নৈঃশব্দ ও শোনা যায়। ফটিক শুনতে পেলো। চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল পিছনের সিটে, ঘুম ভাঙার পর নৈঃশব্দের ঠ্যালায় ফটিকের কান ফাটার জোগাড়। প্রথমে ভেবেছিল কালা হয়ে গেছে, কিন্তু তরবরিয়ে উঠতে গিয়ে গাড়ির ছাদে মাথা ঠোকার গদাম আওয়াজ টা ওকে আশ্বস্ত করল। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে গাড়ি থেকে নামল ফটিক।

শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে। ভোর হয় হয়। হাই তুলে দাড়ি চুলকালো খানিক। একটা লেভেল ক্রসিং এর সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ি টা। চালক বেপাত্তা। কোথা থেকে আসছিল, ঠিক খেয়াল নেই, কোথায় যেন যাবার কথা? এদিকে শব্দের অভাবে কানে তালা, এ সময় মাথা খোলে? রাস্তার দু’পাশে যদ্দুর চোখ যায় ক্ষেত। সর্ষের নয়, ভুট্টার। ফটিক খুশি হল। আল দিয়ে নেমে গিয়ে নিজেকে ছেড়ে দিল। প্রকৃতির মধ্যে হাল্কা হবার বড্ড আরাম। রেললাইনের ওপারে খানিক দূরে একটা পাহাড় পাহাড় ব্যাপার ও আছে। পা ঝেড়ে, চেন টেনে রাস্তায় উঠে এল ফটিক। খাকি পেন্টুল খালি গা লোক টা কেবিনের ঝাঁপ খুলছে। এই বুঝি প্রহরী? ঝাঁপের ভিতর দোকান আবার। দড়ি থেকে পান পরাগের পাতা ঝুলছে, কাঁচের বয়ামে প্রজাপতি বিস্কুট, উনুনে কেটলি আর কেটলির হাতলে জড়ানো ন্যাকরা। ফটিক মুগ্ধ হয়ে দুধ চা ফোটানোর অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে লাগল। সে চায়ের বুকের উপর ঘন সর, ফটিক আনন্দে কয়েক ফোঁটা কেঁদেই ফেলল।

গাড়ির উষ্ণ বনেটের উপর পিছন সেঁকতে বসল ফটিক, হাতে ভাঁড় আর প্রজাপতি বিস্কুট নিয়ে। বাঁ দিকে ওই সেজো পাহাড়টার পেটের কাছ থেকে একটা ধোঁয়া এগিয়ে আসছে। ট্রেন। বড্ড ধীর। ফটিক ইঞ্জিনের মুখটা দেখতে পেল। ক্লান্ত, অবসন্ন। যাবতীয় নৈঃশব্দ চুরমার করে দিয়ে শতাব্দীর অভিমানের ভারে ন্যুব্জ, জড়ভরত মালগাড়িটা ধুঁকতে ধুঁকতে লেভেল ক্রসিং পেরোয়। বুক ঠেলে একটা “আহারে” উঠে আসে ফটিকের। “কেউ খেয়াল রাখে না তোমার, হে বৃদ্ধ বাহনবর, যত কদর এলেবেলে এক্সপ্রেসের। এ অবহেলা তোমার প্রাপ্য নয়, ট্রেনেশ্বর, মানুষের অর্বাচীনতা ক্ষমা কোরো মহাজ্ঞানী!” বাস্তবিক-ই, বোধিপ্রাপ্ত কাছিমের গতি তে অনিঃশেষ মালগাড়িটা চলতেই থাকে, তবু কালের নিয়মে শেষ হয় এক সময়।

খাকি পেন্টুল প্রহরী খাটিয়া ছেড়ে উঠে লম্বা আড়াআড়ি বাঁশটার প্রান্তের দড়ি টা খুলে নেয়, সেটা টুক করে খাড়া হয়ে যায়। “ফটিক বাবুর ট্রেন দেখা হল?” ফটিক পিছন ফেরে। ঘেঁটুকুমারী। আঁতকে ওঠে ফটিক, এতক্ষণ ও চালাচ্ছিল গাড়ি? অজস্র ধন্যবাদ দেয় ভগবান কে। “বাঁচিয়ে রেখেছ ঠাকুর, আর কিছু চাইনে।” ফটিক কে চাবি ছুঁড়ে দেয় ঘেঁটু। “এবার আমি ঘুমাবো।”

ফটিক স্টিয়ারিং ধরে বসে। আবারো কান ফাটা নিস্তব্ধতা। ফটিক এখনও জানেনা ওকে কোথায় যেতে হবে।

Advertisements