আসেনি। হয়ত পৌঁছয়নি। ভুলে গিয়েছে বলে মনে হয়না, আটকে গেছে? আসবেনা?

অপেক্ষা নিয়ে দিস্তে দিস্তে গল্প আছে, আমাদের নায়কের সেগুলো পড়া। সে জানে জল্পনা করে, অভিমান করে লাভ নেই। এই সব গল্পের প্রথা মেনেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, হয় অপেক্ষিতার ফোন খারাপ বা পরিষেবা সীমার বাইরে বা নিতান্তই ধরছেনা ফোন। হয়ত নায়ক বেশ ক’বছর বাদে শহরে, দেশে ফিরছে, ফোন করবার ই উপায় নেই। নায়কের তর সইছে না। হলুদ ট্যাক্সি তে চেপে বসে চালককে ঠিকানা দেয় কিছু একটা, বহুকাল বাদে বড্ড চেনা সেই জায়গার নামটা উচ্চারণ হয়ে ঠোঁটে, জিভে আলোড়ন তোলে।

আমরা এই গল্পে খুঁটিনাটির দিকে বেশি নজর দেবো না। কে নায়ক, সে কোথায় ছিল অ্যাদ্দিন, তার সাতাশতম গ্রীষ্মকালে পুনর্জন্ম হয়েছিল কিনা, সে উকিল ছিল নাকি হরিপদ; সে প্রশ্ন অবান্তর, শুধু জেনে নেওয়া দরকার যে সে বাড়ি ফিরছে, যে শহরে সে পদার্পণ করেনি আগে, যে শহরটার জন্ম হল এখন, তার-ই সাথে, যে শহরটা এমনি ভাবেই বারবার জন্মায়।

এই সব সময়ে নায়কের আদিখ্যেতায় আক্রান্ত হবার নিয়ম, ‘মা কালী হার্ডওয়ার’ দেখে চেনা অক্ষরের প্যাঁচে ভোঁকাট্টা। চেনা দৈনিক, চেনা শিরোনাম, ঘরের পিচ। গত মাস তিনেক বা বছর দেড়েক ধরে বোনা প্রতীক্ষায় “বাব্বাহ! কদ্দিন বাদ!” এর প্রলেপ। ভিড়-ভর্তি দৈনন্দিনের শহরে অগোচরের আলস্যযাপন। “আমায় ছাড়াও এই শহরের দিব্যি চলে যায়”, নায়ক নিজের অনপরিহার্যতা টের পায়। হোমিওপ্যাথির গুলির আকারের অভিমান দানা বাঁধে, “কারুরই কি ফারাক পড়েনা? নইলে আসবেনা কেন?” আহ! নায়ক! তিষ্ঠ!

এইবার ঝোলাবন্দী দ্বিতীয় বিড়ালের উঁকি মারার সময় হয়েছে, প্রতীক্ষা কেবল একরকম নয়। পাঠককে মনে করাই, এর আগের বেশ কিছু পরিচ্ছেদ ধরে বর্ণিত হয়েছে আগামী কয়েক মুহূর্তের বিভিন্ন সম্ভবনা। কেমন করে দ্বিতীয় প্রথম-দেখা, সাময়িক আড়ষ্টতা নাকি ঝাঁপিয়ে পড়া, নীরব ফোঁপানি নাকি বিড়বিড়িয়ে “এত দেরি করলি কেন?” অথবা জিভ ভেংচিয়ে “নাইস টু মিট ইউ!”, এই সব-ই ঝালিয়ে নেওয়া আছে, কোনটা মেলে সেটাই দেখার। তবে এই ঝুলিটি এবং বিড়ালটি শ্রডিঞ্জারের, অতএব বাক্স খোলা না অবধি জানার উপায় নেই। কিচ্ছু না! নিরুপায় অধৈর্য নায়ক জানালায় নাক ঠেকিয়ে নীচের ক্ষুদে জনপদের বড় হওয়া দেখতে থাকে।

উড়োজাহাজের ওঠানামা টা মজার ব্যাপার। নাকটা টুক করে তুলে নিয়ে মাটি ছাড়ে, নামবার সময়ও ল্যাজার চাকাটাই কংক্রীট স্পর্শ করে আগে। বরাবরের নাক উঁচু। তার পরের কিসসা টা বড্ড একঘেয়ে। একটু দেরি করে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নায়িকা তাই। আটটা বিশে নামবে মানে বেরোতে বেরোতে কমপক্ষে সোয়া নয়। এখানেও বিশদে যাবার প্রয়োজন নেই, সে গত রাতে ঘুমিয়েছে কিনা, মায়ের প্রসাধনী চুরি করেছে কিনা (নিজের ওসবের বালাই নেই বলেই পাঠক জানে, জানে তার ল্যাধ নামক ব্যারামের কথা), বাড়িতে কী গপ্প দিয়েছে, এগুলিও অবান্তর, শুধু জেনে নেওয়া দরকার, একটু দেরি হলেও সে বেরিয়েছে বিমানবন্দর যাবে বলে, আর সে গত দেড় বছর বা তিন মাস এই আসন্ন মুহূর্তের রিহার্সাল দিয়েছে।

তারপর? ওই যে বললাম, শ্রডিঞ্জারের বিল্লি!

Advertisements