, নাকি শুনে বাড়ি ফিরে পাশবালিশ জড়িয়ে কাউকে ফোন করতে ইচ্ছে করবে?

-শেষ হয়নি তো।

-ধুর। যাই হোক। বল তারপর।

-ওই যে বললাম, এটা তারপরের গল্প নয়। ঘটনা আছে, ক্রম নেই। কোন এক বিন্দু থেকে শুরু হয়ে সরলরেখায় এগিয়ে যায়নি। পুঁতি পরানো সুতো নয়। হলুদ কৌটোয় রাখা জামা থেকে পড়ে যাওয়া বোতাম, হার থেকে খুলে আসা পুঁতি, দশ পয়সার কয়েন, সেফটিপিন, ক্লিপ, লুডোর ছক্কা, সব একসাথে কুড়িয়ে রাখা। হাত ঢুকিয়ে যেটা উঠছে, বলছি।

-বল।

-হুঁ। ওদের দেখা হল আবার। হঠাৎ নয়, আবার ঠিক দেড় বছর ধরে জমিয়ে রাখা “কবে আসবি রে” ও নয়। দুজনেই জানত দেখা হবে। হবে কারণ শহরটা এক। অথচ কেউ ই অন্যজনের সাথে দেখা করতে যায়নি সে শহরে। গেছেই যখন, “চল, একদিন দেখা করি।” সে শহরে গোরস্থান নেই, নেই ভিড়ধাক্কার বাজার, লেবু-চায়ের মাঠ। একটা টুকরো গোছানো কফি খাবার দোকান আছে। ছোট্ট। কাঠের গন্ধ। দেওয়ালে মনোরম হাতে আঁকা ছবি ঝোলে। কেতাদুরস্ত ওয়েটার নেই। কাউন্টারের মেয়েটাই পয়সা নেয়, কফি বানায়, পারলে এসে গল্প জুড়ে দেয় ওদের সাথে। তারপর “নাহ, তোমরা গ্যাঁজাও”, বলে উঠে একটা বই নিয়ে বসে। শেষ দুপুরে ভিড় শুরু হয়না। ঠিক সেই সময় ওরা আবিষ্কার করে ওরা একা। একসাথে। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা জন্মায়। তাতে একটু কষ্ট হয়। কথা জমে প্রচুর, প্রশ্নও। কিন্তু আজ ভাবতে হয়, বলা উচিৎ হবে কিনা। এক সময়, অন্য এক যুগে, বাথরুম ভাগ করে নিতেও দ্বিধা হত না। চুমুকের আওয়াজে সময় কাটে। দু’জনেই কথা বলে, নিজের সাথে। কথা সাজায়, আসলে। “কেমন আছিস” জিজ্ঞেস করতে বাঁধে, তাতে ইতিহাসকে, সময়কে অপমান করা হয়। “মোটা হয়েছিস” জাতীয় অপ্রাসঙ্গিক কিছু বললে নিজের অপ্রস্তুতির আড়াল সরে যায়। এমন নয় যে সেটা খুব সফল ভাবে গোপন করা যাচ্ছে, তবু। ভরসার কথা এই যে দুজনের একই অবস্থা। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। “তোর কথা মনে পড়ে। খুব। মাঝেমাঝেই।” বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বলা যায়না। বলা গেলে এতদিন বাদে হত না দেখা। অন্যতরফের হয়ত মনে পড়ে না। হয়ত কেন, পড়েই না নিশ্চয়ই মনে, নইলে একবারও কি… চোখ ভরে আসে। কফিশালার মালকিন পাতা উল্টে চলে। কিছু বলতে হবে।

-হুঁ।

-তখন একজন মুখ খোলে। নীরব কথোপকথন শেষ হয়। জানতে চায়, “তারপর?”

Advertisements