যক্ষ চা খাচ্ছিল। দিনের প্রথম চা নয়, বেলা দু’টোর সময় “চা পাতা তো রয়েছে দেখছি এখনও একটু” চা। নির্বাসনপুরী তে চায়ের চল নেই, চা পাতা আনতে হয় দেড়শো ক্রোশ দূরের অজ্ঞাতগঞ্জের হাট থেকে। তাই হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া চার আনা চা পাতার স্বাদ ছোটখাটো লটারী জেতার মত। যক্ষ এরকম টুকটাক লটারী জিতে থাকে। গতকাল হাঁড়ির তলার ভাতটুকু পুড়ে গেছিল, পোড়া ভাত তার কাছে অমৃতসমান। ভাত চাইলেই পোড়ানো যায় না, যক্ষের ভাগ্য শিকে ছিঁড়লে তবেই… যক্ষ চায়ের কাপের উপরেই একটা ঘূর্ণিঝড়সম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আষাঢ় আসতে ঢের দেরি।

কালিদাসের উপর মেজাজ খিঁচিয়ে রয়েছে। মাতব্বরীর আর জায়গা পায়নি। অ্যানুয়াল পরীক্ষার মত বছরে একবার-ই আসবে কেন মেঘদূত? ভারী অবিচার! খাটের উপর পেতে রাখা চিঠিটার উপর যত্নে হাত বুলোয় সে। এরকম এক একেকটা দিন আসে, সবকিছুই “আর লাভ কী?” মনে হয়। বাতাসে ধুত্তেরির গন্ধ মেলে। কাজকর্ম, রান্নাবান্না শিকেয় তুলে জানালার পাশে বসে সেই দুঃখগুলোকে লালন করতে ইচ্ছে করে। বেশ একটু ভারী হয়ে আসবে বুক, নিজের উপরেই একটা “আহারে বেচারা!” ভাব আসবে, তেমন সুযোগ পেলে এক দু ফোঁটা টুক করে… দুঃখদেরও যত্ন করতে হয়, যক্ষ জানে, প্রয়োজনে নিজেকেই। দুঃখরাও নজর চায়, তাদের দমিয়ে রাখলে সুদে আসলে বাড়ে, তোয়াজ করলে শান্ত হয়। চা এ চুমুক দেয় যক্ষ, এ সময়ে কেউ একটু “আহ! আমি আছি তো!” বললে বড় ভালো হত। কিন্তু আষাঢ় আসতে এখনও ঢের দেরি।

বড়ে গুলাম আলী অমন তরিৎ তানের মধ্যেই কী করে গলা খাঁকারি দিয়ে নেন কে জানে! তাতেও সুর বিচ্যুতি হয় না। মধ্যে মধ্যে হাততালি পড়ে। কাফীর মধ্যে একটা মোচড় রয়েছে। সারা সকাল মল্লার বাজিয়ে লোভ দেখিয়েছে মেঘদূতকে, মিঁয়াবাবুর মল্লার, মিশ্র, মেঘ, দেশ, সবকিছু। টিকিটি পায়নি। অকর্মার ধাড়ি। রোদ গলে কাফীতে এসে ঠেকেছে। একটা সারেঙ্গী সঙ্গত করছে। যথেষ্ট হয়েছে দুঃখবিলাস। এনাফ। জাবদা খাতাগুলো খুলে কাজ নিয়ে বসে যক্ষ। গজগজ করতে করতে কাজ এগোয়। সময় এগোয়। খালি চায়ের কাপেই চুমুক চলতে থাকে।

চোখ জ্বলে। কান গরম হয়ে যায়। এই রাগটা যক্ষ চেনে না। বন্ধ জানালার কাঁচে বাইরের গাছের ছায়াগুলো অশান্ত নকশা তৈরী করছে। আহ! গলাটাও মোটে বড়ে গুলাম নয়। মাথার ভিতর পাক দিচ্ছে কী? “বসেছিলেম যার আশে, সে ঐ আসে…” যক্ষ দরজা খুলে বেরোয় বারান্দায়। খালি পায়ে মেঝের ঠাণ্ডাটা বেয়ে ওঠে। ঝড়। আকাশ লাল। যক্ষ হাসে, মেঘদূৎ নীচু হয়ে আসে।

– “কই, দাও?”

– “আষাঢ় আসতে যে দেরী?”

– “ব্যতিক্রম। দেবে না যাবো?”

যক্ষ চিঠিটা বাড়িয়ে দেয়।

-“এলাম, রাস্তা চিনি, চিনে গেছি এদ্দিনে” মেঘদূত রওনা হয়।

-“দাঁড়াও, এক মিনিট। খামে আঠা লাগাইনি তো!”

Advertisements