(১)
ছেলেটাকে এক নজর দেখলেই পড়ে ফেলা যায়।

ছেলেটা আপাততঃ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে জুলজুল করে ভুবন কেবিনের দিকে তাকিয়ে আছে। বড্ড সাধারণ। বাড়াবাড়ি রকমের সাধারণ, আর নিজেকে অদৃশ্য করবার চেষ্টাটাও পরিষ্কার। ওর থেকে নজর ফেরালেই ওর চেহারা ভুলে যাওয়া যায়। পোশাকে বাহুল্য নেই, পারিপাট্য আছে। চুল পেতে আঁচড়ানো। আকাশি নীল হাফ শার্ট, বুকের প্রথম বোতামটা বাকি গুলোর থেকে আলাদা, আসলটা খুলে পড়ে গিয়েছিল বোধহয়। ইস্কুল ইউনিফর্মের মত ছাইরঙা প্যান্ট, বকলস দেওয়া চপ্পল। আর চোখে একটা আকুতি। ছেলেটাকে এক নজর দেখলেই পড়ে ফেলা যায়। বেচারির খিদে পেয়েছে নিশ্চয় খুব, কিন্তু পয়সা নেই, নেই মুখ ফুটে খাবার চাইবার সাহসও। না, ছেলেটা ভীতু নয়, আত্মাভিমানী। আর ক্ষুধার্ত।

ভুবনবাবু চৌকো টেবিলটা নিয়ে দোকানের বাইরেই বসেন, ক্যাশিয়ার রাখার প্রয়োজন নেই, এখনও অত বয়স তার হয়নি। বিকেল চারটের মজুরদের ভিড়টা কমেছে। পিছনেই ফ্ল্যাট উঠছে একটা, চারটের সময় বিরতি নিয়ে খেতে আসে মজুররা। সিমেন্ট, বিড়ি আর সদ্যস্নাত শ্রমিকদের সস্তা সাবানের গন্ধ মেশে রসুন আর পেঁয়াজ কষার গন্ধে। সদ্যস্নাত বললেই কেমন একটা ভিজে আঁচল জড়ানো, গালে ভিজে চুল লেপ্টে থাকা রমণীয় মুখ মনে পড়ে। কিন্তু আপাতত মুশকো কালো হাত ধুয়ে শেষ মজুরটিও বেরিয়ে গেল, কর্মচারীগুলো বাসন গুছোচ্ছে। ভুবনবাবু ভিতরে ঢুকে ডেচকির তলা কাঁচিয়ে ভাত তুললেন স্টিলের থালায়। হাঁড়ি কাত করে এক হাতা ডাল উদ্ধার হল। একটা কাঁচা পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা থালায় তুলে বাইরে এসে ছেলেটার দিকে তাকালেন। ছেলেটা বোঝেনি, ভুবনবাবু এতক্ষণ পড়ছিলেন তাকে। জড়োসড় পায়ে এগিয়ে গেল সে, থালাটা নিয়ে বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। “ডিম আছে কিনা দেখছি” বলে ফের ভিতরে ঢুকলেন ভুবনবাবু। অর্ধেক ভাতটা ডালে মেখে শান্ত ভাবে খেতে শুরু করল ছেলেটা।

(২)

সামনের চাকার টায়ারটা ল্যাতপ্যাত করছে। ফুটো হয়েছে কোথাও। আবার। চেপে বসলে পিছনেরটাও ডেবে যাচ্ছে। বিশুর মন খারাপ হয়ে গেল। সাইকেলটা রেললাইনের পাশে পাথরকুচির উপর ফেলে দিয়ে সিগনাল পোস্টে হেলান দিয়ে বসে পড়ল সে। দিনটা কিছুতেই ভালো যাচ্ছে না। সকালে বাবার থেকে হাতখরচা নেবার সময় অসহ্য দিদি নামের মেয়েটা “বাবা, ওকে অর্ধেক জলপানি দাও, অটোতে ওর হাফ ভাড়া লাগে” বলেছে। রাগ করে বেরিয়ে এসেছিল বিশু। ওই হাতখরচা থেকেই রাহা খরচা চলে। অতএব আজ সাইকেল। শুধু তাই? স্টেশনের মোড়ে ঝিমলির দিদি ঝিমলির সামনেই রিকশা থেকে “অ্যাই বিশ্বম্ভর, আস্তে সাইকেল চালা” বলে ডেকেছে। দিদি জিনিসটাই দু’চক্ষে দেখতে পারে না বিশু। ওর নাম বিশ্বম্ভর নয়। বৈশাখ। বিশ্বম্ভর দাদুদের নাম হয়। বিশু উত্তর না দিয়ে শুনতে না পাবার ভান করে বেরিয়ে গেছে।

তারউপর ইস্কুল থেকে একপ্রকার তাড়িয়েই দিয়েছে তাকে। দৈনিক জাগরণের ভিতর শুক্কুরবারের সিনেমা-স্পেশাল ছিল একটা। তাইতে একটা মেয়ে খুব বিপজ্জনক ভাবে তোয়ালে জড়িয়ে আরও বিপজ্জনক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল। টিচার্স রুমের বাইরেই চায়ের কেটলি আর চক রাখার টেবিলের উপর আলগোছে পড়ে ছিল কাগজটা। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, ছবিটা দেখবার বেশ একটু ইচ্ছেও ছিল বিশুর, ডার্বির খতিয়ান নেবার অছিলায় বারদুয়েক দেখেওছিল আড়চোখে। ঘুঘুটুকুই দেখেছিল বিশু, ফাঁদটা চোখে পড়েনি। দেবাশিষ স্যার কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে হেডুর কাছে জমা দিয়ে দিল। আশ্চর্য! খবরের কাগজ-ই ছিল তো! হেডু চশমাটা ফিল্মি কায়দায় খুলে তিরিশ ভাগ জ্ঞান আর সত্তর ভাগ অপমান করে বললেন বাবাকে নিয়ে না এলে ইস্কুলে ঢোকা বন্ধ। আফশোষ হচ্ছিল বিশুর। ধরাই যদি পড়বি, তো ভালো করে দু’চোখ ভরে দেখে নিতিস! কিংবা আরও ভালো কিছু… গোটা ইস্কুল জেনে যাবে এবার। ঈশ! ঝিমলি ও!

