ছায়ায় বসলে গরমটা অত গায়ে লাগে না। বরং ফুরফুরে হাওয়ায় শরীরটা একটু শীতল হয়। বনমালীবাবু গতকালের খবরের কাগজটা পেতে বসেছিলেন স্টেশনে, লোহার থামে হেলান দিয়ে, জামার উপরের বোতাম দুটো খুলে। ছাউনিটা হয়ে খুব সুবিধে হয়েছে। অল্প কজন লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুতুবপুর স্টেশনে, তাদের বেশিরভাগই কর্মহীন, তারা ট্রেনের অপেক্ষা করেন না। এদের নিয়ে ভাবেন বনমালীবাবু মাঝে মধ্যে। এদের কোনও উপার্জন নেই, কোনও আকাঙ্খাও নেই। স্টেশনের বেঞ্চিতে দিনরাত বসে কেবল দেখেন। শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থেকে দিনের পর দিন কাটানো যায়? ক্লান্তি আসে না?

দুটো মাছি ঘুরছে। এই উলটো আপদ, দু’দণ্ড স্থির হয়ে বসতে শেখেনি। হাত নাড়লেও ঘাম হয়। ট্রেনটা দেরি করছে। বনমালীবাবু উশখুশ করতে থাকেন। বেলাবেলি মালদা পৌঁছতে পারলে হয়। আলস্য কি ছোঁয়াচে হয়? বনমালী শিকদার একটা মস্ত হাই তুলে চোখটা বোঁজেন। ঘুম কিন্তু আসে না। একটু আরাম শুধু। এই অপেক্ষার সময়টুকু এক অদ্ভুত আরামের। ট্রেন আসা অবধি আর কিছু করার নেই বনমালীবাবুর। “বল এখন তোমার কোর্টে পৃথিবী, তুমি চাল দেওয়া অবধি আমার অখণ্ড অবসর।” বনমালীবাবু একটু অবাক হলেন। তিনি কি চাইছেন ট্রেন টা দেরি করুক? আরও ভালো হয় যদি না-ই আসে? ট্রেন আসবে, তবে আমার দান, এই ভেবে আরও খানিক আরাম করে নেওয়া যাবে! চোখ খুলে বড় সাধের একটা আড়মোড়া ভাঙেন বনমালীবাবু। না, কোনও তাড়া নেই, কোনও তাগিদ নেই। আরামের নেশা, নেশার আরাম। ট্রেন এলেই তো ফের ঘটনার পারম্পর্য, আবার কিছু করতে হবে, আর সেই করারও কর্মফল আছে।

হুড়মুড় করে শশব্যস্ত ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢোকে, খানিকটা ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে। “দেরি হয়ে গেল স্যার, মাপ করবেন!” বনমালীবাবু বরাভয় মুদ্রায় ক্ষমা করে দেন। “কোই বাত নেহি দুটো কুড়ির ডাউন মালদা লোকালবাবু। হয় হয়। হয়েই থাকে।” বনমালীবাবু উঠতে পারেন না। তাই নিয়ে তার বিশেষ চিন্তাও আছে বলে মনে হয় না। পরের ট্রেনটা আছে তো! দুটো চুয়ান্ন না?

বনমালীবাবুর ট্রেন আর আসে না। কোনোদিনও না। বনমালীবাবু এখন শুধু তাকিয়ে থাকেন।

_______________________________________________

 

Advertisements