আমাদের বাড়িটা বেশ আগ্রাসী। কিন্তু টের পাবে না বাইরের কেউ। আগ্রাসনটা লুকোনো। প্যাসিভ আগ্রেসিভ বলে না? ওই। এই ধর বাইরের লোহার গেটটা খোলার আওয়াজ হল, মা বলল, “কে এল রে, দ্যাখ তো?” কেউ আসেনি। পাশের সমরকাকুদের বাড়ির গেট খুলেছে। চোদ্দবার খোলে, তবু খালি মনে হয় আমাদেরই গেট। আগ্রাসন নয়? অধিগ্রহণের ইচ্ছে নয়? নিজের গেট তো আছে বাপু, তবু অন্যের গেটের দিকে নজর কেন? লোহারগেট কেলেঙ্কারি। 

 

তারপর আবার টেনেও আনে। উপরতলার কলিংবেলটা সদাদৃশ্যমান, কিন্তু ওতে যেন কারুর হাত দেওয়া মানা। রোববার সকালে নিমতেতো মুখে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যনীতি পড়ছি, বড় আগ্রাসন আগ্রাসন ভাব, আগ্রার আসন ছেড়ে ব্যাটা কোওন দক্ষিণে…, যাক গে, বাবা বারান্দার দিকের জানালাটার পর্দা তুলে (দিনের বেলা আলো জ্বালা মানা) রবিবাসরীয়তে বুক রিভিউ পড়ছে, রান্নাঘরে গরম তেলে কালোজিরের ছ্যাঁকছ্যাঁক, এমন সময় কেউ একটা কলিং। বেল পাকলে কাকের কী, কিন্তু কলিং বেল পাকলে আমার পোয়াবারো, ক্ষণিকের বিরতি। বারান্দার গ্রিল থেকে মুণ্ডু বের করে দেখি কে একটা বেশ আকাশ পানে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিরাশ হই। উপরে কারুর সাথে দরকার। বিরসবদনে বলি “ওপাশের বেলটা। দরজার ওপাশের।” আমাদের ঘন্টি কেউ বাজায় না, সোজা এসে গ্রিলে খটাখট করে, “রিমিঝিম আছ নাকি?” বুলু কাকিমা। যাচ্ছেতাই।

 

দোতলার বারান্দায় ফোকলা ঠাম্মা আর কার্নিশে কানা বিড়ালটা বসে থাকে। কাজের মধ্যে হাই তোলা। ডন বিট্টু কর্মকার ঢিল ছোঁড়ে তার নিরবয়ব শ্রেণীশত্রুর দিকে। তার গতর নেই বলে তাক করতে সুবিধে, প্রত্যেকটাই লক্ষ্যভেদ করে। মানিক সাহা তার হুমদো ট্রাক থেকে স্টোনচিপস নামানোর তদারকি করে। নর্দমায় পড়ে যাওয়া বলটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা টাকলা ছেলে। কালি মেখে হাতে স্ক্রুড্রাইভার নিয়ে পিছনে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খায় সাইকেলমাস্টার সুকু। মিস্তিরিপাড়ার মসজিদের সামনে উঁকি মারতে মারতে এগোই, মা ফোন করলে কেটে দি, এসেই গেছি তো। 

 

আমি আসিনি, দোতলা ফ্যাকাশে হলুদ বাড়িটা বাড়তে বাড়তে রিচার্জের দোকান অবধি এসে ঠেকেছে। কোনদিন আতলান্ত পুকুর পার করে ফেলবে। বড্ড আগ্রাসী। 
Advertisements