সূর্য ডুবি ডুবি। আজ কিছুতেই মন্মথ স্যারের কোচিং এ যাওয়া যাবে না। বাড়ি ফেরার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই আর। সবাই বলবে বখা ছেলে। অথচ ভালো করে বখাই হল না এখনও। বদনামটাই হবে, আর মজাগুলো হবে না কিছু। বখাটেরা কী কী করে, ভাবতে লাগল বিশু, রেললাইনের দিকে পিছন করে সিগনালের পাশের ঝোপে হিসি করতে করতে। সিগারেট খায়। মদ খায়। দেরি করে বাড়ি ফেরে। কলেজে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। কাকা সিগারেট খায়, তাতেই গন্ধে নাক সিঁটকোয় ওর, তাহলে মদে না জানি… আর কলেজে পৌঁছতে ঢের দেরি। প্যান্টের চেন আটকে ঘুরে দাঁড়াল বিশু, হাজার মাইল লম্বা মালগাড়িটা সিগনাল খেয়ে দাঁড়িয়েই আছে। সাইকেলটার গায়ে হাত বুলিয়ে বৈশাখ ব্যানার্জি জং ধরা সিঁড়ি বেয়ে মালগাড়িটার একটা খোলা দরজার ভিতর সেঁধিয়ে পড়ল। হ্যাঁচকা টান মেরে নড়ে উঠল দানবটা। সমস্ত মন খারাপ কেটে গেল বিশুর। ও এখন জংধরা এক্সপ্রেসে চড়ে বখে যাবে।

(৩)

একটা জামবাটিতে অল্প জলে ভেজানো ছিল চার পাঁচটা তালপাতার রিড। পাত্তুর বলে ওগুলোকে। খুদে ফানেলের মত আকার। তার-ই একটা তুলে  মুখে পুরে খানিক চুষে হাতে বের করে নেড়েচেড়ে দেখল কার্তিক। তারপর টুক করে পেতলের নলটার সরু দিকটায় জামার মত পড়িয়ে দিল। নলের মোটা গোড়াটায় সাদা সুতো জড়িয়ে আরেকটু মোটা করে কাঠের নলটার সরু দিকটার মধ্যে গুঁজে দিল। কাঠের নলটার মোটা দিকটায় একটা পিতলের চোঙা মত জিনিস আঁটল তারপর। মন দিয়ে যন্ত্রটাকে খানিক দেখল কার্তিক। তারপর তালপাতার পাত্তুরটা মুখে দিয়ে ফুঁ দিল। গমগম করে উঠল সানাইটা।

মোটে শুদ্ধ আওয়াজটুকু বের করতেই বড্ড দম লাগে। আর গায়ের জোরে ফুঁ দিলেও হয় না, সে ফুঁ বশে আনতে হয়। আঙুলের হেরফের না করেই সপ্তক বদলে যায়, বদলায় স্বর। বড় সর্বনেশে জিনিস সানাই। বাঁশির চাইতেও সাঙ্ঘাতিক!  স্বরগুলো এখনও  ঠিকমত আয়ত্তে আনতে পারে না কার্তিক, দমছুট হয়ে গেলেই সুর নড়ে যায়। তবু চেষ্টা করে। আজও করছিল। উন্নতি হচ্ছে। মন দিয়ে উঠল, নামল পুরিয়া ধানেশ্রীর মই ধরে, পাল্টা বাজালো খানিক, আলাপ জমালো। ঘরে বসে বাজাতে পারে না, ঝালা ধরলে বাড়ির লোকেই তেড়ে আসে, পালাতে হয়। তাই এখন আগা সাহেবদের গোরস্থানে এসে গোধূলিতে সানাই বাজাচ্ছে কার্তিক। রিষভটা বড় শক্ত, মোটে কোমল হতে চায় না। খানিক বাজিয়ে হাঁফ ধরে যায় কার্তিকের। বড় সাঙ্ঘাতিক।

মসজিদটা পরিত্যক্ত। এই গোরস্থানটাও আর ব্যবহার হয় না। হয় না, তার প্রায় শতক পেরিয়ে গেছে। পশ্চিম পুটিয়ারিতে নতুন মসজিদ হয়েছে, তার-ই বয়স আশির উপর। গোটা বসতিটাই একটু একটু করে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে, ঢঙী নদীর এপারটা মৃত্যুশয্যায়। উর্বরতা কমে এসেছে মাটির। বিষিয়ে দিয়েছে যেন কেউ মন্ত্রবলে, নইলে এক-ই নদীর এপার ওপার এত আলাদা রূপ? পশ্চিমপাড়েই সর্বসুখ, গ্রামের বৃদ্ধেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে। কার্তিকের কিন্তু খুব প্রিয় এই পূবেরহাট। গোটা গোরস্থানে সাঁঝের কুয়াশা ছড়ায়, কবরগুলো সেই কুয়াশা ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কার্তিক তানগুলো গুলিয়ে ফেলে। ঠোঁট উল্টে নলগুলো আলাদা করতে উদ্যত হয়।
“থেমে গেলে কেন? বেশ তো বাজাচ্ছিলে!”
চমকে পিছনে তাকায় কার্তিক। চমকটা লুকোনোর চেষ্টা করে। এক বৃদ্ধ মাত্র। লোলচর্ম এক বৃদ্ধ। সাদা ফতুয়া, সাদা ঢোলা পাজামা, অল্প সাদা দাড়ি, সাদা ফেজটুপি। কন্ঠার হাড়গুলো দৃশ্যমান। বড় নিরীহ চেহারা, তবু কার্তিকের একটু  অস্বস্তি হয়।
“দেরি হয়ে গেছে, দাদু। বাড়ি ফিরতে হবে…”
“বেশ। ফিরবে বাড়ি। তবে আবার এসো। এসো আবার।”

