না। না। এখানেই ছিল। তোকে ছুঁয়ে বলছি, এখানেই দেখে গেছিলাম। এখানেই রেখে গেছিলাম। একটুও ভুল হচ্ছে না আমার, ঠিক এইখানটায় ছিল। বিশ ক্রোশ দূর থেকে সেতুর চুড়ো দেখা যেত, সেই চুড়ো বলে দিত, এখানেই আছে, কোত্থাও যায়নি। তারপর সেতুতে উঠলে, জানিস, পারিজাতপুরের মাঠ দেখা যেত! সেতু থেকে দেখতে পেতাম নীচে চওড়া ভারসাই, শান্ত নদীটি। সেতু থেকে দেখতে পেতাম কুসুমগঞ্জের মিনারটা, গোলগম্বুজের পরী। ওরা হাত নেড়ে বলত, আছে, তোমার শহর এখানেই আছে। আমি হলফ করে বলছি, বিশ্বাস কর, এখানেই রেখে গেছিলাম আমার শহরটাকে।

তোর মনে পড়ছে না? বাহাত্তর নম্বর গলির ভিতর উকিলের বাড়ি? তোর মনে নেই? জৈষ্ঠের রোদের পর হিম ধরানো অন্ধকার সিঁড়ির ঘর? সাদা দেওয়ালে বিজ্ঞাপন আর এই চিহ্নে ভোট দিন? একদিন বায়োস্কোপের শুটিং দেখেছিলাম তুই আর আমি, মধুবাজারের ঘাটে। সেটা এইখানেই ছিল না, বল? বল, মিষ্টু, আমি ভুল বলছি? পারিজাতপুরে একটা লেবুজলওলা বসত, তোর ছিল না-পসন্দ, আমি জোর করে খাওয়াতাম। ধুস! তোর কিছুই মনে থাকে না। রানীদীঘি থেকে হেঁটে যেতাম তোর বাড়ি, সাড়ে চার গান সময় লাগত। তুই অন্দরমহল থেকে বেরোতেই সময় নিতিস সাত গান। গাল পাড়তিস চোদ্দপ্রহর ঝালাপালানি রেলগাড়িটাকে, তোদের পাড়া কাঁপিয়ে ছুটত বলে।

আর ছিল আমার বাড়ি। আমার বাড়ি! সে বাড়ির সিংহদুয়ার ছিল একটা বটে, আমার কিন্তু প্রিয় ছিল খিড়কীর উঠোনটুকু…  মনে আছে? একটা কারিপাতার গাছ ছিল, একটা পেঁপেগাছ, আর ছিল একটা ছাদ। একটা ছাদ ছিল। এখানেই ছিল।

জাহাঙ্গীর কে মনে পড়ে, মিষ্টু? সিড়িঙ্গে জাহাঙ্গীর? তোর নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল। খুব রাগ ওর উপর। ওর ও বাড়ি ঊনত্রিশের গলিতে না? বটুক ডাক্তার নস্যি নিত, খেয়াল আছে? কোথায় গেল গলি গুলো? কোথায় গেল শহর? এই তো সেদিন ও…

ওইত্তো! ওইত্তো! ওই ফটকটা চিনি। ওইটা রয়েছে এখনও! চল মিষ্টু, গিয়ে দেখি। সাহেবপাড়ার গোরস্থান না ওইটা? শ্যাওলাধরা স্তম্ভ আর বেলগাছগুলো? চল দেখি…

————————————————————————–

শ্যাওলাধরা স্তম্ভ আর বেলগাছগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করছিল একটা ছেলে। তারপর হনহন করে হাঁটা দিল ফটকের দিকে।

________________________________________

ছবি – বর্ষণা গোস্বামী

Advertisements