তর্জনীটা স্ট্রাইকারে রেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে মধ্যমাটা চেপে স্প্রিং রিলিজ করার মত একটা টোকা কানের লতির ঠিক নীচটায় অনুভব করল ফটিকচন্দ্র। গা পিত্তি জ্বালানো হাসিটা মাথা না ঘুরিয়েই বেশ টের পাওয়া যায়। বাঞ্ছারাম গদ্গদ হয়ে পাশে এসে বসল।

“পুকুরপারে কী কচ্চ ফটুকওয়া? ওটা কী তোমার হাতে? দেখি? দেখি-”

ফটিক ডান হাতটা চট করে হাঁটুর তলায় গুঁজে দিল। কিন্তু সলজ্জ হাসিটা লুকোবে কই? বাঞ্ছারাম ইতরের মত খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে লাগল। “পত্তর এয়েচে?” বাঞ্ছারামের কোনও সময়-অসময় বোধ নেই, ব্যক্তিগত বলে কোনও আবডাল নেই। ফটিক ব্যাজার মুখে মাথা নাড়ে। “হুঁ।” এসেছে পত্র। আসবার যে কথা ছিল, এমনটা নয়। কিন্তু এসেছে। কথা ছিল না বলেই আহ্লাদে সাড়ে ষোলখানা হয়েছে ফটিক। পোস্টাপিসের স্বপনখুড়ো দরজার তলায় খাম সেঁধিয়ে দিয়ে গেছে। বীমার দালালি আর এক গোছা বিলের মধ্যে পদ্মফুলের মত খয়েরি খাম। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে ফটিকের নাম। ফটিকচন্দ্র খাসনবিশ। তিনশো চুয়ান্ন কাগেয়াপট্টি লেন। খাম ছেঁড়েনি ফটিক, আলতো করে খুলেছে। ভিতর থেকে বের করেছে চিঠিটা। দুরুদুরু বুকে মেলে ধরেছে। সিনেমার মত চিঠির মধ্যেই প্রেরিকার মুখ ভেসে উঠেছে, প্রেরিকার গলাতেই পঠিত হয়েছে চিঠিখান। সারা শরীর জুড়ে একটা অবশ অনুভুতি ছড়িয়েছে ফটিকের। তারপর সুড়সুড়ি। (দ্বিতীয়টা যে বাঞ্ছারামের কীর্তি সেটা ফটিক এখনও জানেনা।) নিজেকে বেশ একটা কেউকেটা মনে হয় ফটিকের। “তোমাদের কারো নামে এসেছে চিঠি? এসেছে? আমার নামে এসেছে! দেখ!”

“কী লেখা ওতে?”

কান, গাল লাল করে ফটিক চিঠিখানা বাঞ্ছারাম কে দেয়। লুকিয়ে লাভ নেই, বাঞ্ছারামের অগোচরে কিছুই থাকে না।

“ওমা! ফটকে! এতে যে ভালোবাসার কথা! এই তো পষ্ট লিখেছে তোকে ভালোবাসে!”

“ধ্যাত!”

“ফটকাই! কী সুন্দর লেখা রে মেয়েটার! ও জানে?”

না। ও জানে না ফটিকের সমস্ত চিঠি বাঞ্ছারাম লিখে দেয়।

“তুমি না থাকলে কী হত বাঞ্ছারাম?”

“আমার নটেটি মুড়োল ফটিকানন্দ। এইবার তোমার কেরামতি। এই দেখ কী লেখা!”

– দিন গুনছি। ভারী তো পুকুর, ও তুমি সাঁতরে চলে এসো! –

বাঞ্ছারাম পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল।

পুকুরপারে পড়ে রইল ফটিকচন্দ্র। তাকে সাঁতার শিখতে হবে।

Advertisements