একটু চুপ থাকে কার্তিক, “আসব” বলে বিচ্ছিন্ন সানাই থলেতে পোরে, হাঁটা লাগায়। ভাঙা মসজিদ পেরোনোর আগে একবার পিছন ফিরে দেখে, বুড়ো দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনও। হাঁটা থামায় না কার্তিক, ঢঙীর গোড়ালি-জল পেরোয়। শান্তিনগরের সাঁকো বহু ঘুরপথ।

ওপারে পৌঁছনোর আগেই আজান শুনতে পায় কার্তিক। আর সেটা তার পিছন থেকে।

(৪)

অনেকদিন পড়ে থাকা গাড়ির কাঁচে জমা ধুলোয় যেমন উদ্দেশ্যহীন আঁকিবুঁকি কেটে যায় অনেকে, খানিকটা সেইরকম দেখতে লাগছিল থালাটা। এক দানা ভাতও আর বাকি নেই। কুসুমটা ভাতে ঝোলে মেখে ডিমটা কামড়ে খেয়েছে ছেলেটা। বড্ড খিদে ছিল বেচারার। নীল ড্রামটা থেকে মগে করে জল তুলে আঁচিয়ে নিল। পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল ভুবনবাবুর সামনে।

ছেলেটাকে দেখলে এক নজরেই পড়ে ফেলা যায়। ভুবনবাবুও পড়লেন। ভদ্রঘরের, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত ছেলে। শিক্ষিত। গ্রাজুয়েশনটা অবধি করেছে, আর্টস নিয়েই হয়ত। রূপনারায়ণপুরে নতুন। আনকোরা। বেকায়দায় পড়ে পয়সা টয়সা খুইয়েছে। কী কারণে এইখানে আসা? সেটা বাড়ি গিয়ে ভাববেন মনস্থির করলেন, কারণ ছেলেটা ইতিমধ্যে একটা পঞ্চাশ টাকার কুঁচকানো নোট বাড়িয়ে ধরেছে তার সামনে। ভুবনবাবু ভালোরকম বিস্মিত হলেন, ছেলেটাকে এক নজরে পড়ে ফেলাই যদি যাবে, তবে তার কাছে পঞ্চাশটাকা আসে কী করে? তার মানে তো সে হারিয়ে যায়নি। ভিতরের আহারে বেচারার বেলুনটা ফুস করে চুপসে গেল। এটা ঠিক করল না ছেলেটা। খেয়ে দেয়ে কেউ পয়সা দেয়? বিরসমুখে নোটটা নিয়ে সোজা করে পেতে ক্যাশবাক্সে ঢোকালেন ভুবনবাবু। নোট কুঁচকায় ছেলেটা, রীতিমত অভদ্র। বাকিটা ফেরত দিলেন ছেলেটার হাতে। সে না গুনেই পকেটে চালান করল নোট আর খুচরো। বেহিসেবি। মোটেই টানাটানির সংসার নয়।

 – এইবার ছেলেটাকে খুঁজতে কিছু লোক আসবে তো? তখন জানা যাবে সে কেউকেটা। বিস্ময়বালক।  বিজ্ঞানী টিজ্ঞানী।
 – হতেও পারে। হতেই পারে।
 – আপনার ই তো গল্প। 
 – আর সে গল্পের নায়ক এই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক? 
 – নয়? সে কি? ভুবনবাবু নাকি? এই তো, আপানারা লেখকরা ভাবেন যা খুশি তাই করতে পারেন। এতক্ষণ দিব্বি ফলস মারছিলেন!
 – আরে! সেটা বললাম কখন? আপনাকে শুধোলাম শুধু। আপনার কী মনে হয়?
 – না মশাই, এই নামহীন ছেলেটাকেই রাখুন। ভুবনবাবু চুলোয় যাক। 
 – বেশ। 

 – হ্যাঁ। এবার দুটো গুন্ডা টাইপের লোক আনুন তো দেখি। বেশ থ্রিলিং হবে!

ঝাঁপ বন্ধ করে, ক্যাশবাক্স থেকে দিনের থোক তুলে গেঁজেতে পুরে ভুবনবাবু সাহা স্টোর্সের সামনে দাঁড়ালেন। মানিক সাহা বাল্বগুলো জ্বেলে দোকানের সামনেটায় বোতল থেকে জল ছেটাচ্ছিল। ভুবনবাবু জানেন এইবার ও ঝাঁট দেবে। এতে রাস্তার ধুলো যায় না, যাবার কথাও নয়, কিন্তু এ একটা আচার-অভ্যেসের মতন ব্যাপার। ঝাঁট দিয়ে হাত ধুয়ে ভিতরে ঢুকে দাঁড়িপাল্লাটার সামনে দাঁড়াল মানিক। ভুবনবাবু ফর্দ বের করলেন। মাসকাবারি ঝুলিয়ে বাড়ি ঢুকলেন যখন, অতি সাধারণ ছেলেটার কথা আর তার মনে নেই।

(৫)

