ব্যাপারটা বাতিক? নাকি অসুখ?
একটা ছটফটে কন্ঠ মাথার ভিতর বলতে থাকে “না না না। ভুল করছ। এ সিদ্ধান্ত ভুল!”
শেষ মুহূর্তে এরকম আর্তনাদের মানে হয়? কই এতক্ষণ তো বলেনি কিছু! উলটে সায় দিয়ে এসেছে বরাবর। এখন গলায় সাদা চাদর ঝুলিয়ে আয়নার সামনে বসে “পরিণতি ভালো হবে না, বলে দিলাম” বলে হুমকি দেওয়াটা অন্যায্য। শান্তনু ঘূর্ণি চেয়ারে বসে প্রবল অস্বস্তি তে পড়ে। বিশাল আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে কষ্ট হয়, আসন্ন বিচ্ছেদের ব্যথা। রেডিও চালিয়ে রেখে নন্দকাকু হাওয়া। কুমার শানু কানে গাঁইতি মারছে, গা রিরি করে শান্তনুর। আয়নার সামনের দেয়াল-টেবিলে কিছু ইতস্ততঃ আধ ভাঙা ব্লেড, ছোট বড় চিরুনি, কাঁচি। নাপিত রা হাওয়াতেও কাঁচি চালায় কেন? শুন্যে স্টার্ট নিয়ে কচকচ করতে করতে অতর্কিতে চুলের উপর নেমে আসে। দেখে মডার্ন টাইমসের চার্লির ব্যারামের কথা মনে পড়ে শান্তনুর। একটা শস্তার শেভিং ক্রীম, দুটো ক্ষুর, আরও শস্তার একটা আফটার শেভ, একটা শেভিং ব্রাশ, আর ওই পিচকিরি মার্কা যন্ত্রটা। যেটা দিয়ে চুলের উপর জল ছিটিয়ে দেয় নন্দকাকু। লোকটা ওকে বসিয়ে রেখে বেপাত্তা, যত দেরি করবে, অন্তর্মাথা কন্ঠটাকে দাবিয়ে রাখা তত কঠিন হবে।

 

এই বেইমানিটা মানতে পারে না শান্তনু। মা উঠতে বসতে খোঁটা দিয়েছে বড় চুল নিয়ে। “রুক্ষ, অসুস্থ লাগছে”, গার্গী বলেছে। ভুল বলেনি। বাস্তবিক-ই মাথা ঝাড়লে এক দুটো মুড়ি, একরাশ সাদা গুঁড়ো কিসব, আধ খানা এল ডোরাডো বেরিয়ে পড়ে। চিরুনি তল্লাশি চলে না, এমন দুর্ভেদ্য। সে অরণ্যের গোড়ায় ছুপা-রুস্তম আগ্নেয়গিরির মত ফুসকুড়ি হয়ে মাথা টনটনিয়েছে বিস্তর। কই, তখন তো বন উজাড় করার পক্ষেই ভোট দিয়েছিল মুণ্ডর্নিহিত গলাটা। এখন এই আয়নায় সেই আগাছার ঝোপটাকেই কেন এত প্রিয়, এত আপন মনে হচ্ছে, আক্ষরিক ভাবেই যখন খাঁড়া ঝুলছে মাথার উপর?

 

“দিন কতক চান করলেই বাধ্য ছেলের মত নেতিয়ে পড়বে আবার। শ্যাম্পু বা নারকেল তেল ও তো দিস না কতদিন! লঘু পাপে গিলোটিনে তুলিস না বাপ! তোরই তো অংশ, বল?” এমন করে বললে অপরাধবোধ হয়। “তাছাড়া, চুল টা পেতে আঁচড়ালে মানাচ্ছে ও ভালো! কেটে ফেললে কেমন ন্যাড়া মাকুন্দ লাগবে! সামনে ফেস্ট!” মানতেই হয় শান্তনুকে। যুক্তি আছে। সমস্যা একটাই, এখন, এতক্ষণ পর কেন? নন্দ শালাটাই বা কোন চুলোয় গেল?

 

এরকম-ই এক রবিবারের দুপুরে, ঘুপচি সেলুনে, লুঙ্গি ,গামছা আর পৈতে জড়ানো ‘বর্তমান’ পাঠরত এবং নন্দ’র জন্য অপেক্ষারত জনৈক কাস্টমারকে সাক্ষী রেখে শান্তনুর বোধিলাভ হল। “চুলটা নিছক-ই ছুতো, বাঞ্ছারাম! তোমার এ ব্যামো বহুকালের। নদীর ওপার সিন্ড্রোম। কিসুই তোমার মনঃপূত হয় না। চাই, চাই বলে হেদিয়ে মর, পেয়ে গেলে ধুশ আগেরটাই ভালো ছিল। আপশোষেই সারা জীবন বাঁচবে, বাঞ্ছারাম?”

 

কচকচানিতে ধ্যানভঙ্গ হয় শান্তনুর। নিজেকে জ্ঞান দেবার সময় বাঞ্ছারাম বলে ডাকাটা বন্ধ করতে হবে।
“মাঝারি রাখব না কচি করে দেব?” নন্দকাকু শুধোয়।
সদ্যপ্রাপ্ত বোধিতে উজ্জ্বল শান্তনু একটা আত্মবিশ্বাসী হাসি দেয়।

 

“কামিয়ে ফেল।”

 

মিনিট কুড়ি পর চশমা পড়ে আয়নায় নিজেকে দেখে মস্তিষ্কজাত কন্ঠটা ডেথ মেটাল শুরু করে। “কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি, না বাঞ্ছারাম?” বোধি পঞ্চভুতে মিলিয়ে যায়।

___________________________________________

ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

Advertisements