কাঠের ঘরে একটা বাদামি আভা থাকে। ঘুণের গন্ধ থাকে। বেলা বাড়লে বাদামিটা চড়া হয়ে হলদে হয়ে যায়। সন্ধের মুখে খয়েরি। কিন্তু এই সময়টা, এই ভোরবেলাটা আপাতত বাদামির জন্য। জানালা দু’টো এই ঘরে। এই দোতলার ঘরে। পূবমুখী দুটোই। তাতে গাঢ় খয়েরি পর্দা। নাকি বেগুনি? কোনদিন খেয়াল করে দেখা হয়নি। তাদের ভেদ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না সদ্যজাত আলোর। ফাঁকফোকর গলে লুকিয়ে চুরিয়ে ধারা বেয়ে তারা ঢোকে, তাদের মধ্যে একটা নিষিদ্ধ আনন্দের চোরা উত্তেজনা। সেই আলোর ধারায় ধুলোর গুঁড়ো ব্রাউনিয় সূত্রে কিলবিল করে। 
 
সেই ঘরে একটি দরজা, দক্ষিণে। সেই দোরগোড়ায় একটা চামড়ার ব্যাগ। আর খিলানে হেলান দেওয়া একটা লোক। তার কালো জুতোর ফিতেটা সমান করে বাঁধা, জামাটা পটু হাতে গোঁজা পাতলুনে। তার চোখে অনিচ্ছা। তার স্নান করা চুল সময় নিয়ে আঁচড়ানো। তার নিশ্বাসে অনীহা। অথচ সময় হয়েছে। সময় হয়। হতেই হয়। জানা কথা। তবু হয়ে গেলে আশাহত লাগে। লোকটা নির্নিমেষে অগোছালো বিছানাটার দিকে তাকিয়ে আর দু’মিনিট সময় ভিক্ষা করে, সময়ের কাছে। সময় বড় ক্রূর। 
 
সেই বিছানায় কম্বল চাপা একটা উপুর হওয়া শরীর। তার হাতদুটো মাথার নীচে। তার পা দুটো কম্বলের বাইরে। উৎসুক আলোর দল সেই খোলা পায়ে হামলে পড়ে। তারা উরুতে নকশা কাটে, ছায়ার ছেনি-হাতুড়িতে পাথর কেটে ভাস্কর্য তৈরী করে। মূর্তি প্রস্তুত, কম্বলের আবরণে লুকোনো। উদ্বোধন করলেই সে চাদর সরে যাবে… এক দুটো বেহিসেবী আলো পথভুলে মুখে এসে পড়ে। বিরক্তিতে চোখ কুঁচকায় গান্ধারের ভাস্কর্য। এক গোছা চুল এলিয়ে পড়ে সে আলো আড়াল করে। এ মূর্তি লোকটা অনেকবার দেখেছে। কনে দেখা আলোয়, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে, সিঁদুরে মেঘে, ফ্যাটফ্যাটে রোদ্দুরে, কখনও অবাধ্য আলোগুলোর মত গোপনে। কিন্তু আজ সময় হয়েছে। 
 
সেই জানালার বাইরে নীচে একটা পাথরের রাস্তা। রাস্তার ওপারে বাতিস্তম্ভ ঘেঁষে একটা হলুদ ট্যাক্সি। তার অস্থির সারথি সেই স্তম্ভেই হেলান দিয়ে দিনের প্রথম সিগারেটটা ধরিয়েছে। সেই বাতি নেভানোর জাদুকরের ঘুম ভাঙেনি এখনও। আর একটু সময় দাও, সময়? ওই আলোটুকু নেভা অবধি? 
Advertisements