আধাঘন্টার মধ্যেই বিশু টের পেয়ে গেল যে বখে যাওয়া বেশ কঠিন কাজ। এই যেমন মালগাড়িটা একেবারেই আরামদায়ক কিছু নয়। আর চলেও ঢিমে তালে, রাজ্যের ট্রেনকে রাস্তা ছেড়ে। আর খিদে খিদেও পাচ্ছে। মালগাড়িতে মোটেই ঝালমুড়িওলা ওঠে না। বিষয়টা ভেবে দেখা উচিৎ ছিল, বিশুর খেয়াল পড়ল, আজ পকেট ঢুঁঢু, হাতখরচা নেওয়া হয়নি। তাই ঝালমুড়িওলা উঠলেও লাভ হত না বিশেষ। বিশু হাওয়া খেতে খেতে নিরুদ্দেশের পানে চলল।

এই নিরুদ্দেশ জায়গাটা বিশুর ছোট থেকেই খুব পছন্দের, কিন্তু কখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বলাই বাহুল্য, নিরুদ্দেশের ঠিকানা জানা থাকলে সেটা আর নিরুদ্দেশ থাকত না। পরিমল স্যার আইরনি বোঝাচ্ছিলেন সেদিন। বিশু কিন্তু পড়াশোনায় খারাপ নয়। আহামরি নয় ঠিক-ই, কিন্তু ফেল করে বাড়ি থেকে পালানোর মত সুযোগ ঘটে ওঠে নি। অতএব নিরুদ্দেশ অধরা। ভাবতে ভাবতে বেশ একটু পুলক জাগে বিশুর। এটাকে অ্যাডভেঞ্চারের পর্যায়ে ফেলা যায়? যায় বোধহয়। আচ্ছা, কতদূর যাওয়াটা ঠিক হবে? কখানা দেশ পেরোলে তাকে নিরুদ্দেশ বলা যায়? না, মানে নিরুদ্দেশ থেকে ফেরারও তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি? ফেরার কথা মনে পড়তেই আবার সোজা হয়ে বসল বিশু। কাছেপিঠের দেশে গেলে কার্যসিদ্ধি হবে না, মালগাড়িটা যতক্ষণ চলছে চলুক, থামলে দেখা যাবে। সেই জায়গাটা পছন্দ হয়ে গেলে বিশু তাকেই নিরুদ্দেশপুর নামকরণ করবেখন।

অন্ধকারে বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছে না আর। ঘটাং ঘটাং করে ঝাঁকুনি খাচ্ছে কামরাটা। কেমন একটা গরু গরু গন্ধ লোহার বাক্সটায়। শুধু খিদে হলেও হত। কিন্তু তেষ্টাটাও পেয়েছে। মাথার চিন্তাগুলোও ঝিমিয়ে আসছে। উবু হয়ে বসল বিশু, হাঁটুর উপর থুতনি রেখে বাইরের নিকষ আঁধারের দিকে তাকিয়ে রইল। অন্ধকার গাড়ির ভিতরেও। মাঝেমধ্যেই উল্টোদিক থেকে ঝড়ের বেগে এক্সপ্রেসগুলো নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তিন ঘন্টাও হয়নি এখনও, উত্তেজনাটা এর মধ্যেই মরে গিয়েছে, সময় কাটছে না। বিশু জানে ট্রেনটা কখনও থামবে। কোথাও একটা, থামবে ঠিক-ই। তারপর? পেটের খুব ভিতর থেকে একটা বুদ্বুদ ভেসে ওঠে। ফেটে যায়। “এটাকেই ভয় বলে, বিশু। বাবার কাছে মার খেতে হবে ভেবে যে বুদ্বুদ টা উঠত, সেটা কেবল আশঙ্কা। তুমি তো জানতে, বাবা কী করবে। দরজার ছিটকিনিটা তুলবে, হাত পাততে বলবে তোমায়। পালা করে দুই হাতের চেটোয় বড়জোর চারটে বেতের বাড়ি? তুমি ইঁদুরছানার মত লেজ গুটিয়ে আর করব না বাবা বললেই ছিটকিনি নেমে আসত। আজ হয়ত চারের জায়গায় দশটা পড়ত। আর কিছু বাক্যও। কিন্তু তোমার জানার বাইরে কিছুই ঘটত না হে। কিন্তু এইবার? ট্রেন থামার পর? ভেবে দেখ বিশু। কিচ্ছুটি জানোনা। কোথায় যাচ্ছ, সে জায়গা কেমন, কী খাবে, কোথায় থাকবে? এই যে জানো না, এই ব্যাপারটাকেই আসলে ভয় বলে।”

বিশু একটু, খুব অল্প একটু কেঁদে নিল। তারপর পৃথিবীজোড়া রাত্রির মধ্যে দৌড়তে থাকা একটা জংধরা মালগাড়ির ভিতর বৈশাখ ব্যানার্জী হাঁটুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

(৬)

কার্তিকের আর ঢঙী পেরনো হল না। পুবেরহাটের মসজিদের দিকে তাকিয়ে মাঝনদীতে স্বচ্ছ জলের উপর দাঁড়িয়ে রইল। আজানটা সমবেত কন্ঠের নয়। মাইক এ পাড়ে কোথায়? আর তাহলে এত স্পষ্ট ভেসে আসছে কেমন করে সুর? কার্তিক হাওয়া বুঝতে চেষ্টা করে। হ্যাঁ। পূব দিক থেকেই বইছে। তবু। তবু… আজান কার্তিক অনেক শুনেছে। তার শব্দগুলো সে জানে, সুর তো বটেই। পশ্চিম পুটিয়ারির আজান এত সূক্ষ্ম নয়। এতোও বিষাদ নেই তাতে। আর এই সুরে কথা নেই কোনও। একটু দোনোমনো করে মসজিদের দিকেই ফের হাঁটা লাগায় কার্তিক। এটা আজান নয়।

– ব্যাস। ঠিক জানতাম লোকটা ভূত। 
– কোন লোকটা?
– ওই তো! ফেজটুপি। আজান দিচ্ছিল। ভূত। জিন। 
– তাই বুঝি?
– তাই নয়?
– আমি তো জানিনা। অতটা লিখিনি তো এখনও।
– কিন্তু কিছু একটা ভেবে তো এগোচ্ছ।
– না। গল্পটা যেমন ভাবে যাবে…

– একী! শেষটা না ভেবে শুরু করে দিলে?

