“বাঙ্গালি হো?”
 
অনসূয়া, কী ভাগ্যিস আমি বাঙালি। এ শহরে দেরীতে ভোর হয়, আরও দেরীতে সন্ধে। চারখানা মোজা পরে ভবঘুরে একজন সেঁকিতেছে তাপ ফুটপাথে, ছেঁড়া কাগজের অনলে। শৈত্যপ্রবাহে নাসিকার জল তার গুম্ফে তুষারপাত করে। অনসূয়া, গুম্ফ মানে কি গোঁফ, নাকি গুহা? আমি বাঙালি বটে, কিন্তু তেমন লিখতে টিখতে পারি না। আর দস্তানা পরে কলম ধরাও বেজায় কঠিন। এ শহরে সকলে উষ্ণতা খোঁজে, উষ্ণতা অমিল। চিঠিতে কি সাধুভাষা লিখতে হয়? শুরুতে প্রিয়তমা জুড়ে দেওয়া উচিৎ ছিল? না, সেটা ভুল হত। 
 
অনসূয়া, আমার দু’টো ঢাউস ব্যাগ ট্যাক্সির ডিকিতে। আর কাগজপত্র সমেত পিঠের ব্যাগটা সাথে, ওইটে কাছছাড়া করি না, কোলে পিঠে নিয়ে ঘুরি। ট্যাক্সির সামনেই বসেছি, বেজায় বাজে বকে তোমার ট্যাক্সিওলা। এখন মিচকি হাসছে, লজ্জা লজ্জা মুখ করে। একটু আগে অবধি ধারাবিবরণী দিচ্ছিল, “ঐখানে বোমা পড়েছিল বিশ্বযুদ্ধের সময়, আর ওই সুরকির দেওয়ালে রোজ রাতে কেউ বা কারা এঁকে যায় কিছু, ভোরবেলা মুছে দেয় রাতজাগা দ্বারিকের দল।”  ট্যাক্সিওলা তোমার লোক মন্দ নয়, অনসূয়া, তোমার একখানা ছবি সেলোটেপ দিয়ে সাঁটা তার স্পিডোমিটারের উপর। তোমায় দেখতে ভালো। এ কথা সে জোর দিয়ে লিখতে বলেছে আমায়, তুমি ভুরু কুঁচকে তাকালে সে দেওয়ালে মাথা ঠোকে। তুমি নাকি বড় তাচ্ছিল্য কর তাকে, আমার কাছে নালিশ করেছে তোমার ট্যাক্সিওলা। তুমি ভারী বিদূষী, সে জানিয়েছে আমায়। তোমায় প্রসন্ন করতে বেশ উদগ্রীব সে। অনসূয়া, খুশি হও, সুখী হবে। 
 
আমার এখানে নেমে যাবার কথা। তোমার ট্যাক্সিওলা আমায় নামতে দিচ্ছে না, একখানা কাগজ কলম দিয়ে বলেছে তোমায় চিঠি লিখতে। আমি বললুম “তুমি হিন্দিতেই বল, আমি তর্জমা করে নেবো।” সে কথা সে শুনলে না। বলল “তুমি লেখ। আমার কথা লেখ। এই এত যে গল্প বললাম তোমায়?” তা ঠিক। অনেক কাহিনী তোমার সে শুনিয়েছে রাস্তা জুড়ে। তোমার বাবাটা ভীষণ পাজি আর তোমার ভাই আস্ত বিচ্ছু। সকালের চায়ে সর পড়া দেখতে তোমার ভালো লাগে। ও নাক খুঁটলে তোমার প্রবল আপত্তি, ও ঢেঁকুর তুললে তুমি কটমটিয়ে তাকাও। তুমি ওস্তাদের মত সিগারেট খাও, আর আনাড়ির মত রাস্তা পেরোও। রুমি তোমার প্রিয়, আর রুমাল হারানো স্বভাব। তুমি নাকি উর্দুর মত বাংলা বল, সত্যি? 
 
তোমার ট্যাক্সিওলা ভালো আছে অনসূয়া। ফাঁকা রাস্তায় খোলা সিগনাল ভুলে দাঁড়িয়ে থেকে উদাস হয়ে বিজ্ঞ দার্শনিকের মত সে বলেছে “মন খারাপ আর খারাপ থাকার মধ্যে অনেক তফাৎ, বাঙালি, There’s a difference between being sad, and being unhappy.” ও হ্যাঁ, তোমার ট্যাক্সিওলা এখন ঝরঝরে ইংরেজি বলে, তাকে এ শহরের মানুষ ডাকে ক্যাবি বলে। উন্নাসিকের মত সে বলেছে “কলকাতা একটা মোটামুটি শহর।” আমার তাতে রাগ হয়েছে অল্প। জানি, তোমারও হবে। তবে তোমার ট্যাক্সিওলা এখন ভালো আছে। ব্যাঙ্কে আর তোষকের তলায় সে জমাচ্ছে অল্পবিস্তর, অন্য কারুর ট্যাক্সিওলা তাকে জন ডেনভার শুনতে শিখিয়েছে। তার পাশের বাড়ির দোতলায় একটি মিষ্টি মেক্সিকান মেয়ে থাকে, সে কথা তোমায় বলতে মানা, তাকে তোমার ট্যাক্সিওলা আড়চোখে দেখে। তুমি শুনলে হাসবে, জানি, কিন্তু ক্যাবি ভায়া তোমায় একটু ভয় ও পায়। 
 
ছেলেটা এখন ডিকি থেকে মালপত্তর নামাচ্ছে। ভেবেছিলাম ভাড়াটা সে নেবে না আমার থেকে, কিন্তু সে বেলা তার কবিত্ব মাথায়। তাকে টিপস দেবো না। বাজে ছেলে। 
 
ভালো থেকো অনসূয়া। 
Advertisements