শুনতে পাচ্ছেন? অবিনাশবাবু? শুনতে পাচ্ছেন? এই যে এই দিকে দেখুন, আমি কী বলছি বুঝতে পারছেন? মাথা নাড়ুন, বুঝতে পেরে থাকলে মাথা নাড়ুন। আপনার কোনখানে যন্ত্রণাটা হচ্ছে বলতে পারবেন? অবিনাশবাবু? আঙুল নিয়ে দিয়ে দেখালেও হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে অবিনাশবাবু, শুধু আপনাকে বলতে হবে ব্যথাটা কোথায়? মাথার পিছনে? বুকের বাঁ দিকে? তলপেটে? পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছেন? রক্ত তো দেখছি না। বিষক্রিয়া? আপনি কি…? অবিনাশবাবু, আপনি কি…? অবিনাশবাবু?
আপনার ঠোঁট নড়ছে, দেখতে পাচ্ছি। কী বলছেন বুঝতে পারছি না অবশ্য। কেমন তরঙ্গের মত তিরতির কাঁপছে আপনার গলা। দুটো বাঁশি একসাথে বাজতে শুনেছেন কখনও? যখন একই স্বরে দু’টোই স্থির হয়, অনুরণন হয়। কাঁপে তিরতির করে। সেইরকম। কীসের সঙ্গে হচ্ছে বলুন তো? অনুনাদ, রেজোন্যান্স, কীসের সাথে? না, আমার কোনও ব্যথা নেই। কোনও যন্ত্রণা নেই। বিকেলবেলাতেও চড়া রোদ হত ওখানে, জানেন, বালির উপর বসে থাকতাম। কাছেই বন্দর ছিল তো, জাহাজ যেত অনেক। রোজ গিয়ে বসলে, চারখানা কম করে দেখাই যেত। ছোট বড়। এত জাহাজ, একটা খুব মনে পড়ে। দিগন্তের ওইপারে ছিল জাহাজটা, ছোট্ট, বিন্দু। মেঘের মত ধোঁয়া, ধোঁয়ার মত মেঘ। চলে যাচ্ছিল জাহাজটা, ধোঁয়াটুকু রেখে। না না ব্যথা নেই কোনও। জ্বরটর হয়নি। ছোটবেলায় হয়েছিল একবার। বিছানাটা বনবন করে ঘুরছিল মনে হত। তখনও ছায়াগুলো ঝুঁকে পড়ত আমার উপর। এখন যেমন। হাতগুলো মনে হত বেলুনের মত ফুলে গেছে। হাল্কা। ভীষণ হাল্কা। গোটা শরীরটা। এখন সেরকমই আবার মনে হচ্ছে জানেন। ঘোর। হাল্কা। আপনি বুঝবেন না, আপনাকে বোঝাতে পারব না। না। ব্যথা নেই কোনও, আর কোনও যন্ত্রণা নেই। আজকাল অবশ হয়ে গেছে, তাতেই আরাম লাগে…
শুনুন, অবিনাশবাবু, আপনার রক্ত নিতে হবে। একটা ছুঁচ ঢুকবে, সামান্য লাগবে। কিন্তু একটু অসুস্থ বোধ করতে পারেন, তবে আখেরে আপনার ভালোই হবে। বলছি দাঁড়াতে পারবেন উঠে? নিদেনপক্ষে বসতে? এইত্তো। এইত্তো শাবাস! ওষুধ ধরেছে। এইবার আস্তে আস্তে বল ফিরে পাবেন শরীরে, এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দিলে চলে? কত্ত কাজ বাকি আপনার! এত তাড়াতাড়ি থোড়াই আপনি ছুটি পাবেন! এখনও দাবী মেটানো বাকি কত, কত কাউকে নিরাশ করা বাকি…
সেই জাহাজটাকে দেখতেই পাইনি। ধোঁয়াটুকু দেখেছিলাম। আরও একটা কিছু দেখেছিলাম। বা দেখিনি, জাহাজটার মত। চোখের কোনা দিয়ে দেখেছিলাম। অথবা দেখিনি, দেখতে পাইনি। মানুষের দৃষ্টির ব্যাপ্তি একশো আশি ডিগ্রীর থেকে কম। তাই চোখের কোণা দিয়ে। কিছু একটা, ফস্কে গেল। ফিরে তাকালাম, কিন্তু ততক্ষণে…। কী ছিল বলুন তো? কোনোদিনও জানতে পারব না, না? অনুরণনটুকু টের পেয়েছিলাম। ষষ্ঠ সপ্তম ত্রয়োদশ নিযুততম ইন্দ্রিয় বলছিল তাকাও, নইলে কী হারালে জানবেও না। মুহূর্তের দেরী হয়েছিল, ঘুরে তাকালাম, গায়েব। কী যে ছিল, কী যে ছিল… ছোট ছিলাম তখনও, বালক। আর নেই। স্বপ্নটা আর নেই। জ্বরটা আর নেই। ব্যথাটা আর নেই। আজকাল অবশ হয়ে গেছে, তাতেই আরাম লাগে…
Advertisements