একটা ফলকে পিঠ দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে গাইছিল লোকটা। কার্তিক কে দেখেও থামলো না। শুকনো শরীর আর বয়স আন্দাজে গলায় জোর আছে। কার্তিক গিয়ে তার পায়ের কাছে বসল। হাঁটুর উপর মাথা রেখে। আলো বেশ কমে এসেছে, বৃদ্ধের মুখের রেখাগুলো আর পড়া যাচ্ছে না। কিন্তু গলার শিরাগুলো ফুলে উঠছে, সেটা বেশ বোঝা যায়। কার্তিক সম্মোহিতের মত শুনতে লাগল। এই রাগটা সে চেনে না। একটু আগের অস্বস্তিটা কেটে যেতে লাগল। যারা সত্যি সুর ভালোবাসে, তারা অন্যের ক্ষতি করতে পারে না, কাজী মাস্টার বলতেন। কাজী মাস্টারকে গাঁশুদ্ধু সবাই কাছিম মাস্টার বলত, প্যারালিসিস হবার পর অনেক সময় নিয়ে কথা বলতেন তিনি।

সুর কাটছে। কার্তিকের আনাড়ি কানও সেটা ধরতে পারছে। কাটছে বয়সের জন্য। আরোহণ অনায়াস নয়। তবু। তবু বিঁধছে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। কাশির দমক উঠল বৃদ্ধের। হাঁপ সামলাতে খানিক সময় গেল আরও।
কার্তিক প্রশ্ন করল “কী রাগ?”
কার্তিকের মাথায় হাত বুলিয়ে বুড়ো বলল “মারওয়া।” খানিক চুপ করে থেকে আবার মুখ খুলল সে। “বাড়ি যাও।”

কার্তিক বলল “না।”

(৭)

– বুঝেছি।
– কী?
– এইবার আস্তে আস্তে তিনটে গল্প জুড়বে, তাই তো? 
– হয়ত। হয়ত না। 
– আলবাৎ তাই। কার্তিক, বৈশাখ আর নীল জামা। শেষে গিয়ে দেখা যাবে এক-ই ধাঁধার অংশ। একটু হিন্ট দিয়ে দিতে পারতিস শুরুতে। 
– ধাঁধা কোথা থেকে এলো আবার? 
– আহ। বৃহত্তর ধাঁধা। বুঝলি না? একটা কিছু কানেকশন আছে তিনটে গল্পে। সেইটে অন্তে গিয়ে খোলসা হবে।
– যোগসূত্র থাকতেই হবে?
– না থাকলে হবে কেমন করে? এটা তো আর তিনটে আলাদা গল্প নয়! 
– হতে দোষ কী?
–  তারমানে? এটা তিনটে আলাদা গল্প? কিন্তু তাহলে নিশ্চয় একটা কমন থিম রয়েছে। তিনটে আলাদা গল্প ভিত্তি করে একটা বক্তব্যে পৌঁছোনর চেষ্টা। 

– তিনটেই? নিশ্চিৎ? 

 সুখেন নোট গুনছিল ইঞ্জিনের বনেটের উপর পা তুলে।

– এই! এক মিনিট। সুখেন আবার কে? নীলজামা? নতুন গল্প? চারটে গল্প? 

সুখেন নোট গুনছিল ইঞ্জিনের বনেটের উপর পা তুলে। সতেরো। সতেরোটা একশো টাকার নোট। ভাড়া নিরানব্বই। ১৭ টা এক টাকার কয়েন ফেরত দিতে হবে। হাইওয়ে তে উঠে গেছে বাস, আর স্টপ নেই, আর কেউ উঠছে, নামছে না আপাতত। সাড়ে তিন ঘন্টা এখনও। পেল্লায় উইন্ডস্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে সুখেন পানমশলার প্যাকেট খুলে অর্ধেকটা মুখে ঢেলে ড্রাইভার নান্টুর দিকে এগিয়ে দিল। প্রত্যাখ্যান করল নান্টু। “ক্যান্সার।” খুব এক চোট হেসে নিল সুখেন। পিছনের ট্রাকটার হেডলাইট আয়না হয়ে চোখে লাগছে। চোখ বন্ধ করে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দিল সে। এবার খেলার পালা। এই খেলাটা প্রতি ট্রিপে সুখেন খেলে নিজের সঙ্গে। খুব বেশি প্যাসেঞ্জার হয় না এই রুটে। সুবিধে। রোজ জেতা যায়। একটু আগে ঘুরে টিকিট কেটে এনেছে সবার থেকে। সতেরোটা। এবার এই সতেরোজন কে মনে করবার চেষ্টা করবে সে।

