তৃপ্তি মাসি চাউমিনে গোলমরিচ দেয়। গাজর দেয় দিক, বরবটিও না হয় দিল দু’পিস, ডিম ভাজা তো থাকবেই, তাই বলে গোলমরিচ?

রবিবারের জন্য শহরের যত গানবাজনা তোলা থাকে। দুপুর তিনটের সময় গড়িয়ার মোড়ে থিক থিক করে কালো জামা ঝাঁকড়া-চুলো গীটারধারীর দল। তারা ব্রাউনিয় আইনে একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, যন্ত্রগুলো ঝ্যাং করে ওঠে, বাহকরা রক্তচক্ষু করে একে অপরকে সুরেলা গালি দিয়ে এগিয়ে যায়। হরিণাভি মিনিটায় কচি বেহালা নিয়ে কচিতর খোকা আর তার মা বসার জায়গা খুঁজছিল। বেহালা দামী যন্ত্র। অন্তরীক্ষ সিট ছেড়ে দিয়েছিল। মায়ের কোলে খোকা। খোকার কোলে বেহালা। মায়ের সিল্কের শাড়ি বেয়ে খোকা আর তার বেহালা পিছলে সুরুৎ করে নেমে যাচ্ছিল। অন্তরীক্ষ নিজের মনে খানিক হেসে নিল। ছোটবেলায় রিকশায় দিদার কোলে উঠতে চাইত না এই জন্য।

পরীক্ষা নিয়েছে মাইতি স্যার আজ। তিন ঘন্টা ধরে। অন্তরীক্ষ গোটা সময়টা ভারা বাঁধা মিস্তিরিদের চুনকাম দেওয়ালে নীল রঙ করতে দেখেছে। এটা বেস, এটা ভিত। এর উপর এলোমেলো তুলির টানে ভ্যান গঘের তারাময় আকাশ তৈরী হবে। ঢেউয়ের মত তারা। ঢেউ কখন উঁচু হয় কখন নীচু, এই অন্তবিহীন সন্ধানেতে… উহ! কত্তদিন বাদে এই গানটা! রবিবারের জন্যেই যত গান… ক্ষণিকের জন্য সম্বিৎ ফেরে অন্তরীক্ষের। সাতের সি টা সোজা। কোশ্চেন পেপারের পিছনে বিশালাক্ষীর মুখ। ভুরুটা অবিকল। চোখ দুটোও মন্দ না। ঠোঁটটা একেবারে হয়নি। তালু দিয়ে মুখের নীচটুকু চেপে রাখলে সেই মন্দারমণির ছবিটা। পেন্সিল টা ভোঁতা হয়ে গেছে। ডট পেন দিয়েই টিপ এঁকে দিল অন্তরীক্ষ। টিপটা আসল ছবিতে ছিল না। প্রশ্নপত্রের পিছনে বিশালাক্ষী। টিভিতে রবিবারের ছায়াছবি। প্রথম কদম ফুল। মান্না। রবিবারের জন্যই…

তৃপ্তি মাসি মাইনের খামটা “রইল” বলে রেখে গেছে টেবিলে। গোলমরিচ দেওয়া চাউমিনের প্লেটের পাশে। মহুল সোফা থেকে অর্ধেকটা ঝুলে ব্যাজার মুখে পরীক্ষা দিচ্ছে। তার অঙ্কের মাস্টারের থেকে ভালো হচ্ছে তার পরীক্ষা, অন্তরীক্ষ নিশ্চিত। আজ পড়াতেও ইচ্ছে করছে না। তাই পরীক্ষার আড়াল। পরীক্ষা জিনিসটা ছাত্রের মায়েদের খুব পছন্দ। “পরীক্ষা নিলে ভালো প্র্যাক্টিস হয়।” তৃপ্তি মাসি বলেছে। মহুলের খাতায় ইউনিটারি মেথড। অন্তরীক্ষের মাথায় এক জোড়া প্রায় জোড়া ভুরু, বারবার মুছে আঁকতে না পারা ঠোঁট। চাউমিনে গোলমরিচ। বাজারের থলেতে তবলা। দরজায় মহুল কিংবা তৃপ্তির জন্য তবলা মাস্টার। হ্যাঁ, আজ রবিবার।

জয়া কাকিমার দরজায় হলদে চুড়িদার, কমলা ওড়না একটা মেয়ে কলিং বেল টিপছে। চেনেনা, তবু হাসল। এরা জয়া কাকিমা কে জয়া আন্টি বলে। এরা, যাদের চটির স্তূপ দরজার বাইরে। অন্তরীক্ষ হাঁটার গতি বাড়ায়। নটা বাজে প্রায়, রিকশা নিলে হত। বিশখানেক ঘুঙুর তালে তাল ঠুকছে। রোজ গুলিয়ে যায়। ভারতনাট্যম না ওড়িশি? তিনতাল। তিনতাল। নিত্য রবি নৃত্য। উফ। বাসস্ট্যাণ্ড থেকে অনেকটা। এইরে! ট্রেনের বাঁশি নাকি? লেভেল ক্রসিং টা বন্ধ? রীতিমত ছুট লাগায় অন্তরীক্ষ। ঘাম ছুটছে। মা নাকি হাফ সোয়েটার পড়তে বলছিল! এই সময়ে কোনও লোকাল নেই। নেই। হে শিয়ালদা দক্ষিণ শাখা, ডোন্ট লেট মি ডাউন। বিড়বিড় করে অন্তরীক্ষ, নো বডি এভার লাভড মি লাইক শি ডিড… গুবরে পোকার আবার রবিবার…

একতলাটা অন্ধকার। যাচ্চলে। বেরিয়ে গেল? হল না রক্ষা শেষ পর্যন্ত? সিঁড়ির দিকের দরজা টা খোলা। অন্তরীক্ষ ঢুকে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে হাঁপায়। চোখ সওয়ায়। সিঁড়ির তলাটাও অন্ধকার। – “যাইনি” অন্তরীক্ষ মুখ তোলে। ভুরু দেখা যাচ্ছে না। চোখ অস্পষ্ট। দোতলার বাল্বের প্রতিফলন। -“যাইনি বিয়েবাড়ি। ওরা গেছে।”

সিঁড়ির তলার অন্ধকারে বিশালাক্ষীর ঠোঁট চিনে নেয় অন্তরীক্ষ। পরের দিন আর আঁকতে অসুবিধে হবে না। দোতলা থেকে হারমোনিয়াম ভেসে আসে। প্রিয় আমার, ওগো প্রিয়…

রবিবারের জন্য শহরের যত গানবাজনা তোলা থাকে।

Advertisements