শেষ চেনটা সশব্দে টেনে বন্ধ করে কার্পেটে বসে পড়ল ফটিক।

বাইরেটা মেঘলা হয়ে আছে। রাস্তাঘাট ধুধু। একচিলতে বারান্দার রেলিঙের উপর একটা কার্ডিনাল কার যেন অপেক্ষা করছে। সময় হয়ে গেছে। একটা অদৃশ্য ক্যালেন্ডারে লালকালি দিয়ে গোল করা তারিখ, এসে গেছে। এসে যে গেছে, এইটাই ধন্ধে ফেলেছে ফটিককে। আসবার কথা ছিল না, এমনটা নয়, বরং কদ্দিনে আসবে, সেই প্রতীক্ষায় ফটিক নাওয়া খাওয়া ভুলেছিল। ভুল বুঝবেন না, আমি জানি ফটিক সুযোগ পেলেই নাওয়াটা ভুলে যায়, কিন্তু খাওয়া ভোলার পাত্তর সে নয়। কিন্তু এরকম দূর থেকে আলো দেখতে পাওয়া, ভোঁ শুনতে পাওয়া, গোদা মেলট্রেনের ইঞ্জিনের মত দিনটা যে এসেই পড়বে, বাবা এসে বলবে “প্ল্যাটফর্মে দিয়ে দিয়েছে, ব্যাগগুলো কাঁধে তোল ফটকে, কিছু ফেলে যাসনি, আর তাড়াহুড়ো করিসনে…” সেইটা কেমন বোধগম্য হচ্ছে না ফটিকের। আহ! আপনারা বুঝছেন না ব্যাপারটা। বলছি তো ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত ছিল না! রীতিমত আকাঙ্খিত! এই দিনটার আগমণ অটল, অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য এবং ভীষণ স্বাগত। তবু…

স্কুলে ইনফাইনাইট সিরিজ পড়েছিল ফটিক। অসীম সূত্র। হিসেব অনুযায়ী এক দৌড়বীর কিছুতেই শেষের ফিতে ছুঁতে পারবে না। পারবে কী করে? পুরো দূরত্ব দৌড়বার আগে তাকে অর্ধেকটা অতিক্রম করতে হবে যে! তারও আগে এক চতুর্থাংশ! এইভাবে চলতেই থাকবে যে, শেষ হবে কেমন করে? শুরুই হওয়া দুষ্কর। কিন্তু শুরুও হয়, হয় শেষ ও। যে কোনও সান্ত অধ্যায়কে সীমাহীন পরিচ্ছেদে বিভাজন করা যায়, তবু তাদের যোগফল সসীম থাকে বইকি। মানতে কষ্ট হয়? ফটিকেরও হচ্ছে। অপেক্ষাটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল তার। প্রাত্যহিকির অংশ। ঘুমোতে যাবার আগে দিন গুনে নিত, সকালে উঠে মনে হত, আরিব্বাস, আরেকটা দিন কমল মনে হচ্ছে যেন? তাই আজ দিনের অনেকটা ফাঁকা। শেষ ব্যাগের শেষ চেনটাও টানা হয়ে গিয়েছে।

ফটিক উঠে দাঁড়াল। ফটিক বাড়ি ফিরবে।

Advertisements