দুটো বাচ্চা আর বউকে নিয়ে গুঁফো লোকটা রয়েছে সামনের দিকেই। লোকটা বুঢঢা। বউটা সরেস। চোখ বন্ধ করেই হাসে সুখেন। ক্যান্সার। বউটা পুরো ক্যান্সার। বাচ্চা দুটোই ছেলে। হাফ ভাড়া। ওই দুটোকে একটা মানুষ হিসেবে গোনা যায়। খলবল করছে একজন, বড়টা জানালার বাইরে হাত বাড়াচ্ছিল বলে বাপের ধমক খেয়ে গোঁজ হয়ে বসে আছে। তাদের পিছনে দুটো ভাগে ছড়িয়ে আছে ছ’টা কলেজ ফেরতা ছেলে মেয়ে। চারটে ছেলে, দুটো মেয়ে। বাড়ি ফিরছে হোস্টেল থেকে। আজ শুক্কুরবার না? ভারী ভারী পিঠের ব্যাগ। ঘুরেফিরে এদের সাথে দেখা হয়েই যায়। মেয়েদুটো সব সময় একসাথে থাকে, ছেলেগুলোকেও আলাদা করে দেখেছে সুখেন। জানালার ধারের মেয়েটা একটু কালো, কিন্তু ডাগর। দু হপ্তা আগে রবিবার ডাউন ট্রিপে একটু হেসেছিল সুখেনের দিকে তাকিয়ে। ওইটুকুই। সুখেন ক্যাবলা ও নয় আশিক ও নয়।

আটজন বাকি। কেশো বুড়োটা। কিছুতেই ভাড়া দিতে চাইছিল না। এমন করে নমো ঠুকল যেন সে ভিক্ষা চাইছে। “হবে না বাপ, খুচরো নেই” মার্কা। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে আদায় করতে হল। ভুয়া মাল। বুড়োগুলোই ঝামেলাবাজ হয়, সুখেন দেখেছে। পৌনে পাঁচ ঘন্টার রাস্তা একশো টাকা হবে না? এখনও “একশো টাকায় আমরা মাস চালাতুম” ধরে বসে থাকলে হবে? যাকগে, তারপর আছে বাজারের থলেতে কেরোসিনের জার ওলা লোকটা। জামায় রঙের ছিটে। রঙ মিস্তিরি। বিড়ি ফোঁকে। ওর বাঁদিকের সিটে একজোড়া মুসলমান বর বউ আছে। বউটা বোরখা পড়েনি, কিন্তু মাথায় ওইরকম কাপড় ঢাকা। আর লোকটার চোখে সুরমা। বউ বাপের বাড়ি যাচ্ছে? যেতেই পারে। আরও চারজন বাকি।

নান্টু হর্ন দেয়। খিস্তি করে সামনের দুটো টেম্পোকে। সুখেনকে চোখ খুলতে হয়। বৃষ্টি  নামল কখন? সামনের কাঁচে ফোঁটা ফোঁটা জল জমে। ক্যাঁচক্যাঁচ করে খানিক ওয়াইপার চালিয়ে নেয় নান্টু। এই আওয়াজটা বিশ্রী লাগে সুখেনের। কিন্তু বৃষ্টি জোরে পড়ছে না। পড়ছেই না। খানিক আগে পড়ছিল হয়ত, মেঘ পেরিয়ে এসেছে তারা। সুখেন ফের চোখ বোঁজে। এই গরমেও ফুলহাতা জামা পড়া লোকটা। মোটার হদ্দ। পেটের বোতাম গুলো এঁটেছে কী করে কে জানে। পান চিবোচ্ছিল টিকিট কাটার সময়। মোটা মানিব্যাগ। পিছনের পকেটে রাখে বলে ডানদিকের পাছাটা উঁচু হয়ে থাকে। পনেরো নম্বর হল সানগ্লাস পরা লোকটা। সিটের উপর পা তুলে বসেছিল। হারামজাদা, ওর বাপের বাস তো! ষোল নম্বর। চব্বিশ ঘন্টা ফোন কানে ছেলেটা। এখনও বাতেলা শুনতে পাচ্ছে সুখেন। কাকে জমির দাম নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে। তখন কার একটা রোগের বিচার করছিল, টিকিট কাটার সময়। সবজান্তা কোথাকার। ব্যস।

হাতের নোট গুলো আবার করে গোনে সুখেন। হ্যাঁ। সতেরোটাই একশো টাকার নোট। একটা যাচ্ছেতাই ভাবে কুঁচকানো। সতেরো নম্বরটা কে? মাথা তোলপাড় করে সুখেন। কে বাদ পড়ে যাচ্ছে? বাসটা হাইওয়ে ছেড়ে বাসন্তীপুর বাইপাসে ঢোকে। বাতাসে সমুদ্রের নোনা গন্ধটা জোরালো হয়। নাহ। কেউ একটা বেশি টাকা দিয়ে দিয়েছে। ওই বাচ্চাগুলোর বাপ ই। হাফ টিকিট খেয়াল নেই হয়ত। ফেরত দেবে কিনা ভাবে একবার, তারপর উঠে দাঁড়ায়।

বাঁ চাকার ঠিক উপরের সিটটায় একটা নীল হাফশার্ট পড়া ছেলে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাসের ময়লা আলোয় তার মুখটা ঠিক দেখা যাচ্ছে না।

(৮)

একটা বিচ্ছিরি সকালে বিশুর ঘুম ভাঙল। মালগাড়ির দরজা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখল আকাশটা ময়লা হয়ে আছে। হাত বাড়ালে ভিজে কুয়াশা ছুঁতে পাওয়া যায়। আড়মোড়া ভাঙতেই গতরাতের খিদেটা ফিরে এল পেটে। গাড়িটা থেমে আছে। থম হয়ে বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকার পর একটা জিনিস টের পেল বিশু। কোথাও কোনও শব্দ নেই।

