পৃথিবীটা একেবারে শব্দহীন হয়ে গেলে অস্বস্তি হয়। ভয় লাগে। প্রথমে মনে হয় কান খারাপ হয়ে গেছে। মনে হয় চোখে কম দেখছি, আরেকটা ইন্দ্রিয় ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। হাত পা অসাড় হয়ে আসতে থাকে। গলা থেকে আর্তনাদটাও বের হয় না ঠিক মত। কিন্তু হয়। প্রথমটা ভাঙা। ছেঁড়া। পরেরটা দ্বিগুণ জোরে, স্পষ্ট, তার কম্পন টের পাওয়া যায়। কানের পর্দায় সেই তরঙ্গ আঘাত করে। স্বস্তি ফেরে। শোনা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে। ঢোঁক গিললে কথাও বলা যাচ্ছে দিব্যি। নৈঃশব্দকে খুব ভয় অঞ্জনের। তাই কাঁচি ঘষার এই একটানা বিরক্তিকর আওয়াজটা নিয়ে তার অভিযোগ নেই। 
 
সে আওয়াজ থেমে যায়। হঠাৎ। অঞ্জন চোখ খুলেই স্থির হয়ে যায়। কাঁচিটা চোখের বড্ড কাছে। বড্ড কাছে। হাঁ করে আছে। গিলে খেতে চায়। কাঁচির ভিতরের আঙুলদুটোয় বড় নখ, ময়লা। কাঁচি আর তার হাতের উপর থেকে নজর সরায় অঞ্জন, মোটেই স্বস্তি পায় না। মুখটা নেমে আসছে। মুখটা নেমে আসছে তার মুখের উপর। সেই নেমে আসা মুখের পিছনে একটা বড় উজ্জ্বল আলো, তাই মুখটা একটা অবয়ব ছাড়া কিছু নয়। গরম নিঃশ্বাস ছুঁচ্ছে অঞ্জনকে। অঞ্জন গন্ধ পাচ্ছে। পানমশলা। মদ। আরও কিছু। চেনা কিছু। বাসি কিছু। অঞ্জনের নেশা লাগছে। তিন আঙুল দূরে থামে মুখটা। অঞ্জনের শরীরে ঘাম বইতে থাকে। হৃদস্পন্দন যে বাড়ছে, সেটা বুঝতে নাড়ি টিপতে হবে না। অঞ্জনের দৃষ্টি নিথর, ঠোঁটের উপর। অঞ্জন তার গালে, মাথায় স্পর্শ অনুভব করে। সম্ভাবনাময় স্পর্শ। তার চোখে বিস্ফোরণ হবে। হবে। ঠোঁটটা নামছে। অপ্রতিরোধ্য ঠোঁট। নির্মোঘ আকর্ষণ তার। তার ঠোঁট লক্ষ্য করেই, সন্দেহ নেই। বেচাল দেখলেই কাঁচি? চোখে? বেচাল অঞ্জন চায় না। সে চোখ বোঁজে। সে চোখ বুঁজে থরথর করে কাঁপে, প্রতীক্ষায়। নেমে আসার প্রতীক্ষায়।
আওয়াজটা চালু হয়। চমকে ফের চোখ খোলে অঞ্জন। স্যাণ্ডো গেঞ্জির বুকে কাঁচা পাকা লোম দেখতে পায় সে এবার। বিড়ির গন্ধ। অন্য চেনা গন্ধটা বিড়ির। শামসুর খুব নৈমিত্তিক, উদাসীন চালে অঞ্জনের চুল কেটে চলে। ঘাড়ে, কানে খুচরো চুলের সুড়সুড়ি টের পায় সে। সহসাই নিজের কাছে বড্ড নগ্ন হয়ে পড়ে অঞ্জন। এটা কী হল? বুক ধড়ফড়টা বলে দিচ্ছে ব্যাপারটা কল্পনা নয়। নয়। আরও যেটা তাকে খোঁচাচ্ছে, সেটা কী হতাশা? 
 
সময় চাই অঞ্জন, সময় চাই। ভালো করে ভাবো। তুমি নিজেকে সমর্পণ করে দিলে এক্ষুণি। 
না। না। না। ও জোর করছিল। 
করছিল না। তুমিও জানো। করছিল না। তুমি নিজের ইচ্ছের সম্মুখীন হতে ভয় পাচ্ছিলে, তাই ওকে দিয়ে জোর করিয়ে নিলে… 
 
“দাড়িটা রাখবে না উড়িয়ে দেবো?” 
 
চেয়ারে ছিটকে উঠে বসে অঞ্জন। শামসুরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে সে। 
 
“কী হল? সাপে কাটল নাকি?”
 
শামসুর কাঁচি ধোয়। নীরবে কুড়িটা টাকা আয়নার সামনের টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসে অঞ্জন। ভীষণ ভয়ে। 
Advertisements