জংধরা মালগাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল বিশু। পাশের লাইনে আরেকটা ট্রেন। এটা ওই তেল বইবার ট্যাংকার। মুখ থেকে তেল চুঁইয়ে পড়ে কালো দাগ হয়ে গেছে। দুই কামরার মাঝখান দিয়ে দেখল বিশু, তার পাশের লাইনে আরেকটা। বিশু জংধরা সিঁড়ি বেয়ে একটা কামরার মাথায় উঠে গেল। বিশু ডাইনে দেখল। বিশু বামে দেখল। বিশু নিধুবাবুর ক্লাসে মুখস্থ করা দশটা কোণে দেখল। কেবলই মালগাড়ি। শ’য়ে শ’য়ে জংধরা ডিব্বা। শ্যাওলা সবুজ। রঙচটা লাল। গোল ট্যাংকার। ছাদখোলা দেশলাই বাক্স। ছাদঢাকা, যেরকমটা করে সে এসেছে এতদূর। কোনও মানুষ চোখে পড়ল না। কোনও ইঞ্জিন নেই দৃশ্যপটে। কেবল জংধরা মালগাড়ি। কোনওটা নড়ছে না। স্থির। পরিত্যক্ত। প্রাগৈতিহাসিক ফসিলের মত শুয়ে, তাদেরকে ঘিরে গাছ লতিয়ে উঠেছে।

“এই দেশটা একমুখী, বিশু। এখানে কেবল আসার পথ আছে। এই দেশটা একটা সংগ্রহশালা। যাদুঘরও বলতে পারো। এই যে মালগাড়িগুলো দেখছ, এগুলি এর পরম যত্নে সাজিয়ে রাখা দ্রষ্টব্য। স্মারক। হাজার হাজার ট্রেন হাজার হাজার বিশুকে নিয়ে এসেছে এইখানে।”

তারা কোথায় গেছে? আর সব বিশুরা?

“তারা হারিয়ে গেছে। স্বাগত বৈশাখ ব্যানার্জী। এই হল নিরুদ্দেশ।”

বিশু ভয় পেল না। গতরাতে সেই অমূল্য প্রাপ্তি তার হয়ে গেছে। মানুষজনের চিহ্ন খুঁজতে লাগল সে, ডিব্বার ছাদে দাঁড়িয়ে। রেলইয়ার্ড থেকে বেরোনোর একটা তো পথ থাকবে। কোনও একটা দিকে লাইন পেরোতে পেরোতে গেলেই হবে। বিশু মই ধরে নেমে এলো। কারুর পেটের তলা দিয়ে হামাগুড়ি কেটে, কখনও দুজনের মধ্যে দিয়ে আড়াআড়ি সেঁধিয়ে সে এগোতে লাগল পাথরকুচিতে আওয়াজ তুলে। স্কুলের জামাটা কালি হয়ে গেছে। মা দেখলে- বিশু মনে মনে থমকায়। মা দেখবে না। আচ্ছা, বাড়িতে এখন কী অবস্থা? পুলিশে খবর দিয়েছে নিশ্চই। ইস্কুলে খোঁজ নিয়ে জেনেছে তার কীর্তি। ভাবছে সেই জন্যই হয়ত সে ঘর ছেড়েছে। এহ। ভুল হয়ে গেল। একটা চিঠি লিখে আসলে হত। বা হয়ত না, অত আয়োজন করলে  আসল কাজটাই হত না। মাঠ জংশনে নিরুদ্দেশ এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে থাকত না তার জন্য। কিন্তু লোকজন চিন্তা করছে বাড়িতে। ওদের কে শাস্তি দেওয়া কি উদ্দেশ্য ছিল? উঁহু। হেডু। হেডুর ভারী মনস্তাপ হবে। দেবাশিস স্যারকে ঝাড়বে না? “তুমি কী ধোয়া তুলসীপাতা, দেবাশিস?” আহ। কাজিয়া বাঁধবে। খবরের কাগজের লোক আসবে। হয়ত দৈনিক জাগরণ থেকেই। “কী দরকার খবরের কাগজে ইয়ে ইয়ে ছবি দেবার? ছেলেগুলোকে তো আপনারা বখাচ্ছেন!” টিভির লোক ও আসবে। “মেধাবী ছাত্র নিরুদ্দেশ।” মরে গেলে বা হারিয়ে গেলে সবাই প্রতিভাবান আর মেধাবী হয়ে যায়। বিশু ট্রেনের পর ট্রেন পেরিয়ে চলে। সাতটার খবরের পরে নিরুদ্দিষ্ট সম্বন্ধে ঘোষণা হবে। “হারিয়ে যাবার সময় পরণে ছিল স্কুলের ইউনিফর্ম। হাল্কা নীল শার্ট আর ছাইরঙা প্যান্ট।”

বিশু ছেষট্টি নম্বর মালগাড়ি পেরিয়ে একটা দেওয়াল দেখতে পেলো।

(৯)
– গতিক সুবিধের নয়। 
– অসুবিধে কোথায়?
– মিলবে না। মেলাতে পারবে না। 
– অঙ্ক তো কষছি না। 
– শুধু অঙ্কই মেলে বুঝি? ছন্দ মেলে না? অন্ত্য ও মেলে। মিলতে হয়। এখানে মেলানো কঠিন। তুমি পারবে না।
– হয়ত চেষ্টাই করছি না। 
– সেটা ফাঁকি। মেলাতে পারলে ঠিক-ই মেলাতে। যেই বুঝেছ পারবে না, ওমনি ব্যাকরণ ভাঙার ছল। 

– আপনার রায় শিরোধার্য। তবে কিনা শেষটা আমিও জানিনা, আপনিও না। 

বিশুদ্ধ, নিকষ কালো অন্ধকারে শোবার ঘর আর গোরস্থানে কোনও তফাৎ থাকে না। যতক্ষণ আঁধারিতে আলো রয়েছে সামান্যও, ততক্ষণ গা ছমছমে ভাব একটা থাকে। আলো চলে গেলে অবয়বগুলো ও অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্ধকারের মত সাম্য আর কিছুতে নেই। সেইরকম, গোরস্থানেও একটা নিশ্চয়তা আছে। একটা চিরস্থায়ীত্ব, একটা সম্পূর্ণতা রয়েছে। একটা পরম অন্ত্য রয়েছে। এটাই প্রান্ত। শেষ প্রান্ত। এখানে উপস্থিত সবকটা গল্প সমাপ্ত। তাদের শেষগুলো জানা।
কার্তিক এখনও জানে না সে কেন ফেরেনি বাড়ি। বাড়ি ফিরে গেলে জানতে পারত না রাতটার ঝুলিতে কী আছে। এই দুই না জানার মধ্যে প্রথমটাকেই বেছে নিয়েছিল সে। কিন্তু কিসের আশায়? নাকি কৌতূহলে? এক ক্ষয়াটে বৃদ্ধের সঙ্গলাভের দুর্নিবার আকর্ষণে? এক বিগতযশা গায়কের থেকে জ্ঞানপ্রাপ্তির লোভে?
– তুমিও জানো না। 
“আপনি কে?”, জানতে চেয়েছিল কার্তিক।
“আর মনে পড়ে না।” হেসেছিল বুড়ো, “হয়ত তুমি। বাড়ি যাও কার্তিক।”
দ্বিতীয়বার আর প্রশ্ন করেনি কার্তিক। একটা বেদীর উপর বাবু হয়ে বসে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনছিল। একটানা, নিরবিচ্ছিন্ন। তানপুরার গুঞ্জনের মত। হিম পড়ছে।
“মধ্যযামের রাগ জানো কোনও?” বৃদ্ধ শুধোল।
দু’দিকে মাথা নাড়ল কার্তিক। বৃদ্ধ সেটা দেখতে পেলেন না যদিও। কার্তিক অন্ধকারেই জোড়া লাগালো সানাইটার মুড়ো, পেটি, ল্যাজা। ঢঙীর এ’পারে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল রাতের সানাই। “হৃষভ, পঞ্চম বর্জিত। গান্ধার আর ধৈবত কোমল। আর সব শুদ্ধ।”
চন্দ্রকোষ।

বৃদ্ধের কন্ঠ অনুসরণ করে যেতে লাগল কার্তিক। নিখুঁত হল না শুরুতে। সঞ্চারীর কাছাকাছি এসে কার্তিক রাশ হাতে পেল খানিক, নাড়ি ধরতে পারছে বেশ। আভোগীতে প্রবেশ করার পর কার্তিক টের পেল বৃদ্ধের গলা থেমে গিয়েছে। কিন্তু তার থামবার উপায় নেই যে। কার্তিক আবিষ্কার করল আভোগীর তানগুলো সে নিজে বানাচ্ছে। সেই নেশার মধ্যে দিয়েই মধ্যঝালায় সে লহর শুনতে পেলো। দ্রুত। দ্রুত। আরও দ্রুত হয়েই চলেছে।

কার্তিক ভয় পেল। দম আটকে আসছে। স্থাপত্যটা তৈরী হচ্ছিল, চূড়ো বসবার আগেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। জামার হাতা দিয়ে ঘাম মুছে চোখ খুলল। পুবেরহাটেই সূর্য ওঠে আগে। আকাশ ফরসা হচ্ছে। বৃদ্ধের মুখে হতাশা।
“শুরু থেকে শুরু করতে হবে যে আবার।”
“করব।” বলল কার্তিক, “তবলাটা কে বাজাচ্ছিল?”

বৃদ্ধ বলল “বাড়ি ফিরবে না, কার্তিক?”

ঢঙীর পূর্ব পাড় ধরে দক্ষিণ দিকে হেঁটে চলে দু’জন। সাদা ফতুয়া, সাদা ঢোলা পাজামা, সাদা ফেজটুপি হাত পা নেড়ে নীল হাফশার্ট, ছাই ফুলপ্যান্টকে মিয়াঁপুত্র  বিলাস খানের উপাখ্যান শোনাতে থাকে।

(১০)

দেওয়ালটা টপকাতে বিশেষ অসুবিধে হল না বিশুর। খাঁজ কাটাই ছিল। উপর থেকে পা ঝুলিয়ে বসে একটা ছোট্ট শহরের আন্দাজ পেল সে। সামনেই দেওয়াল ঘেঁষে একটা বড়রাস্তা। তার ওপারে ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে শহরটা। কত ছোট ছোট বাড়ি, দোকান, একটা মস্ত বড় জলের টাওয়ার। শহরটা নেমে গিয়েছে একটা সমুদ্রে। খাঁজ বেয়ে দেওয়ালের ওইপারে নেমে পড়ল বিশু। পকেট ঢুঁঢু নয়। কাল মাসের প্রথম শুক্রবার ছিল। মন্মথ স্যারের মাইনেটা ব্যাগেই রয়েছে, খাতার ভিতর। খিদে পেয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে ঢঙীর মোহনায় পৌঁছে গেছিল কার্তিক আর ফেজটুপি। বালির তট থেকে খাড়াই উঠে গেছে ছোট্ট শহরটা। “আপনি এইখানে থাকেন?” জানতে চেয়েছিল সে। বৃদ্ধ উত্তর দিয়েছিল, “আমি থাকি না।” কার্তিক যেন হেঁয়ালির মানেটা বুঝতে পারে। “এইখানে আসিনি আগে কখনও”, বৃদ্ধ বলে চলে, “আমি দ্বিতীয়বার কোথাও যাই না।” কিছু কুঁচকানো নোট তার হাতে দিয়ে বলে, “আমার কিছু কাজ আছে। সঙ্গ প্রত্যাশা করি নি তো, ব্যবস্থা করতে হবে। এ শহরে বন্দর আছে একটা, রাত হবার আগে সেখানে চলে এসো।”

আকাশী নীল জামা আর ছাইরঙা প্যান্ট পরা একটা ছেলে হাঁ করে মেছুয়াদের জাহাজের দিকে তাকিয়ে থাকে।

– তারপর? 
Advertisements